ইফতেখার জামিল :
বিগত কয়েক বছর ধরে ভারতে মুসলমানদের ওপর অব্যাহত নির্যাতনের প্রেক্ষিতে দেশটিতে মুসলমানদের বসবাস ও ধর্মচর্চার বিষয়ে কিছু গুরতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা, তিন তালাক নিষিদ্ধ ও বাবরি মসজিদের রায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ও আইনিভাবে উগ্র হিন্দুত্ববাদের বৈধতা তৈরি করা হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমে এসেছে যে, হিন্দুপ্রধান অঞ্চল থেকে অনেকে হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, পাশাপাশি জনপরিসরে ধর্মচর্চা নিয়েও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এই প্রেক্ষাপটে অমুসলিম দেশে মুসলমানদের বসবাস নিয়ে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, যার উত্তর খোঁজা জরুরি হয়ে উঠেছে।
সংখ্যালঘু ফিকাহ কেন জরুরি?
মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অমুসলিম প্রধান দেশগুলোতে বসবাস করেন। বর্তমান যুগের আগে এত ব্যাপকভাবে অমুসলিম দেশে মুসলমানদের বসবাস করার চল ছিল না। পাশাপাশি আগে খেলাফত ও শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র থাকায় মুসলিম সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার বিষয়ে অনিশ্চয়তাও কম ছিল। উপনিবেশবাদের প্রেক্ষিতে অনেক মুসলিম দেশ বা অঞ্চল যেমন স্বাধীনতা হারিয়েছে, তেমনি পরবর্তীতে অনেক মুসলমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে নিজ দেশ ছেড়ে অমুসলিম দেশে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
এই শেষ দুই কারণকেও আমরা উপনিবেশের প্রতিক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। উপনিবেশ মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও রাজনৈতিক পরিবেশ নষ্ট করেছে। ব্যাহত করেছে সামাজিক স্থিতিশীলতা। ফলে অর্থনৈতিক ভাগ্যউন্নয়নে পশ্চিমা দেশগুলোতে পাড়ি জমাতে থাকেন মুসলমানরা। পাশাপাশি রাজনৈতিক অসম মেরুকরণে অধিকাংশ মুসলিম দেশগুলোতে নাগরিকরা রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে থাকেন। মিসর, সিরিয়া, ইরাক, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে নিরাপদ জীবনের লক্ষ্যে শিক্ষিত তরুণরা আমেরিকা ও ইউরোপে পাড়ি জমাতে থাকেন। পাশাপাশি জন্মহারে এগিয়ে থাকায় অমুসলিম দেশগুলোতে মুসলিম জনসংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
আফ্রিকার অনেক দেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলেও জনমিতি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে তাদেরকে সংখ্যালঘু করে রাখা হয়। এর দৃষ্টান্ত হিসেবে ইথিউপিয়া ও ইরিত্রিয়ার কথা বলা যায়। পাশাপাশি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন-শাসিত মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রবলভাবে লঙ্ঘিত হয় ও হচ্ছে। সর্বোপরি মুসলিম দেশগুলোতে সেকুলার শাসনে নিরাপত্তা, অধিকার ও জীবিকার প্রশ্নে শিক্ষিত তরুণদের অনেকে বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন। এখানে বলে রাখা ভালো, সৌদি, কাতার বা তুরস্কের মতো উন্নত মুসলিম দেশগুলোতে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ অনেক সীমিত বা অসম্ভব। ফলে সেখানে অনেকে জীবিকার জন্য গেলেও বসবাসের জন্য স্থায়ীবাসের সুযোগ পান না। এভাবে অমুসলিম দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণ মুসলমানদের আবাস গড়ে উঠেছে।
মুসলিম দেশ ও সংস্কৃতিতে যা সহজ ও স্বাভাবিক, অমুসলিম দেশে সেটা ততটা সহজ ও স্বাভাবিক নয়। এখন ইউরোপ, আমেরিকা ও ভারতে অনেকেই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। প্রকাশ্যে ধর্মপালনে বাঁধাপ্রাপ্ত হচ্ছেন। এর প্রেক্ষিতে তাদের জন্য বিশেষ কৌশল ও বিধান গ্রহণ করা জরুরী হয়ে উঠেছে। ফিকাহের কিতাবগুলোতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষায়িত বিধানের কিছু ধারা পাওয়া যায়, তবে আগে অমুসলিম দেশে মুসলমানদের বসবাস এত ব্যাপক না থাকায় বিশেষায়িত সংখ্যালঘু ফিকাহের প্রয়োজনীয়তা কম ছিল। এখন সময়ের প্রয়োজনে অনেক আলেম সংখ্যালঘু ফিকাহ নিয়ে লিখছেন।
অমুসলিম দেশে বসবাসের বৈধতা
অনেকেই খণ্ডিত বোঝাবুঝিতে কিছু হাদিসের বরাত দিয়ে ইদানীং অমুসলিম দেশে মুসলমানদের বসবাসকে সরাসরি হারাম বলে আখ্যা দেন; ইসলাম ও ইসলামি চিন্তার ব্যাখ্যা বুঝতে চেষ্টা করেন না। এতে একদিকে যেমন অমুসলিম দেশে বসবাসকারী মুসলমানদের জীবন আরও অনিরাপদ ও অস্থির হয়ে উঠে, অন্যদিকে তাদের দীর্ঘদিনের স্থায়ীবাসের সাজানো সংসারকে নাকচ করার প্রবণতা তৈরি হয়। তাতে নিরাপত্তা ও অধিকার আদায়ের চেষ্টার পরিবর্তে অমুসলিম দেশে বসবাসকারীদের একাংশের মধ্যে দেশান্তরের চিন্তা প্রবল হয়ে উঠে এবং আরেকাংশের মধ্যে ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতি বিকিয়ে দিয়ে অমুসলিমদের সাথে মিশে যাওয়াই একান্ত কাম্য হয়ে যায়।
ফুকাহায়ে কেরাম অমুসলিম দেশে বসবাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আমার কাছে রাজনৈতিক ফকীহ ইমাম মাওয়ারেদি রহ.-এর ব্যাখ্যা সবচেয়ে গোছানো মনে হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, ইসলামের দৃষ্টিতে কোন অঞ্চলে বসবাসের চারটি ভিত্তি হতে পারে। ক) নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা। খ) আলাদা সংস্কৃতিতে থাকতে পারার সক্ষমতা। গ) দাওয়াতি কার্যক্রম। ৪) রক্ষার প্রয়োজনে যুদ্ধ করার সক্ষমতা। এই চার শর্তের ভিত্তিতে ইমাম মাওয়ারেদী রাহঃ সম্ভাব্য পাঁচটি চিত্রের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আগ্রহীরা বিস্তারিত জানতে ইমাম মাওয়ারেদী রাহঃ আল হাবিউল কাবীর কিতাবটি দেখতে পারেন। ( খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ২২২ ) বলে রাখা ভালো, ইসলামি রাজনীতি চিন্তার কাঠামোবদ্ধ রুপান্তরের ক্ষেত্রে মাওয়ারেদী রাহঃ এর ভূমিকা অনেক। এদিক দিয়ে ভাবলেও তার মন্তব্যের বিশেষ গুরুত্ব বুঝা যায়।
বস্তুত এই চার ভিত্তি মাকাসেদে শরিয়া থেকে আহরণ করা হয়েছে, যাতে আয়াত ও হাদিসের সমর্থন রয়েছে। ক) নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা। ইসলামের দৃষ্টিতে নিরাপত্তা অনেক জরুরী বিষয়। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এমনকি প্রাণ বাঁচাতে বাহ্যিকভাবে কুফুরি প্রকাশেরও অনুমতি আছে। হালাল খাদ্য না পেয়ে মরার মতো অবস্থা হলে আপনি যদি হারাম খাদ্য গ্রহণ না করেন ও মারা যান, তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন। পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতাও অনেক জরুরী বিষয়। কেননা ধর্ম ছাড়া মানুষের জীবন ও জগত অর্থহীন হয়ে যায়। ভালো ও খারাপের নির্দিষ্ট ও জরুরী কোন মানদণ্ড থাকে না। মানুষ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যায়। মানুষের সাথে জীব-জন্তুর কোন পার্থক্য থাকে না। যে সমাজে আপনি আপনার স্বাধীনতা মতো ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রহণ করতে পারেন না, সে সমাজে অধিকারের কোনো বালাই থাকতে পারে না। আপনাকে ধর্ম মানতে না দেওয়ার অর্থ সে সমাজে ফিরআউনের মতো কোনো শাসন ও ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে।
খ) আলাদা সংস্কৃতিতে থাকতে পারার সক্ষমতা। ইসলাম ব্যক্তিগত ধর্ম নয়, ইসলামে সমাজ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ব্যক্তি কখনো একাকী বেঁচে থাকতে পারে না। ধর্ম চর্চা করতে পারে না। এ জন্য কুফুর ও ফাসেকী সংস্কৃতি থেকে বেঁচে থাকা ইসলামের দৃষ্টিতে অনেক জরুরী। অমুসলিম দেশে নিজস্ব সংস্কৃতি ও সমাজ নিয়ে থাকতে না পারলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধার্মিকতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা যায় না। ল্যাটিন আমেরিকা ও অস্টেলিয়ায় অনেক মুসলমান একা থাকার চেষ্টা করেছেন। যার প্রতিক্রিয়ায় এক বা একাধিক প্রজন্মের মধ্যে তাদের ধর্মীয় পরিচয় হারিয়ে গেছে। চীনের উইঘুর নির্যাতনের দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কয়েকদিন আগে নিউইয়র্ক টাইমস মন্তব্য করেছে যে, চীনের উইঘুর নির্যাতনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তারা যদি এক প্রজন্ম ধর্ম ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম চীনা সংস্কৃতির অনুগত হবে, তাদের চিন্তা ও কার্যক্রম আর প্রশ্ন তুলবে না।
গ ও ঘ) ইসলামে দাওয়াত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই উম্মতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেন, এই উম্মত দাওয়াতের কাজ করবে বলেই তারা বিশিষ্ট। আপনি যে সমাজে থাকেন, সে সমাজে ভালো-মন্দের দাওয়াত না দিলে আপনার নিজের চিন্তা ও কার্যক্রম বৈধতা হারাবে, কুফুরি চিন্তা ও কার্যক্রম আদর্শ ও বৈধ হয়ে উঠবে। শুধু অন্যদের ইসলামে আনার জন্যই নয়, সামাজিক বৈধতা ও কার্যক্রম চালানোর জন্যেও সুযোগ থাকলে আপনাকে দাওয়াতি কার্যক্রম চালাতে হবে। পাশাপাশি আপনার নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করতে প্রয়োজনে রাজনৈতিক ও সরাসরি সংগ্রাম করার ক্ষমতা থাকলে আপনার নিরাপত্তা ও অধিকার আরও নিশ্চিত হবে।
ইমাম মাওয়ারেদী রহ. বলেন, যারা নিরাপত্তা, ধার্মিকতা ও পৃথক সংস্কৃতি ধরে রাখতে সক্ষম, তারা অমুসলিম দেশে থেকে যেতে হবে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মুসলিম দেশে ফিরে আসা তাদের জন্য নিষিদ্ধ। কেননা তারা যতদিন নিরাপত্তা ও অধিকারের সাথে অমুসলিম দেশে থাকতে পারবেন, ততদিন সেখানে দ্বীনের আলো জারি থাকবে। এই আলো নেভানোর অধিকার কারো নাই। পাশাপাশি দাওয়াত ও রাজনৈতিক সক্ষমতা কিছুটা শাখাগত বিষয়। এর সক্ষমতা থাকলে মুসলিম দেশে ফিরে আসা আরও শক্তভাবে হারাম। এগুলো ছাড়া শুধু নিরাপত্তা, ধার্মিকতা ও পৃথক সংস্কৃতি ধরে রাখতে সক্ষমতা থাকলেই স্থায়ীবাস ত্যাগ করা বৈধ নয়। অবশ্য যারা অস্থায়ীভাবে গিয়েছেন, তারা এখানে আলোচ্য নন। তবে পৃথক সংস্কৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব না হলে নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকলেও দেশত্যাগ করা বৈধ হয়ে যায়। নিরাপত্তা ও ধর্মীয় অধিকার না থাকলে দেশত্যাগ করা জরুরি হয়ে যায়। অবশ্য দেশত্যাগের শারীরিক বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য না থাকলে তার জন্য মুসলিম অঞ্চলে আসা জরুরী নয়।
কয়েকটি হাদিসের ব্যাখ্যা
তিরমিজি, নাসাই ও আবু দাউদ শরিফে আছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যারা কাফেরদের মধ্যে থাকে, আমি তাদের থেকে দায়িত্বহীন। সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন, কেন? নবীজি উত্তর দেন, কাফের ও মুসলমানের ঘরের আগুন একসাথে দেখা যাবে না। তিরমিজি, বাযযার ও হাকেমের আরেক হাদিসে নবীজি বলেছেন, কাফেরদের সাথে থাকবে না, মাখামাখিও করবে না। কেননা যারা এমন করে, তারা কাফেরদের মতই হয়ে যায়। অনেকে এই হাদিসগুলোর ওপর ভিত্তি করে কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই অমুসলিম দেশে থাকাকে নিষিদ্ধ বলে আখ্যা দেন। পাশাপাশি দারের খণ্ডিত ব্যাখ্যা টেনে আনেন, এতে প্রান্তিকতা তৈরি হয়। অন্যান্য হাদিসের সাথে মিলিয়ে সামগ্রিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করার সুযোগ থাকে না। বস্তুত ইসলাম বোঝাবুঝির এটা সঠিক তরিকা নয়।
প্রথম হাদিসের প্রেক্ষাপট দেখলে জানা যায়, অমুসলিম দেশে মুসলমানদের হত্যার প্রেক্ষিতে নবীজি এই হাদিস বর্ণনা করেন, অর্থাৎ সেখানে নিরাপত্তা সঙ্কট প্রকটভাবে হাজির ছিল। নবীজির এই হাদিস বর্ণনা করার পর সাহাবায়ে কেরাম অবাক হয়ে যান। কেননা সাহাবায়ে কেরাম আগে হাবশায় হিজরত করেন, সেটাও তো মুসলিম দেশ ছিল না, সাহাবায়ে কেরামের অবাক হবার প্রেক্ষিতে নবীজি ব্যাখ্যা করেন, ‘এর অর্থ হচ্ছে পাশাপাশি থাকা ও মাখামাখি করা যে, ঘরের আগুন একসাথে দেখা যায়। পরের হাদিসে আরও স্পষ্টভাবে এসেছে, নবীজি বলেছেন, মাখামাখি করবে না। কেননা যারা এমন করে, তারা কাফেরদের মতই হয়ে যায়। এই দুই হাদিসের ব্যাখ্যায় আরেকটি হাদিসের কথা বলা যায়, যেখানে নবীজি বলেছেন, যারা যাদের অনুসরণ করে, তারা তাদের ভেতরে অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য এখানে আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়, এই লেখায় সেগুলো আলোচনা করা জরুরি মনে করছি না।
হাদিসের ব্যাখ্যার সাথে ইমাম মাওয়ারেদী রহ.-এর বক্তব্য মাথায় রাখলে কোন সংশয় থাকার কথা না। অর্থাৎ যারা নিরাপত্তা, ধার্মিকতা ও পৃথক সংস্কৃতি ধরে রাখতে সক্ষম, তারা অমুসলিম দেশে থেকে যেতে হবে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মুসলিম দেশে ফিরে আসা তাদের জন্য নিষিদ্ধ। কেননা তারা যতদিন নিরাপত্তা ও অধিকারের সাথে অমুসলিম দেশে থাকতে পারবেন, ততদিন দ্বীনের আলো জারি থাকবে। এই আলো নিভানোর অধিকার কারো নাই। তবে পৃথক সংস্কৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব না হলে নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকলেও দেশত্যাগ করা বৈধ হয়ে যায়। নিরাপত্তা ও ধর্মীয় অধিকার না থাকলে দেশত্যাগ করা জরুরী হয়ে যায়। অবশ্য দেশত্যাগের শারীরিক বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য না থাকলে তার জন্য মুসলিম অঞ্চলে আসা জরুরী নয়।
সংখ্যালঘু ফিকাহ : মৌলিক ভিত্তি
ইসলাম ও ইসলামি বক্তব্য একটাই। মৌলিক আকায়েদ, আরকান ও আখলাকে স্থানিক ও কালিক পরিবর্তনে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এখান থেকেই ছাওয়াবেত ও মুতাগাইয়িরাত পরিভাষা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামের কিছু মৌলিক বিষয় কখনোই পরিবর্তনযোগ্য নয়, তবে তার অনেক প্রয়োগ স্থান ও কালের প্রেক্ষিতে পরিবর্তন ও রুপান্তরযোগ্য। অবশ্য এই পরিবর্তন নিজের খেয়াল-খুশি মতো করা যাবে না। দক্ষ আলেমরাই এই কাজ করতে পারবেন। এর জন্য উসূল ও কাওয়ায়েদ আছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে জরুরত, উমুমুল বালওয়া ও তাকওয়ার কথা উল্লেখ করা যায়।
একেই ইমাম শাফেয়ী রহ. একবাক্যে বলেছেন, আল আমরু ইযা দাকা ইত্তাসাআ ও ইযা ইত্তাসাআ দাকা, অর্থাৎ প্রয়োজন সৃষ্টি হলে কিছু বাড়তি সুযোগ দেওয়া হবে, প্রয়োজন অতিরিক্ত সুযোগ সৃষ্টি হলে কিছু বাড়তি কঠোরতা আরোপ করা হবে। কেননা প্রয়োজন সৃষ্টি হবার পরে বাড়তি সুযোগ না দিলে ধর্ম মানা কঠিন হয়ে যাবে। কেউ মৃত্যুপ্রায় অবস্থায় চলে গেলে হারাম খেয়ে জীবন ধারণ করার সুযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের ধর্মচর্চা হুবহু একরকম হতে পারে না। দুই দেশের প্রেক্ষাপট, সুযোগ ও সুবিধা এক রকম নয়। আবার অতিরিক্ত সুযোগ তৈরি হয়ে গেলে কিছু বাড়তি কঠোরতা আরোপ করতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল উপার্জনে হালাল খাবার গ্রহণ করা বৈধ, তবে এখানেও অপচয় বা বিলাসিতা করার কোন সুযোগ নেই। গ্রামের একজন সাধারণ অশিক্ষিত মানুষের জন্য নিছক আকিদা সহিহ করা, নামাজ ও রোজা করে যাওয়াই কাফি, তবে শিক্ষিত ও সক্ষমদের জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করাও জরুরি।
অপরাপর চিন্তা, দর্শন ও ধর্মের সাথে ইসলামের বিশিষ্টতা এখানেই। গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র একটা আদর্শিক চিন্তা প্রস্তাব করে। যা প্রয়োগ করতে পারলেই গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র প্রয়োগ হয়, বিকল্প কমবেশি বা সহজ-কঠিন অনুসন্ধানের সুযোগ নেই। ফলে এগুলো অধিকাংশই ইউটোপিয়া। কাল্পনিক । ইসলাম একটা আদর্শ প্রস্তাব করে। স্থান ও কাল অনুযায়ী তার প্রয়োগের সীমা বলে দেয়। সে অনুযায়ী আমল করতে হয়। এটাই তাকলীফ। আপনি আমেরিকা কি মালয়েশিয়া থাকুন, আপনার স্থান ও কালমাফিক আমলের নমুনা আছে।
সংখ্যালঘু ফিকাহ : কিছু মূলনীতি
কোরআনে আল্লাহ অনেক জায়গায় বলেছেন, সক্ষমতার বেশী আল্লাহ তাআলা দায়িত্ব দেন না। আপনি যা করতে সক্ষম, সে অনুযায়ী আপনার দায়িত্ব নির্ধারিত হবে। আপনি যা করতে সক্ষন নন, যাতে আপনার যোগ্যতা নেই, সেই কাজের দায়িত্ব আল্লাহ আপনাকে দেননি। এদিক থেকে ভাবলে দেখবেন, সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর সক্ষমতা একরকম নয়। তাদের দায়িত্বও তাহলে একরকম নয়। উভয়ের বিশেষ কিছু স্বতন্ত্র দায়িত্ব ও সুযোগ থাকবে। উভয়ের ওপর এক ও অভিন্ন কৌশল ও দায়িত্ব গ্রহণের কোন যুক্তি নেই।
পাশাপাশি সুযোগ থাকলে আল্লাহ সহজকে গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন, আমি দ্বীনকে সহজ করে দিয়েছি, কঠিন করতে চাইনি। নবীজিও অনেক হাদিসে সহজের সুযোগ থাকলে সহজভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বস্তুত অমুসলিম দেশে যারা আছেন, তারা যদি সবসময় দ্বীনের সহজ বিষয়কে পরিপূর্ণভাবে পালন করতে গিয়ে কঠিন করে ফেলেন, তাহলে দেখা যাবে একসময় মূল দ্বীন পালন করাই কঠিন হয়ে যাবে। এটা কোনভাবেই দ্বীনের মাকসাদ নয়। মাওয়ারেদী রাহঃ যেমন বলেছেন, দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ নাই, এই যুক্তিতেও দেশত্যাগ করা যাবে না। অবশ্য সহজ হবার যুক্তিতে নিরাপত্তা ও দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো ছেড়ে দেবার সুযোগ নেই।
দ্বীনের অনেক আমলের ক্ষেত্রে আমলের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা একাধিকতার সুযোগ রেখেছেন।সাধারণ ও সহজ। আজিমত ও রুখসত। যাদের সুযোগ ও সক্ষমতা আছে, তারা আজিমত ও সাধারণকে গ্রহণ করবেন। যারা অক্ষম বা কঠিন অবস্থায় আছেন, তারা রুখসত ও সহজকে গ্রহণ করবেন। একেই ইমাম শাফেয়ী রাহঃ একবাক্যে বলেছেন, আল আমরু ইযা দাকা ইত্তাসাআ ও ইযা ইত্তাসাআ দাকা, অর্থাৎ প্রয়োজন সৃষ্টি হলে কিছু বাড়তি সুযোগ দেওয়া হবে, প্রয়োজন অতিরিক্ত সুযোগ সৃষ্টি হলে কিছু বাড়তি কঠোরতা আরোপ করা হবে। কেননা প্রয়োজন সৃষ্টি হবার পরে বাড়তি সুযোগ না দিলে ধর্ম মানা কঠিন হয়ে যাবে। আবার অতিরিক্ত সুযোগ তৈরি হয়ে গেলে কিছু বাড়তি কঠোরতা আরোপ করতে হবে। বাংলাভাষায় সংখ্যালঘু ফিকাহ নিয়ে বিশেষ কাজ হয়নি, এই লেখাকেও পরিপূর্ণ লেখা বলা যায় না। তবে সংখ্যালঘু ফিকাহ পাঠের ভূমিকা হিসেবে এই লেখাকে বিবেচনায় নিলে কিছু তথ্য এখান থেকে গ্রহণ করা যেতে পারে।
লেখক : তরুণ আলেম; সম্পাদক, ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর ডটকম
