
মাহদি হাসান :
মহামারী। নামটি শুনলেই আমাদের মন ভীত হয়ে উঠে আতঙ্কে। পৃথিবীর শুরু থেকে এ পর্যন্ত বহু অঞ্চলে মহামারী ছড়িয়েছে। যেগুলোর ইতিহাস সম্পর্কে জানলে সবারই পিলে চমকে উঠবে। তবে একটি ভাইরাস মহামারী রূপ ধারণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান থাকে মানুষের অসচেতনতা এবং অবহেলার। মানুষের অসচেতনতা এবং অবহেলায় ভাইরাস ক্রমান্বয়ে নিজের ডালপালা বিস্তৃত করে পরিশেষে মহামারীর রূপ ধারণ করে। তাই মহামারী নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই আমাদের জন্য উচিত হচ্ছে নিজে সচেতন হওয়া এবং এ ব্যাপারে জনসচেতনতা তৈরী করা।
পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যত অঞ্চলে মহামারী ছড়িয়েছে, সেগুলোকে বিভিন্ন উপায়ে প্রতিহত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ইসলামের কী নির্দেশনা? আমরা সকলেই জানি আমাদের জীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধানই ইসলাম ধর্মে রয়েছে। কারণ, এর ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে প্রেরিত পবিত্র কুরআন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর উপর।
বর্তমানে পৃথিবীবাসীর জন্য আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে থাকা ‘করোনা ভাইরাস’। তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে এ ধরণের মহামারী প্রতিরোধের ইসলামের কী নির্দেশনা রয়েছে? এসব নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো নির্দেশনা আছে কী না? অথবা এ ধরণের ঘটনা সম্পর্কিত কুরআনে স্পষ্ট কোনো আয়াত রয়েছে কী না?
আলোচনার শুরুতেই বলে নিচ্ছি এ ধরণের দুর্যোগ হচ্ছে আল্লাহর তা’আলার পক্ষ থেকে প্রেরিত নিদর্শন। যা আমাদেরকে আল্লাহ তা’আলার স্মরণ এবং উপদেশ গ্রহণের কথা। বলা যায় এগুলো হচ্ছে আমাদের জন্য সতর্কীকরণ নোটিশস্বরূপ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেন,
(وَمَا نُرْسِلُ بِالآيَاتِ إِلاَّ تَخْوِيفًا)
অর্থঃ আমি ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই নিদর্শন প্রেরণ করি। [সুরা বনী ইসরাইলঃ ৫৯]
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা রহিমাহুল্লাহু বলেন, আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদেরকে নিজ ইচ্ছানুযায়ী নিদর্শন পাঠিয়ে ভীতি প্রদর্শন করেন এবং সতর্ক করেন। যাতে করে তারা শিক্ষাগ্রহণ করে এবং আল্লাহর কথা স্মরণ করে। আমাদের মনে পড়ে, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) এর সময়ে কুফা প্রকম্পিত হয়েছিল। তখন ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেছিলেন, ‘তোমাদের প্রভু তোমাদেরকে তিরস্কার করছেন। তাই তোমরা তার কাছে তওবা করো’। [তাফসীরে ইবনে কাসির]
এ সকল নিদর্শন দেখে পাপীদের মনে ভয় সৃষ্টি হবে। ফলে তারা আল্লাহর কাছে তওবা করবে। আর মুমিনগণ এ দেখে ভয় পেয়ে তাদের ঈমান হবে আরো মজবুত।
সহীম মুসলিমে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি এসে সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রা. কে মহামারী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তখন উসামা ইবনু যায়েদ রা. বললেন, আমি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মহামারী হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে শাস্তি অথবা ধমকস্বরূপ। আল্লাহ তা’আলা বনী ইসরাইল একটি দলের উপর অথবা তোমাদের পূর্ববর্তী কিছু লোকের উপর এমন শাস্তি নিপতিত করেছিলেন। তাই যখন কোনো স্থানে মহামারীর কথা শুনতে পাবে সেখানে যাবে না। আর যদি তা তোমাদের কাছে চলে আসে তবে তা থেকে পালিয়ে যাবে না’।
এই হাদীসটির মাধ্যমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুর্যোগ অথবা মহামারী মোকাবেলার গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ম বলে দিলেন।
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহু মহামারী আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ না করার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন,
(১) ক্ষতিকর উপাদান থেকে দূরে থাকা।
(২) দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে না যাওয়া। এতে করে রোগাক্রান্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
(৩) আক্রান্ত রোগীদের সংস্পর্শে না যাওয়া। কেননা, তাদের সংস্পর্শের কারণে রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এমনিভাবে আক্রান্ত অঞ্চল থেকে বেরিয়ে না আসার যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, উলামায়ে কেরাম এর পিছনে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন।
(১) আল্লাহর তা’আলার সিদ্ধান্তের উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং তাঁর উপর ভরসা করা।
(২) অন্যান্য অঞ্চলে রোগ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেই ব্যবস্থা করা।
(৩) যদি মানুষ বেরিয়ে যেতে চায় তাহলে রোগাক্রান্ত অক্ষম ব্যক্তিদের সেবা-শুশ্রুষা করার জন্য কেউ থাকবে না।
মোটকথা, এ ধরণের মহামারী এবং দুর্যোগ আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ। তাই এ ধরণের পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য উচিত হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করা এবং তাঁর কাছে দোয়া করা। তবে এধরণের পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে স্বান্তনা দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘মহামারি আল্লাহ তাআলার একটি শাস্তি। তবে তা মুসলমানদের জন্য আল্লাহর রহমত’। (বুখারী)।
ইসলামের দৃষ্টিতে রোগ সংক্রমণ সংক্রান্ত সংশয় নিরসন
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীস থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, ইসলাম রোগের সংক্রমণে বিশ্বাস করে না। কিন্তু উপরিউক্ত হাদিসে দেখা গেল যে, তিনি রোগাক্রান্ত এলাকায় যেতে নিষেধ করেছেন এবং সেখান থেকে বের হতে নিষেধ করেছেন। তাহলে এই দুই হাদীসের মধ্যে আমরা স্পষ্ট বিরোধ দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু কী এর সমাধান? এর সমাধান হচ্ছে, ইসলাম মূলত রোগ সংক্রমণের বিরোধিতা করেনি। বরং জাহেলি যুগে একজনের দেহ থেকে আরেক জনের দেহে রোগ ছড়িয়ে পড়ার যে ধারণা ছিল সেটির বিরোধিতা করেছে। কারণ,এগুলো হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা ব্যতিত এক দেহ থেকে অন্য দেহে রোগ সংক্রমিত হতে পারবে না। তাই এ সকল মহামারী থেকে বাঁচার জন্য বেশি বেশি করে আল্লাহ তা’আলার কাছে দোয়া করা উচিত।
মহামারী নিয়ন্ত্রণে ইসলাম নির্দেশিত পন্থাসমূহঃ
মহামারী ছড়িয়ে পড়ার সময় সচেতনতা এবং আল্লাহ তা’আলার কাছে দোয়া করার পাশাপাশি ইসলাম আমাদেরকে বেশি কিছু পন্থা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছে।
(১) পবিত্রতা এবং পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে পবিত্রতার গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। হাদীসেও বলা হয়েছে ‘পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ’(মুসলিম)। তাই যদি আমরা পবিত্রতা অবলম্বন করি এবং পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকি তবে এ সকল ভাইরাস আর বিস্তৃতি লাভ করতে পারবে না। যদি কেউ প্রতিদিন পাঁচবার ভালোভাবে হাত ধৌত করে তবে রোগ সৃষ্টিকারী জীবানুগুলো আর বেঁচে থাকার পথ খুঁজে পাবে না।
(২) খোলা জায়গায় প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ থেকে বিরত থাকা এবং তা থেকে নিষেধ করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা অভিশপ্তদের কাছ থেকে বেঁচে থাকো’। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, অভিশপ্ত কারা? তিনি বললেন, ‘যারা জনপথে এবং ছায়াদার স্থানে প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করে’। (মুসলিম)
(৩) নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো পাত্রে নিঃশ্বাস প্রক্ষেপণ করতে এবং তাতে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন (আবু দাউদ)। এমনিভাবে তিনি কখনো হাঁচি দিলে হাতের তালু অথবা কাপড় দ্বারা মুখ ঢেকে ফেলতেন এবং আওয়াজ কম করতেন।(তিরমিজি) মাস্ক ব্যবহার এক্ষেত্রে খুবই উপকারী হতে পারে।
(৪) রোগীদের কাছ থেকে পৃথক থাকা। যেটিকে চিকিৎসা বিদ্যার ভাষায় কোরান্টিন বলা হয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো রোগী উটকে যেন কোনো সুস্থ উটের সাথে না রাখা হয়’ (বুখারী,মুসলিম)। এমনিভাবে ইতিপূর্বেও রোগাক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ না করার এবং সেখান থেকে বের না হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
(৫) মৃত প্রাণী ভক্ষণ থেকে বিরত থাকা। কারণ মৃত প্রাণী ভক্ষণে রয়েছে সমূহ ক্ষতি। আমরা কেবল বিসমিল্লাহ বলে জবাইকৃত প্রাণীই ভক্ষণ করব। কারণ জবাই করার সময় যে রক্ত প্রবাহিত হয় এর সাথে গোশতে লেগে থাকা ক্ষতিকর জীবানুগুলো বেরিয়ে যায়। মৃত প্রাণী ভক্ষণের ফলে বিশ্বে অনেক রোগ ছড়িয়েছে। উল্লেখ্য যে, করোনা ভাইরাসের কারণও হচ্ছে চীনাদের বন্য মৃত প্রাণী ভক্ষণে অতি আসক্তি।
এছাড়া সুস্থতার জন্য ইসলাম ধর্মে আরো অনেক উপায়ের কথা বলা হয়েছে। যেমন, কুলি করা। নাকে পানি দিয়ে ঝাড়া দেয়া। আঙ্গুল খিলাল করা। শরীরের অবাঞ্চিত লোম পরিস্কার করা। নখ কাটা এবং গোফ ছাঁটা। যে ব্যক্তি এ সকল উপায় অব্লম্বন করবে সে রুদ্ধ করে দিবে শরীরে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের প্রবেশ পথ।
মহামারী নিয়ন্ত্রণে দোয়াসমূহঃ
আগেই বলেছি মহামারীকে আল্লাহ তা’আলার সিদ্ধান্ত এবং পরীক্ষা মনে করে তাঁর কাছে দোয়া করার কোনো বিকল্প নেই। এ ধরণের পরিস্থিতিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বিভিন্ন দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সবসময় এ দোয়াটি পড়তে বলেছেন,
(اَللَّهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَ الْجُنُوْنِ وَ الْجُذَامِ وَمِنْ سَىِّءِ الْاَسْقَامِ)
অর্থঃ হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই শ্বেত রোগ, পাগলামি, কুষ্ঠ রোগ এবং জানা-অজানা সকল প্রকার দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে। (আবু দাউদ, তিরমিজি)
তিনি আরো একটি দোয়া পড়তে বলেছেন,
(اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الأَخْلاَقِ وَالأَعْمَالِ وَالأَهْوَاءِ وَ الْاَدْوَاءِ)
অর্থঃ হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে নিকৃষ্ট চরিত্র, কাজ, প্রবৃত্তি এবং নিকৃষ্ট ব্যাধিসমূহ থেকে আশ্রয় চাইছি। (তিরমিজি)
এছাড়া এ সময়ে আমাদের উচিত বেশি বেশি করে আল্লাহ তা’আলার কাছে ইস্তেগফার তথা ক্ষমাপ্রার্থনা করা। কারণ, এ ধরণের শাস্তি আমাদের নিজেদেরই উপার্জন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যখন কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা এবং বেহায়াপনা ছড়িয়ে পড়বে তখন তাদের মধ্যে এমন এমন রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়বে যা ইতিপূর্বে দেখা যায়নি (ইবনে মাজাহ)।
আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে সচেতন হওয়ার এবং ইসলাম নির্দেশিত পন্থানুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমাদেরকে সকল প্রকার ক্ষতিকর ব্যাধি এবং মহামারী থেকে নিরাপদ রাখুন। আমিন।
