সাফর আল হাওয়ালি : সৌদির সংস্কারকামী আলেম

সাফর আল হাওয়ালি : সৌদির সংস্কারকামী আলেম

মুজাহিদুল ইসলাম :

পবিত্র ভূমি সৌদি আরব। পৃথিবীর চারদিক থেকে খোদাপ্রেমীরা আসে এই ভূমিতে। এই ভূমির শাসকদের বলা হয় খাদেমুল হারামাইন তথা দুই পবিত্রস্থানের সেবক। চারদিকে প্রাচুর্য আর প্রাচুর্য। জ্বালানি শক্তির বড় ভাণ্ডার তাদের হাতে। মুসলিম ছাড়াও বিশ্বের বড়-বড় অমুসলিম শক্তিও তাদের মুখাপেক্ষী। নাটকীয় বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে ইরাকের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত আক্রমণ করে। মধ্যপ্রাচ্য ও বিশেষভাবে সৌদি আরব হুমকি অনুভব করে তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যের অদ্বিতীয় ইরাকী সামরিক শক্তির। বহিঃশক্তি তথা আমেরিকান শক্তির সাহায্য গ্রহণের প্রয়োজন অনুভব করেন সৗদির শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু সেজন্য প্রয়োজন দেশের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। তাদের নিকট থেকেও মিলে যায় ফতোয়া।

কিন্তু সৌদি আরবের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা এবং একসময়ে সৌদির স্বার্থে ব্যবহৃত নতুন যুবশক্তির মধ্য থেকে নীরবতার জানালা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে প্রতিবাদের একটি আওয়াজ। তিনি হলেন সাফর আল হাওয়ালি। শুরু হয় তাকে নিশ্চুপ করার বিভিন্ন মাধ্যম। সর্বশেষ গ্রেফতার ও নির্যাতন। পাঁচ বছর পর মুক্তি মিললেও ইরাকে মার্কিন হামলার সময় প্রতিরোধের আহবান জানিয়ে আশংকার মুখে পড়েন। যদিও ব্রেনস্ট্রোকের কারণে দৃষ্টির আড়ালে চলে যান তিনি।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে মিসরের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির উৎখাতে সৌদির সহযোগিতা, দখলদার ইজরাইলের ওপেন-সিক্রেট সমর্থক আরব আমিরাতের সাথে দরহম-মহরম, ইজরাইল থেকে ইরানকে বড় শত্রু জ্ঞান করা এবং কাতার অবরোধ নিয়ে সৌদির ভূমিকাকে সৌদির ভূমিতে থেকেই কঠোর সমালোচনা করে বই লেখেন শয্যাশয়ী সাফর আল হাওয়ালি।

সৌদির ভেতর নতুন এই প্রজন্ম বেড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট, সাফর আল হাওয়ালির একাধিকবার সৌদিপ্রশাসনের মুখোমুখি দাঁড়ানো এবং বলতে গেলে সাফর আল হাওয়ালির লিখিত প্রতিবাদের এক চিত্র ফুটে উঠেছে এই লেখায়। শায়খ সমালোচনা করেছেন সৌদিপ্রশাসন, ধর্মীয় নেতৃবর্গ ও তার বিদেশী সহযোগিদের।

মিসর ও সিরিয়ায় ইখওয়ান ও ইসলামপন্থীরা নির্যাতনের মুখে সৌদি আরবে আশ্রয় গ্রহণ করে। সৌদি আরব তাদের সাদরে গ্রহণ করে। এমনকি সৌদির শিক্ষাব্যবস্থা ট্রাডিশনাল ও বিপ্লবী ধারার মিশ্রণে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সৌদি শায়খ আব্দুর রহমান আদ্দুসরী, মুহাম্মাদ আহমাদ রাশিদ ও সাইয়েদ কুতুবের ভাই মুহাম্মাদ কুতুবসহ অনেকের তত্বাবধানে প্রতিবাদ ও বিপ্লবধর্মী প্রজন্ম গড়ে ওঠে। খোদ মুহাম্মাদ কুতুবের হাতে সাফর আল হাওয়ালি মাস্টার্স ও পিএইচডির থিসিস সম্পন্ন করেন।

নতুন প্রজন্ম সৌদির বিন বাজ ও শায়েথ উসায়মিনসহ অন্যন্য ট্রাডিশনাল আলেমদের যথেষ্ঠ সমীহ করতেন। তারাও নতুন প্রজন্মকে সন্তানের মতো মনে করতেন। বাইরে থেকে আসা ইখওয়ানী এবং দেশীয় ওয়াহাবী শায়খ ইবনে আব্দুল ওহহাব, বিন বাজ ও উসায়মিনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা প্রজন্ম পরবর্তীতে ‘সাহওয়া’ প্রজন্ম (রেনেসাঁ প্রজন্ম) নামে পরিচিত হন।

নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে গণমানুষের মধ্যে অবস্থান করে নেন। অনেক সময় ট্রাডিশনাল আলেমদের বিপরীত বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে তাদের ব্যাকফুটে পাঠিয়ে দিতেন। কিন্তু নতুন প্রজন্ম তাদের যথেষ্ঠ সমীহ করার মাধ্যমে কোন ধরনের বৈষসাদৃশ অনুভূত হতে দিতেন না। তবে সৌদিপ্রশাসন আশংকার জায়গা থেকে প্রধান মুফতির পদ বিলুপ্ত করে বিভিন্ন ধর্মীয় অথরিটি গঠন করে। যারা আইন প্রণয়নসহ সবকিছুতে মতামত প্রদান করতেন।

সরকার নতুন এই রেনেসা প্রজন্মকে নব্য লিবারেলদের বিপক্ষে ব্যবহারও করেছে। আফগান যুদ্ধে সৌদির যতটুকু ভূমিকা, তার ফিল্ড বাস্তবায়ন মূলত এই প্রজন্মের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

উপসাগরীয় যুদ্ধ ও বিরোধিতার সূচনা

উপসাগরীয় যুদ্ধের সূচনাতে বিদেশী সৈন্য মক্কাভূমিতে আনার বিষয়ে যখন ধর্মীয় অথরিটি থেকে ফতওয়া এলো, চারপাশ থেকে কেউ কোনো আওয়াজ তুললো না। তবে সেই নতুন প্রজন্মের সদস্য সাফর আল হাওয়ালি বক্তব্য দিলেন, ‘আল্লাহ আমাদেরকে অবশ্যেই জিজ্ঞেস করবেন, আমাদের ইলম সম্পর্কে, যা আমরা প্রকাশ করিনি। আমাদের জিজ্ঞেস করবেন দলীল সম্পর্কে, যা আমরা পৌঁছাইনি।জিজ্ঞেস করবেন সত্য সম্পর্কে, যা আমরা বলিনি কিংবা আংশিক বলেছি আর কখনো বা একদমই বলিনি।’

শুরু হলো তোলপাড়। তার আলোচনা ও ভাষণ সে সময়ের জনপ্রিয় মাধ্যম ক্যাসেটে ও টেপরেকর্ডে চলতে থাকে। হওয়ালির সাথে কণ্ঠ ধ্বনিত হলো সতীর্থ সালমান আওদাহের। হাওয়ালি এবার বই প্রকাশ করে বিন বাজসহ সৌদি আলেমদের নীরবতা, সত্যগোপন ও দ্বীমুখী আচরণের বিরোধিতা করেন।

দমন-পীড়ন ও গ্রেফতার

রাষ্ট্রীয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা সাফর আল হাওয়ালিসহ প্রতিবাদী ব্যক্তিদের সাথে আলোচনা করে তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোন কাজ হলো না। সাফর আল হাওয়ালিসহ সকলের টেপরেকর্ডার নিষিদ্ধ করা হল। দেশ ত্যাগের নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ শেষে গ্রেফতার করা হয় শায়খ সাফর আল হাওয়ালিকে।

মুক্তি ও পুনরায় রাজবংশের সমালোচনা

পাঁচ বছর পর সাফর আল হাওয়ালি জেলখানা থেকে বের হন। স্বাভাবিকভাবেই চলছিল সবকিছু। কিন্তু এরমধ্যেই ঘটলো টুইন টাওয়ার হামলা। বিশ্বজুড়ে নতুন আতংক দেখা দিল। ২০০৩ সালে যখন আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করলো, তিনি ‘বুশের প্রতি খোলা চিঠি’ শিরোনামে একটি চিঠি প্রকাশ করলেন। ইরাকের পক্ষে আমেরিকার অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে সবাইকে লড়াইয়ের আহ্বান জানালেন সাফর আল হাওয়ালি। এবার শায়খ গ্রেফতারের আশংকার মধ্যেই ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এ যাত্রায় তিনি গ্রেফতার হওয়া থেকে বেঁচে যান ঠিক, কিন্তু শয্যাশয়ী হয়ে গেলেন একেবারে।

স্ট্রেচার থেকে লেখা বই

সাফর আল হাওয়ালি ২০১৮ সালে রোগশয্যা থেকেই লিখেন ‘মুসলমান ও পাশ্চাত্য সভ্যতা’ নামক বই। বইয়ে ‘সৌদি শাসক পরিবারের প্রতি’ শিরোনামে মিসরের নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মুরসিকে উৎখাতে অঢেল পয়সা নষ্ট করা, সিসির অন্যায় জুলুম-নির্যাতনে সমর্থন, শত্রুতায় ইজরাইলকে গৌণ বানিয়ে ইরানকে টাইমলাইন আনা, আরব আমিরাতের যুবরাজের সাথে সখ্য, আমেরিকা থেকে কাড়ি কাড়ি প্রেট্রোডলার দিয়ে অস্ত্র ক্রয়, ইয়েমেনে হামলা ও কাতার অবরোধ নিয়ে তাদের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন,’দেশের শাসন মুহাম্মাদ সা. এর ওপর অবতীর্ণ ইসলাম অনুসারে নয়, বরং সৌদি রাজবংশের ইসলাম অনুসারে হচ্ছে।’

সাফর আল হাওয়ালি সিসির সমালোচনা করে বলেন, ‘আল্লাহ কি সিসিকে এতো সুজলা-সুফলা ভূমি দিয়েছেন ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য, বাশার আল আসাদ, ইরান ও লিবিয়ার বিদ্রোহী হাফতারকে সহাযোগিতা করার জন্য এবং গাজার ওপর অবরোধ আরো মজবুত করার জন্য?’

সাফর আল হাওয়ালি আমেরিকার সন্ত্রাসের প্রধান পৃষ্ঠপোষকতা ও সৌদির সহযোগিতার সমালোচনা করে বলেন, ‘আমি সৌদি রাজপরিবারকে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনকে সহযোগিতার মাধ্যমে সন্ত্রাসের সহযোগিতা না করার উপদেশ দিচ্ছি। তারা আমাদের জনগণের সাথে সন্ত্রাসের চর্চা করে, আমাদেরকে ইহুদিদের বিমান দ্বারা আক্রমণ করে কিংবা গাজা ভুখণ্ড অবরোধ করে ফিলিস্তিনের মজলুমদের অভিযুক্ত করে। বিশ্ব ইতিহাসের সবচে বড় সন্ত্রাসী আমেরিকা। তারা রেড ইন্ডিয়ানদের গণহত্যা করেছে। পরিবেশ চার্টার, আন্তর্জাতিক অপরাধ চার্টার, শিশুঅধিকার চার্টারে স্বাক্ষরে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।’

আগের সংবাদসম্পন্ন হলো আল্লামা আনোয়ার শাহ’র জানাযা
পরবর্তি সংবাদনাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, গুলিবিদ্ধ জামিয়ার ছাত্র