মুজাহিদুল ইসলাম :
আল সৌদ পরিবারের শাসনকালে রাষ্ট্রের ভীত কাঁপানো আন্দোলন তেমন একটা দেখা যায়নি। মুসলিম ব্রাদারহুড-অনুপ্রাণিত সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সাহওয়া আন্দোলন ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ দশকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মিসর ও সিরিয়া সরকারের দমনপীড়ন থেকে বাচঁতে অনেকে পলায়ন করে সৌদিতে চলে আসেন। তখন বাদশাহ ফয়সাল ক্ষমতায়। তাদেরকে স্বাধীনভাবে নিজেদের চিন্তা-চেতনার প্রচার-প্রসারের সুযোগ দেন।
সম্প্রতি সৌদি ক্রাউন প্রিন্স বিন সালমান সাহওয়ার সাথে সম্পৃক্ত বা অনুপ্রাণিত ধর্মীয় শিক্ষাবিদসহ গুরুত্বপূর্ণ ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমনপীড়ন শুরু করেছেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন সালমান আওদাহ, আয়েজ আল কারনী ও আলী আল ওমারীর মতো বিখ্যাত স্কলার।
সাহওয়া আন্দেলনের আদর্শ
প্রাথমিকভাবে সাহওয়া কালচারাল বিভিন্ন সংস্কারধর্মী কাজের সাথে যুক্ত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনীতি নিয়েও তাদের ভাবনা প্রকাশ পেতে শুরু করে। এ আন্দোলন যুবকদের কাছে টানতে সক্ষম হয়। মুসলিম পরিচয়ে গৌরববোধ করা ও বিশ্ব-মুসলিমের প্রতি নিজেদের দায়িত্ববোধের কথা যুবকদের মাঝে ছড়িয়ে দেয় এ আন্দেলন। সাহওয়া-প্রভাবিত বিভিন্ন জামাত যুবকদের জন্য গ্রীষ্মকালীন বিভিন্ন শিক্ষা ও সামাজিক কোর্স আয়োজন করতে থাকে।
ঐতিহ্যগতভাবে সৌদি ইসলামী স্কলারগণ রাজপরিবারের মর্জি মাফিক তাদের ধর্মীয় ভূমিকা পালন করে থাকেন। কিন্তু সাহওয়া আন্দেলনের ফলে একসময় এমন ইসলামী স্কলারগণ সামনে চলে আসেন, যারা রাষ্ট্রপরিচালনায় রাজনীতি ও ভোটিং সিস্টেমের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন। ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে তুলে আনার চেষ্টা করতেন।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক ইসলামী আন্দেলন ও সৌদির রাজনৈতিক ইতিহাস বিষয়ক গবেষক আলী আল আহমাদ বলেন, রাষ্ট্র সাহওয়ার এ চিন্তা-চেতনাকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছে। রাষ্ট্রের শাসকদের প্রতি আনুগত্যের প্রচলিত ধারা সৌদি ওয়াবিয়্যাতের নয় বলে তারা এক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।
কিভাবে প্রভাবশালী হলো সাহওয়া
সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্র সাহওয়া আন্দেলনের পুরোধাদের ওপর নির্যাতনের স্ট্রীম রোলার চালালেও মূলত রাষ্ট্রের সহায়তায় বরং রাষ্ট্রের পরিচালনায় সাহওয়া আন্দোলন গড়ে ওঠে। সৌদি সরকার নিজ স্বার্থেই সাহওয়াকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেয়; ইরানে খোমেনীর উত্থানের জবাব ও আফগান যুদ্ধে মুজাহিদীনদের সহায়তার মাধ্যম হওয়াতে সাহওয়া টাইম লাইনে চলে আসে।
১৯৭৯ সালে ইরানী বিপ্লব সংগঠিত হয়। খোমেনীর ঘোষণা আসে, জালিম মুসলিম শাসক থেকে নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য ইসলামই সর্বোত্তম সমাধান। সৌদিতেও স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ আছে এবং যেকোন শিয়া আন্দোলন প্রতিরোধের জন্য সাহাওয়ার কার্মকাণ্ডে সরকারের পক্ষ থেকেই আসে বেশ আনুকূল্য। গতিশীলতার জন্য যা কিছু দরকার, তৎকালীন সৌদি সরকার সবকিছুর ব্যবস্থা করে। সাহওয়াও দেশে-বিদেশে ইরানী প্রভাব প্রতিরোধে ও সৌদি শাসক পরিবারের ভাবমূর্তি বৃদ্ধির জন্য সবকিছু করে।
তাছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন হিসেব-নিকেশে যখন সৌদি আরব আফগান জিহাদে মুজাহিদীনদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন তা বাস্তবায়নে সাহওয়া সবচে বড় ভূমিকা রাখে। অনেক সৌদি যুবক আফগান জিহাদে অংশগ্রহণ করে। সৌদি সরকার তাদের কোন বাধা দেয়নি। বরং আফগান মুজাহিদ নেতৃত্বকে রিয়াদে স্বাগত জানানো হতো।
সাহওয়ার সাথে সৌদির ক্রমশ সম্পর্কচ্ছেদ
সাহওয়ার সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক জোয়ার-ভাটার ইতিহাস। কিন্তু সরকারের সাথে সাহওয়া আন্দেলনের প্রথম বড় মাপের ফাটল শুরু হয়, যখন জাজিরাতুল আরব থেকে তারা মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি তোলেন। সালমান আওদাহ ও সাফর আল হাওয়ালীর মতো স্কলারদের নেতৃত্বে এ আন্দোলন বারো দফা দাবী পেশ করে। যেখানে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, বিচারিক সংস্কার ও দুর্নীতি দমনের মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়।
রাষ্ট্র এটা ইতিবাচকভাবে নেয়নি। ১৯৯৪ সালে আওদাহসহ সাহওয়া নেতৃত্বের ওপর শুরু হয় দমনপীড়ন। পরবর্তীতে তারা মুক্তি পেয়ে সরকারী চিন্তা-চেতনার পরিবাহী হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেন। বিশেষত টুইন টাওয়ার হামলার পরে চরমপন্থা মোকাবেলায় সালমান আওদাহসহ অনেকেই সরকারকে বেশ সহযোগিতা করেন।
কিন্তু ২০১১ সালে আরব বসন্তে আবারো হিসেব পাল্টে যায়। সালমান আওদাহসহ সাহওয়ার সাবেক অনেক নেতৃত্ব আরব বসন্তকে সমর্থন করেন। পাশাপাশি হালকাভাবে সৌদিতে সংস্কারের আওয়াজ তোলেন।
সাহওয়া নেতৃত্বের ওপর বিন সালমানের দমনপীড়ন
বলতে হয়, সৌদি আরব কোন ধরণের বিপ্লবী চিন্তাকে আশ্রয় দিবে না। যেকোন ভিন্নমতকে সমূলে বিনাশ করবেই। বিন সালমান ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার পর থেকে ইসলামপন্থীসহ গুরুত্বপূর্ণ ভিন্ন-মতাবলম্বীদের ওপর বিশেষত সাহওয়া-সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে।
সৌদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আলী আহমাদ বলেন, বিন সালমান স্বাধীন কণ্ঠরোধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যারাই কোন পরিবর্তন ও মৌলিক স্বাধীনতার দাবী তোলার চেষ্টা করবে, তাদের আওয়াজকে যেকোন মূল্যে রোধ করা হবে।
সাহওয়ার ভবিষ্যৎ
সৌদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আলী আহমাদ মনে করেন, সাহওয়া-নেতৃত্বের ওপর সাম্প্রতিক দমনপীড়ন সাহওয়া ও রাষ্ট্রের চূড়ান্ত বিচ্ছেদ। সাহওয়াকে যদি আবার স্বাধীনতা দেয়া হয়, তা সরকার হতেও আরো শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসবে। কারণ, তার সম্পর্ক সমাজের গভীরে। যদি আওদাহ ও অন্যদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ওপর থেকে মানুষের আস্থা পুরো উঠে যাবে।’
তিনি বিশ্বাস করেন, দমনপীড়ন সত্বেও সাহওয়া টিকে থাকবে। এমবিএসের দমনপীড়ন ব্যর্থ হবে। কারণ, আদর্শকে দমিয়ে রাখা যায় না। সময় এলে মানুষ আবার আবির্ভূত হবে এবং আবার নিজেদের প্রকাশ করবে।
