‘সফট হিন্দুত্ববাদ’ : ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মবাদী ধারার মুখ ও মুখোশ

‘সফট হিন্দুত্ববাদ’ : ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মবাদী ধারার মুখ ও মুখোশ

রাকিবুল হাসান :

খুব দ্রুতগতিতেই যে ভারত হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রথমেই কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল করে উপত্যকাটি নিয়ে আসা হলো কেন্দ্রের দখলে। তারপর বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের রায় ঘোষণার মাধ্যমে জোর করেই দেখানো হলো হিন্দুত্বের জয়। তারপর সর্বশেষ নাগরিত্ব আইন পাস করে একদম অপ্রাসঙ্গিক এবং অপাঙতেয় করে দেয়া হলো মুসলিমদের। কাশ্মীর এবং বাবরি মসজিদ ইস্যুতে জনগণ রাস্তায় নেমে না এলেও নাগরিত্ব আইনের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে। মুসলিমদের সঙ্গে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে শামিল হয়েছে হিন্দুরাও।

১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলেও নেহরু-গান্ধীরা সবধর্মকেই জায়গা দিয়েছেন ভারতে। সংবিধানে দেয়া হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতার আবরণ৷ যেন সবাই মিলেমিশে থাকতে পারে। কিন্তু আরএসএস এবং বিজেপি সেই আবরণ উপড়ে ফেলে নির্লজ্জ হিন্দুত্বের ধ্বজা উড়াচ্ছে চারদিকে। রাজনৈতিক এবং সামরিকভাবে প্রদর্শন করছে হার্ড হিন্দুত্ববাদ; কাশ্মীর এবং বাবরি মসজিদ মামলার রায় তার প্রমাণ। সাংস্কৃতিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে প্রদর্শন করছে সফট হিন্দুত্ববাদ; নাগরিত্ব আইনের প্রতিবাদে জনগণ রাস্তায় নেমে এলে যা খুব প্রকটভাবে ধরা পড়ে।

সফট হিন্দুত্ববাদ হলো—যেখানে সরাসরি অস্ত্র ব্যবহার করা হয় না। সরাসরি সমর্থন কিংবা প্রতিবাদ জানানো হয় না, বরং ভেতরে ভেতরে হিন্দুত্ববাদকেই সমর্থন দিয়ে যাওয়া হয় ও সমর্থনে প্ররোচিত করা হয়। সাফাই ও ব্যাখ্যা দান করে সম্মতি উৎপাদন করা হয়।

ভারতীয় অভিনেতাদের মুখোশ

নাগরিত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মাত্রা পায় জামিয়া মিল্লিয়া এবং আলিগড়ে পুলিশি হামলার পর। আগে অনেকে চুপ থাকলেও জামিয়ায় হামলার পর নাগরিত্ব আইনের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন অনেকে। কিন্তু কঠিন এই সময়ে রহস্যজনকভাবে মুখ খুলেননি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বড় বড় অনেক মুসলিম সেলিব্রিটি। তাদের মধ্যে অন্যতম আমির খান, সালমান খান, শাহরুখ খান। মুখ খুলেননি হিন্দু সাংস্কৃতিক কর্মীরাও। এতে তাদের প্রতি ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছে ভারতের নেটিজেনরা।

বরং জামিয়া মিল্লিয়ায় পুলিশি হামলার একদিন পর জামিয়ার ছাত্রদের ব্যঙ্গ করে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে টুইটারে। আর এই ব্যঙ্গাত্মক পোস্টে লাইক দিয়ে সমর্থন জানান অক্ষয় কুমার। এই লাইকের স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়ে পড়লে ক্ষোভের মুখে পড়েন বলিউডের এই অভিনেতা। তোপের মুখে লাইক সরিয়ে নিয়ে টুইটার বার্তায় দেয়া সাফাইনামায় বলেন, ‘ভুল করে লাইক পড়ে গেছে। আমি কখনো এসব সমর্থন করি না।’

তবে কয়েকজন তরুণ অভিনেতা নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে ভারতীয় টিভির পরিচিত মুখ সুশান্ত সিং প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন। তাই তাকে ‘সাবধান ইন্ডিয়া’ শো থেকে বহিষ্কার করা হয়। শুধু শো থেকে নয়, টিভির চাকরিটাই তার চলে যায়। চাকরি হারানোর ভয়ে হয়ত আরও অনেকে হয়ত মুখ খুলছেন না।

সাদ গুরুর বাংলাদেশ দখলের আহ্বান

ভারতের একজন আধ্যাত্মিক নেতা সাদ গুরু। গত জুলাইয়ে হিন্দুত্ববাদী অভিনেত্রী কঙ্গনা রানৌতের ‘ভারতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে সরাসরিই বলেছেন, ‘যদি বাংলাদেশকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া হয়, তাহলে আমাদের কোনো সমস্যা থাকবে না। যখন যার ইচ্ছে, সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসবে। বাংলাদেশকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে একদেশে পরিণত করতে ভারত প্রস্তুত।’

সাদ গুরুও কিন্তু শান্তির কথা বলেই প্রসঙ্গটা টেনেছেন। ভাগ যত বাড়বে, অশান্তি তত বাড়বে। তাই তিনি বাংলাদেশকেও ভারতের অন্তর্ভুক্ত করে নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদ তিনি জানাবেন না তা বলাই বাহুল্য। এবং জানানওনি।

কঙ্গনার আরেক প্রশ্নে এনআরসি প্রসঙ্গে বিজেপিকে সমর্থন দিয়ে সাদগুরু বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের অবশ্যই জানতে হবে তার মাটিতে কে কে বাস করছে এবং কে কোথায় থেকে এসে বাস করছে। এটা জানা ছাড়া একটা দেশ চলতে পারে না।’ কখনো শান্তির নামে, কখনো পরিচয়ের নামে, কখনো ন্যাশন ও জাতির নামে তিনি মূলত হিন্দুত্ববাদকে শুধু সমর্থনই দিয়ে যাচ্ছেন না, বরং মানুষকে তার পক্ষে জাগাচ্ছেনও। রাজনৈতিক নেতাদের দেশভক্তির বাণীর চেয়ে আধ্যাত্মিক নেতাদের দেশভক্তির বাণী মানুষ বিশ্বাস করে খুব। তাই বিজেপিও দেশভক্তির নামে ভোট কামানোর ষড়যন্ত্রে ব্যবহার করছে আধ্যাত্মিক নেতাদের। তাই বলা যায়, ইয়োগা, আধ্যাত্মবাদ এবং শান্তি নিয়ে কথা বললেও আদতে তিনি একজন হিন্দুত্ববাদের প্রবক্তা।

ভারতীয় ক্রিকেটারদের নীরব সমর্থন

নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে মুখ খুলেননি ভারতীয় ক্রিকেট অঙ্গনের কেউ। বরং আরও সমর্থন দেবার চেষ্টা করেছে অনেকেই। ভারতীয় ক্রিকেটের কিংবদন্তি সৌরভ গাঙ্গুলির মেয়ে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে কঠিন ভাষায় প্রতিবাদ করে পোস্ট দিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে গাঙ্গুলি তার মেয়েকে ডিফেন্ড করে বলেছিল, ‘তার মেয়ে ছোট। তাই না বুঝে এমন পোস্ট করেছে।’ তার মানে সৌরভ নাগরিকত্ব আইনকেই সমর্থন করছেন। কিন্তু এর দুদিন পর সৌরভ মুখ খুললেন খুবই হালকাভাবে। বললেন, ‘সবারই শান্তভাবে প্রতিবাদ করা উচিত। শান্তি বজায় রাখা দরকার।’ প্রতিবাদ না করে শান্তির কথা বলেছেন অনেকেই।

এই শান্তির বাণী মূলত নরেন্দ্র মোদির সুরে গাওয়া গান। নাগরিত্ব আইন পাসের পর নরেন্দ্র মোদি টুইটে বলেন, ‘এখন বিভিক্ত হওয়ার সময় নয়; বরং একসঙ্গে শান্তি বজায় রাখা দরকার।’

হার্ড হিন্দুত্ববাদ মানুষের চোখে যতটা পড়ে, সফট হিন্দুত্ববাদ ততটা চোখে পড়ে না। আরএসএস এবং বিজেপি ভারতকে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হার্ড এবং সফট দুটো শক্তিকেই ব্যবহার করছে। নাগরিত্ব আইনের মাধ্যমে আরেকবার খসে পড়ল সফট হিন্দুত্ববাদের ধ্বজাধারী এইসব সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক গুরুদের মুখোশ। প্রান্তিকতা এবং বৈষম্যের হিন্দুত্ববাদী আইন করে শান্তির বাণী দেয়াটা কেমন যেন হিংস্র মুখে কমনীয়তার মুখোশ পরা। মুখোশ দেখে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, দ্বিধায় পড়ে। ভারতের সাংস্কৃতিক এবং আধ্যাত্মিক গুরুদের পুরোটাই মুখোশে ঢাকা। কখনো কখনো ঘটনার আকস্মিকতায় সেই মুখোশ খুলে পড়ে।

আগের সংবাদহিন্দুত্ববাদের সমালোচনায় শশী থারুর: বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
পরবর্তি সংবাদইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ বন্যা, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৩