সুপ্রভাত ফিলিস্তিন : ইহুদিদের অনিঃশেষ জুলুমের মর্মস্পর্শী ধারাভাষ্য

হামমাদ রাগিব

সুপ্রভাত ফিলিস্তিন পড়তে পড়তে আপনার চোখের কোণায় কখন যে জল জমা হবে, আপনি টেরই পাবেন না। আইনুল হুজ গ্রামটার জন্য আপনার বুক হাহাকার করে উঠবে। হাহাকার করে উঠবে আইনুল হুজের তিন আর আঙ্গুর-বিথীকার জন্য। চঞ্চলা-চপলা বেদুইন বালিকা ডালিয়া যখন নূপুর পরে চষে বেড়াবে জয়তুন-বিথীকার ফাঁক-ফোকর দিয়ে, তার নূপুরের আওয়াজ আপনাকে মোহিত করে ফেলবে। আপনার মনে পড়ে যাবে শৈশবের হারানো প্রেমিকার কথা। সাগরের জলের মতো শান্ত গভীর হাসানের সঙ্গে আপনিও মেয়েটার প্রেমে পড়ে যাবেন। দারবিশের ঘোড়া হাঁকানো আপনাকে নিদারুণ আনন্দ দেবে।

তারপর?

তারপর একদিন আইনুল হুজ গ্রামে আসবে ইসরায়েলি সৈন্যরা। গ্রামের মানুশ তাদেরকে দাওত খাওয়াবে। নেমকহারামের দল পেট পুরে খেয়ে পরদিন এসে গ্রামবাসীকে তাড়িয়ে দেবে। ট্যাংক আর কামানের আঘাতে গুড়া গুড়া করে ফেলবে তাদের বাড়ি-ঘর। আপনার বুকটা হাহাকার করে উঠবে। ছোট্ট দুধের শিশু ইসমাইলকে কেড়ে নেবে এক ইসরায়েলি সৈন্য। ডালিয়ার সাথে আপনার পুরা সত্ত্বাটা তখন হু হু করে কেঁদে উঠবে।

জেনিনের মানবেতর ঘিঞ্জি আশ্রয়শিবির। আমাল আর হুদার পুতুলখেলা। ইসরায়েলিদের নৃশংসতা। উফ!

হাসান সেই নৃশংসতায় হারিয়ে যাবেন। কোথায় হারাবেন কেউ জানে না। ইউসুফের উপর সে কী জুলুম!

জেনিন থেকে আমালের সঙ্গে আপনি চলে যাবেন কুদসের এক এতিমখানায়। এত দুঃখের মাঝেও, শোক আর সব হারানো কষ্টের মাঝেও আমালরা কীভাবে নিজেদের বেঁচে থাকার আনন্দ জোগাড় করে, আপনি দেখবেন। তারপর যাবেন আমেরিকা। আমেরিকার আলোবাতাস ভোগ করবেন আমালের সঙ্গে। আমালের মনখারাপ করা বিকেলগুলো, যেখানে থাকবে শৈশববন্ধু হুদার স্মৃতি, বাবা হাসানের কবিতা-পড়া-সকাল, সকালের কবিতামাখা মিষ্টি রোদ–আপনার শুধু হাহাকার জাগবে, আমালের সঙ্গে হু হু করে আপনিও কেঁদে উঠবেন।

তারপর যাবেন লেবানন। ইউসুফ আর ফাতেমার সুখের একটা সংসার গড়ে উঠেছে সেখানকার এক ঘিঞ্জি ক্যাম্পে। আমালের সঙ্গে আপনারও পরিচয় হয়ে যাবে মাজেদের সাথে। মাজেদ আর আমালের বিয়ে। সেই পুরানো দিনগুলির সুখ আবারও ফিরে আসবে। কিন্তু সেইটা ক্ষণিকের জন্য। হঠাৎ দপ করে নিভে যাবে সব, বৈশাখের প্রলয়ংকারী তুফানের মতো তছনছ হয়ে যাবে আমালের অন্তঃসত্ত্বাওয়ালা জীবন। ফাতেমা আর তার গর্ভে থাকা সন্তান, পাশে কয়েকবছরের মেয়ে ফিলিস্তিন, গর্ভের অনাগতা শিশুটি ছেঁড়া পেট থেকে বের হয়ে আসছে–সবাই উপুড় হয়ে পড়ে আছে নির্জীব–দূর আমেরিকা থেকে এই রকম একটা স্থিরচিত্র দেখে আমালের জীবনটাও স্থির হয়ে যাবে সেইখানেই। তারপর আরও অনেক কিছু… অনেক কিছু… অনেক…। সেই ১৯৪১ থেকে শুরু, অন্তহীন শুরু, ফিলিস্তিনের হতভাগ্য গল্প, যেই গল্পের কোনো শেষ নাই, যেই নির্মমতার কোনো সমাপ্তি নাই, চলতেই আছে… চলতেই আছে… কত জনম চলবে, কে জানে!

বইটির শেষ পাতায় আসতে আসতে আপনি কেঁদে উঠবেন নিদারুণ এক হাহাকার বুকে নিয়ে। আপনার ভেতরের বিবেকবোধ স্থবির হয়ে পড়বে অব্যক্ত কোনো যন্ত্রণায়।

উপন্যাস হলেও ফিলিস্তিনের জীবন্ত বাস্তবতা বইয়ের প্রতিটা পাতায় হাহাকার করে ফিরেছে।

মর্নিংস ইন জেনিন : সুপ্রভাত ফিলিস্তিন। খ্যাতনামা ফিলিস্তিনি উপন্যাসকার সুজান আবুলহাওয়ার মর্নিংস ইন জেনিনের বাংলা অনুবাদ এ বইটি। ঝরঝরে ও প্রাঞ্জল ভাষায় অনুবাদ করেছেন নাজমুস সাকিব।

মর্নিংস ইন জেনিন : সুপ্রভাত ফিলিস্তিন
লেখক : সুজান আবুলহাওয়া
অনুবাদ : নাজমুস সাকিব
প্রকাশক : নবপ্রকাশ
কলেবর : ৩৫২ পৃষ্ঠা
মুদ্রিত দাম : ৪৮০/-

আগের সংবাদআওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ফুল দেওয়া নিয়ে শ্রমিক লীগের দুই গ্রুপের হাতাহাতি
পরবর্তি সংবাদ২০ দিন ধরে এক রুমে আটকে রেখে দুইবোনকে ধর্ষণ, ধর্ষক গ্রেপ্তার