সোনালি কাবিনের রুপালি কবি

ওমর আলী আশরাফ

বাংলাসাহিত্যের বরেণ্য কবি আল মাহমুদের জীবদ্দশায় এবং তাঁর মৃত্যুর পর একটা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, আল মাহমুদ আসলে কাদের কবি? সেক্যুলার ব্যক্তিরা বলে আল মাহমুদের প্রথম জীবন তাদের। ইসলামে উজ্জীবিতরা বলেন, তাঁর জীবনের দ্বিতীয়ার্ধ আমাদের। আসলে ব্যাপারটা কী? আমরা মাঝপথে দাঁড়ালে দেখি, কেউ আল মাহমুদকে গ্রহণ করেছেন সামগ্রিক বিবেচনায়, কেউ করেছেন তাঁকে বিভাজন।

কবি যখন বেঁচে ছিলেন, ২০১৫ সালের ২৫ জুলাই আমরা কবির মগবাজারের বাসায় তাঁর সঙ্গে জমিয়ে গল্প জুড়েছিলাম। কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরি আমার নানা—এই সূত্রে তিনি আমাকে নাতি ডাকেন। সেই আলোচনায় আমরা যেমন কবি আল মাহমুদ নিয়ে তাকে প্রশ্ন করেছি, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক আল মাহমুদকেও প্রশ্ন ঠুকেছি, আবার ব্যক্তি আল মাহমুদকেও জানতে চেয়েছি। তখন তিনি নিজেও তাঁর জীবনকে দুইভাগে আলাদা করে বলেছেন। এই আলাদা জীবনের শিরোনাম তিনি দিয়েছেন আদর্শিক বিশ্বাস।

জীবনের প্রথমার্ধে তাঁর ধর্মে অনীহা ছিল, সেক্যুলারিজম ধারণ করতেন গভীরভাবে। তারপর এক পর্যায়ে তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি ভুল পথে চালিত হচ্ছেন। বুঝেই সংশোধিত হলেন। তাঁর গোটা বক্তব্যের সারমর্ম করলে দাঁড়ায়—যে সময়টায় আমি ভুল পথে ছিলাম, অর্থৎ আল্লাহভোলা ছিলাম, তখনো আমার অবচেতনে আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করতাম এবং ইসলামকে ধারণ করতাম। এটা আমার শিশুকালে মক্তবে পড়ার ফল। সেই যে আল্লাহকে বিশ্বাস করতে শিখেছি, তারপর বিকৃত হয়ে অনুভব করেছি, কিছু একটা উত্তম পথ আছে। কোনটা সেটা? আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। এইযে সত্যকে খুঁজতে যাওয়ার মানসিকতা, এর পেছনে কিন্তু অবচেতনে ইসলামই আমাকে প্রভাবিত করেছে। নইলে আমি কীভাবে বুঝি আমি মিথ্যাপথে আছি? আমাকে সত্য খুঁজে বের করে অনুসরণ করতে হবে?

আমাদের সমালোচকদের কেউ কেউ আল মাহমুদের পূর্ব ও পরবর্তী কাব্যের মূল্যায়ন করে বলেন, তারা সোনালি কাবিনের আল মাহমুদকে নিতে পারেন, এর পরের আল মাহমুদকে নিতে পারেন না। কেন পারেন না? পরবর্তী আল মাহমুদ ইসলামে উৎসর্গিত বলে! তাঁর এই সময়ের কবিতায় ইসলামের নানান বিষয় বা প্রসঙ্গ ফুটেছে ঠিক, কিন্তু সোনালি কাবিনের ‘কাবিন’ শব্দটা কীসের? তারা কবিতার মূল্যায়নে বিশ্বাসের বাঁকবদলে দুই আল মাহমুদকে একই দেখাবার প্রয়াস নিলেও ব্যক্তি জীবনে আল মাহমুদ যে দুই ভাগ, এটা আমাদের স্বীকার করে নিতেই হয়।

যেহেতু আল মাহমুদ পরবর্তীতে ইসলামে নিজেকে সঁপেছেন, তাই আমরা মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা বলি আল মাহমুদ আমাদের। সেক্যুলার ব্যক্তিরা বলে সোনালি কাবিনের আল মাহমুদ আমাদের, পরবর্তী আল মাহমুদকে আমরা চিনি না। হুজুরদের আল মাহমুদকে আমরা নিতে যাব কেন? অর্থাৎ সোনালি কাবিনের আগের আল মাহমুদকে হুজুররা পড়ত না, সে ছিল আমাদের। পরবর্তী আল মাহমুদকে হুজুররা পড়ছে, তিনি এখন হুজুরদের। তাকে আমরা কেন নেব? এই পয়েন্টে আমিও প্রশ্ন করি, হেফাজত-উত্তর মাদরাসার ছাত্ররা বাংলাসাহিত্য এত ব্যাপক অনুশীলন করেনি, এখন তারা রবীন্দ্রনাথ পড়ে, হুমায়ুন আজাদ পড়ে, আপনারা এদেরও বাদ দিয়ে দিন! হুযুররা পড়ার কারণে যদি আল মাহমুদকে বাদ দিতে পারেন, হুযুররা পড়ার কারণে কেন তসলিমা নাসরিন বাদ যাবে না?

দ্বিতীয় কথা হলো, আল মাহমুদ যত দিন সেক্যুলার ছিলেন, ভালো ছিলেন। ইসলামে বিশ্বাসী হওয়ার পরেই তিনি হয়ে গেলেন গুরুতর অপরাধী। কেন? আল মাহমুদ যখন থেকে ইসলাম নিয়ে লিখতে শুরু করলেন বা তাঁর লেখায় ইসলামকে প্রসঙ্গ করলেন, তখন থেকে তিনি হয়ে গেলেন অচ্ছুৎ। অর্থাৎ ধর্ম এখানে মূল ফ্যাক্ট। আমাদের যুক্তি হলো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি তার ব্রাহ্মধর্মের কর্তব্যশীল হয়েও কবিগুরু হতে পারেন, নির্মলেন্দু গুণসহ এই বাংলা ওই বাংলার সমস্ত হিন্দু কবি আপন ধর্মে শ্রদ্ধা ও যত্নশীল হয়েও কবি খ্যাতি পেতে পারেন, মাইকেল মধুসূদন যদি ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান হয়েও মহাকাব্যের স্বীকৃত কবি হতে পারেন, আল মাহমুদ কেন নিজের ধর্মে একনিষ্ঠ হতে পারবেন না? কেন ইসলামে নিবেদিত হওয়ায় ফররুখকে বিবর্জিত হতে হয়? ইসলাম অনুসরণ করায় কোনো কবি যদি নিন্দিত হন, হিন্দুইজম লালন করায়, খ্রিস্টবাদ প্রভৃতি পালন করায় পৃথিবীর সমস্ত কবি অবশ্যই নিন্দিত হবেন!

আমাদের একটি মৌলিক কথা মেনে নিতে হবে, ধর্ম কিংবা আদর্শ লালন করেই মানুষ তার সৃষ্টির সেরাটা দিতে পারে। ধর্মের আশ্রয় মানুষকে মহান করে। ধর্মপালন মানুষের হৃদয়-জগতে নাড়া দেয়। ইসলাম সত্য ও সুন্দরের পৃষ্ঠপোষকতা করার কারণে এর ধারকদের কলমে ভুল দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষপাতিত্ব দেখা যায় না বিধায় তার কাব্য ও সৃষ্টিকে উপেক্ষা করার দুঃসাহস কারও থাকার কথা নয়।

.
ওমর আলী আশরাফ
omaraliashraf508@gmail.com

আগের সংবাদমানবের অনুসন্ধিৎসা
পরবর্তি সংবাদপাঠ্যপুস্তক থেকে অবিলম্বে ‘বিবর্তনবাদ’ পাঠ বাতিল করুন: আল্লামা বাবুনগরী