
মাওলানা আহমদ মায়মূন :
সাধারণত কোনো নতুনের আগমন যেমন মানুষকে আনন্দের ঢেউয়ে আন্দোলিত করে, তেমনি আপন কারও বিদায় মানুষকে করে বিমর্ষ ও বেদনাহত। সে বিদায় যদি হয় অতি ঘনিষ্ঠ প্রিয় মানুষের, তবে তা শুধু বিচলিতই করে না, অশ্রুসিক্ত করে তোলে, একবার নয়, বার বার। বিদায় নেয়া মানুষটির স্মৃতিগুলো যখন আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের হৃদয়পটে ভেসে ওঠে তখন তারা দুঃখভারাক্রান্ত হয়, চোখ থেকে অশ্রু ঝরে। আমার অতি কাছের মানুষ বন্ধুবর হযরত মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. -এর ইন্তেকাল আমার মত অনেকের জন্য তেমনি এক কষ্টদায়ক বিদায়, যা সত্যি তাঁর অনেক আপনজনের মতো আমাকেও স্মৃতিকাতর করে তোলে। হৃদয়ের বেলাভূমিতে স্মৃতির তরঙ্গগুলো আছড়ে পড়ে বারবার আনমনা করে দেয়। তিনি এত দ্রুত আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন তা কখনও ভাবতে পারিনি। তাঁর বয়স আমার চেয়ে কিছুটা বেশি ছিল ঠিক, তবে অনেক বেশি ছিল এমন নয়। লেখাপড়ার বিবেচনায় তিনি আমার এক বছরের অগ্রজ ছিলেন। কখনও কল্পনাও করিনি, তাঁকে নিয়ে আজ আমাকে স্মৃতিকথা লিখতে হবে।
ছাত্রজীবনে তাঁর সাথে আমার একই প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার সুযোগ না হলেও কর্মজীবনে সহকর্মী হিসাবে দীর্ঘ ২৭ বছর এক সাথে কাজ করার এবং সেই সুবাদে তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। এ দীর্ঘ সময়ে তাঁর কর্মজীবনের বহুমুখী প্রতিভা এবং নানাবিধ সদ্গুণ প্রত্যক্ষ করে মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। ভাবছি, আজ তাঁকে নিয়ে কত লিখব বা কতটুকু লিখতে পারব! বাছাই করতে গেলে কোনটি ছাড়ব, আর কোনটি লিপিবদ্ধ করব! মনের অলিন্দে এত এত স্মৃতি ভিড় করছে যে, সেগুলোকে শৃঙ্খলায় আনতে আমি গলদঘর্ম হয়ে উঠছি।
১৯৮৮ ইং. সাল থেকে আমি মালিবাগ জামিয়ায় শিক্ষকতার খেদমতে নিয়োজিত আছি। সম্ভবত ১৯৯০ ইং সালে যখন তিনি দ্বিতীয়বার মালিবাগ জামিয়ায় শিক্ষক হিসাবে নিয়োজিত হন, তখন আমি তাঁকে একজন হৃদয়বান সহকর্মী হিসাবে পাই। অল্পদিনেই তাঁর সদ্গুণের সংস্পর্শে তাঁর সাথে আমার বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ সখ্যতা গড়ে ওঠে। আর সে সুবাদে তিনি ঢাকায় বা ঢাকার আশেপাশে কোনো অনুষ্ঠানে যোগদান করতে যাওয়ার সময় আমি কাছে থাকলে আমাকেও তার সাথে যেতে অনুরোধ করতেন। আর তা এতটাই বন্ধুসুলভ আবদার নিয়ে বলতেন যে, আমি তাঁকে সঙ্গ দিতে প্রস্তুত আছি কি না তাও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন অনুভব করতেন না। আমিও একজন গুণীবন্ধুর আন্তরিক আহ্বানে সাড়া দিতে কুণ্ঠিতবোধ করতাম না। এভাবে কত যে অনুষ্ঠানে তাঁর সফরসঙ্গী হয়ে যোগদান করেছি, তা আজ হিসাব করে বের করতে পারব না।
দ্বিতীয়ত তাঁর যে যোগ্যতাটি আমাকে বিমুগ্ধ করত তা হল, তাঁর যে কোনো বিষয়ে কথা বলার সাবলীল উপস্থাপনা। যখন যেখানে তাঁর কথা বলার বা নিজের মতামত উপস্থাপন করার প্রয়োজন হত তখন তিনি দাঁড়িয়ে অতি সাবলীল ভঙ্গিমায় যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের মতামত তুলে ধরতেন। অনেক সময় আমি লক্ষ্য করতাম যে, সম্পূর্ণ মজলিস তাঁর বক্তব্যের পক্ষে চলে এসেছে, অথবা কারও দ্বিমত থাকলে অতি সতর্কতার সাথে তাঁর বক্তব্য খণ্ডন করতে গিয়েও বেশ হিমশিম খাচ্ছে।
ওয়াজ-নসিহত ও দীনি বিষয়ে হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য প্রদানেও তাঁর আসাধারণ দক্ষতা ছিল। যদিও তিনি আজকালকার অনেক পরিচিত বক্তার মতো পেশাদার বক্তা ছিলেন না, কিন্তু যখনই কোনো দীনি মাহফিলে বক্তা হিসাবে অংশ গ্রহণ করতেন, সেখানে সর্বস্তরের জনগণ তাঁর ওয়াজ ও বক্তব্য শুনে খুবই প্রীত হত। তাঁর বক্তব্য হত জ্ঞান-নির্ভর ও হৃদয়গ্রাহী। শিক্ষকতা জীবনের শুরুর দিকে বেশকিছু মাহফিলের দাওয়াত গ্রহণ করতেন। পরে সম্ভবত শিক্ষকতা, ইমামতি, লেখা ও গবেষণার কাজ এবং জাতীয় পর্যায়ের অনেক দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় ওয়াজের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে চাননি। নতুবা তিনি এদিকে কিছুটা মনোযোগী হলেও বর্তমানকালের অনেক নামী-দামী বক্তার চেয়ে অবশ্যই অগ্রসর হয়ে যেতেন বলে আমি বিশ্বাস করি।
প্রবন্ধের ক্ষুদ্র পরিসরে আজ আমি তাঁর কোন গুণটির কথা বলব, আর কোনটির কথা বলব না, তা ভেবে পাচ্ছি না। তাঁকে নিয়ে, তাঁর জীবনের কর্ম-অবদান নিয়ে, তাঁর যোগ্যতা-প্রতিভা নিয়ে, তাঁর সদগুণাবলী তথা তাঁর ভদ্রতা, উদারতা, পরোপকারের মনোবৃত্তি-সহ নানামাত্রিক গুণাবলী নিয়ে বৃহৎকলেবরের একখানা পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচনা করা যায় এবং তাতে ভক্ত অনুরক্তদের অনেক কিছু পাওয়ার ও গ্রহণ করার বিষয় থাকে। তাঁকে নিয়ে স্মারক প্রকাশের উদ্যোগটি সেই পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচনার প্রাথমিক প্রয়াস হলে তাতে আমার দ্বিমত পোষণ করার কিছু নেই। তবে আমি মনে করি, তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে বিশদ আঙ্গিকে একখানা পূর্ণাঙ্গ পৃথক জীবনীগ্রন্থ রচিত হওয়া উচিত।
ইসলামের সমাজচিন্তা ও সভ্য সমাজের ভাবনায় গুরুভক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। অনুজরা অগ্রজদের এবং ভক্তরা ভক্তিভাজনদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ মাথায় রেখে নিজেদের উজ্জ্বল জীবন গড়তে প্রয়াসী হন। প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন বন্ধুবর হযরত মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া রহ.-এর এ গুণটি ছিল ঈর্ষণীয় পর্যায়ের। তাঁর কোনো কোনো শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি, যাদের আমি আজ নাম চিহ্নিত করতে চাই না, এমন কারও কারও কাছ থেকে তিনি অবমূল্যায়ন, অসহনীয় নিগ্রহ এবং অপ্রীতিকর আচরণের সম্মুখীন হয়েছিলেন, যা আমি একজন তৃতীয় পক্ষ দর্শক হিসাবে প্রত্যক্ষ করেছি। এসব দেখে তাঁর কপাল ঘর্মাক্ত হয়েছে সত্য, কিন্তু কারও সম্পর্কে কটু মন্তব্য করতে দেখিনি। এর চেয়ে অনেক কম দুর্ব্যবহার অথবা নিজের ভবিষ্যত-স্বপ্নভঙ্গেও অগ্রিম আশঙ্কায় কাউকে কাউকে আপন গুরুজনের মোকাবেলায় রণযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখেছি, কিন্তু মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. ছিলেন তার ব্যতিক্রম। এসব বেদনাদায়ক বিষয় তিনি হাসি দিয়ে ঢাকতে চেয়েছেন, কিন্তু কোনো বিরূপ বক্তব্য তাঁর মুখ থেকে শুনিনি। সে হাসি সুখের ছিল না, তা ছিল বেদনাকে আড়াল করার কাষ্ঠহাসি, তবু কোনো শ্রদ্ধাভাজনের প্রতি অশ্রদ্ধার প্রকাশ তাঁর থেকে ঘটেনি। এরূপ পরিস্থিতিতে এসব সয়ে নেয়ার মতো যেমন একটি শক্ত-সমর্থ হৃদয়ের প্রয়োজন, তেমন একটি হৃদয় তাঁর ছিল, তা আমরা অনুমান করতে পারি।
সম্ভবত ১৯৮৮ ইং সালের শুরুর দিকে তাঁর পিতার ইন্তেকাল হয়। তখন তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শুরু অবস্থা। ছাত্রজীবন পার করে সিলেটে একবছর শিক্ষকতার পর ঢাকায় শিক্ষকতার এক কি দু’বছর পার হয়েছে। তখন তাঁর ভাইদের মধ্যে দু’একজন ছাড়া প্রায় সকলেই লেখাপড়ায় নিয়োজিত। এদিকে তাঁর মাদরাসার শিক্ষকতা ও মসজিদের ইমামতি মিলিয়ে যা বেতন পেতেন তার পরিমান এত কম ছিল যে, তা উল্লেখ করবার মতো নয়। এরপরও যে ঔদার্য, যে মনোবল, যে বিচক্ষণতা দিয়ে দরদী অভিভাবকের মতো স্নেহবাৎসল্য দিয়ে ছোট ভাইদের লেখাপড়া সমাপ্ত করিয়ে মানুষ করে তুলতে প্রয়াসী হয়েছেন, তা অবশ্যই এ সমাজের একটি শিক্ষণীয় নযীর। এ সম্পর্কে আমার চেয়ে তাঁর আপন ভ্রাতৃবৃন্দ ভালো বলতে পারবেন। আমি বা আমরা ছিলাম তা পার্শবর্তী দর্শকমাত্র।
তিনি একজন ভালো ভোজনরসিক মানুষ ছিলেন, তার সাথে ছিলেন বেশ ভালো অতিথিপরায়ন। তিনি পছন্দের খাবার নিজে খেয়ে যেমন আনন্দ পেতেন, তেমনি অন্যদের খাইয়েও কম আনন্দ পেতেন না। চিনির রোগ এবং উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তাঁর জন্য ডাক্তারের পক্ষ থেকে খাদ্য নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ ছিল এবং কিছু কিছু খাবার তাঁর জন্য অনোনুমোদিত ছিল। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত এ সবের বাছ-বিচার তাঁর দ্বারা খুব কমই হয়ে ওঠত। শেষের দিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতেন বলে মনে হত, এরপরও পুরোপুরি সফল হতেন না। খাবারের বাছ-বিচারের প্রশ্ন সামনে এলে তাকদীরের ফয়সালার প্রতিই তাঁর অধিক আস্থা প্রকাশ পেত। তাঁর সাক্ষাতে গিয়ে কেউ কখনও কিছু না খেয়ে খালি মুখে ফিরে এসেছেন, এমন কথা কেউ বলতে পারবে না। আমি নিজেও কোনো প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তাঁর বাসায় গিয়েছি অথবা তিনি সাথে করে নিয়ে গেছেন, কিন্তু কোনো দিন কিছু না খেয়ে ফিরে আসতে পারিনি। আতিথিয়তার ক্ষেত্রে তাঁর দারাজদিলি তথা প্রশস্ত হৃদয়ের পরিচয় স্মরণে রাখার মতো।
তিনি একজন দক্ষ সংগঠক ছিলেন। ছাত্রজীবনে যখন তিনি তাঁর কতিপয় ছাত্রবন্ধুর সহযোগে ‘ইসলামী ছাত্র ঐক্য’ নামে একটি মাদরাসা কেন্দ্রিক ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলেন তখন তিনি ফরিদাবাদ মাদরাসার ছাত্র। আমি তখন হাটহাজারী মাদরাসায় পড়ি। এ সংগঠনটি পরবর্তীতে তাঁর কতিপয় মুরব্বী উস্তাযের পরামর্শে এবং তত্ত্বাবধানে ‘লাজনাতুত তালাবা’ নামে রূপান্তরিত ও নামান্তরিত হয়। এ নতুন সংগঠনটিকে দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে দিতে এবং মাদরাসার ছাত্রদের মাঝে এক প্রতিভাপালক সংগঠন হিসাবে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে যাদের ঘাম ঝরানো অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল, তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তাঁর ছাত্রজীবনের সেই সাংগঠনিক কর্মদক্ষতার সরাসরি সংস্পর্শে আমার আসার সুযোগ না হলেও সুদূরে পৌঁছে যাওয়া সেই ঢেউয়ের কিছুটা ছোঁয়া আমার গায়েও লেগেছিল।
কর্মজীবনে সৌভাগ্যক্রমে তাঁর ও আমার কর্মক্ষেত্র একই প্রতিষ্ঠানে হওয়ার সুবাদে তাঁর সাংগাঠনিক দক্ষতা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। এ সময় বেফাকুল মাদারিস-সহ জাতীয় পর্যায়ের অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততায় তাঁর সাংগঠনিক কর্মকুশলতা ও কর্মতৎপরতা আমার নজরে আসে। ‘বেফাককুল মাদারিস’-সহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সাথে পরম আন্তরিক ঔদার্যে তিনি আমাকেও জড়িয়েছেন। নানা সময় তাঁর সাংগঠনিক মেধা, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, নিরলস কর্মযজ্ঞ এবং নিপুণ সঞ্চালনা দেখে শুধু বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়েছি তা নয়, বরং মন থেকে ভাবতে শুরু করেছিলাম যে, জাতীয় পর্যায়ের বড় বড় বয়োবৃদ্ধ মুরব্বীজনদের বিদায়ের পর তিনিই হবেন হয়ত এ জাতির একজন দক্ষ কর্ণধার।
কই, তা হল কই! আর একবার প্রমাণিত হল, হবে তাই, যা মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা চান। আমাদের ভাবনাগুলো তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন তার সাথে তাঁরই ইচ্ছা সংযুক্ত হয়। দেখলাম, অনেক বয়োবৃদ্ধ মুরব্বীজনের আগে তিনিই চলে গেলেন। রেখে গেলেন একটি শূণ্যতা, যা অনেকদিন পর্যন্ত হয়ত তাঁর কথা ভাবাবে।
আমার এ যাবতকালের ৩২ বছরের কর্মজীবনের ২৭টি বছর একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার খেদমতে নিয়োজিত থাকার সুবাদে একজন সহকর্মী হিসাবে তাঁর ব্যক্তিত্বের মাঝে একজন সুহৃদ বন্ধুর উপস্থিতি অনুভব করেছি। এ সময়ের মধ্যে ৯ বছর তাঁকে নায়েবে মুহতামিম হিসাবে পেয়েছি। কি বলব, তাঁর ‘নায়েব মুহতামিম’ থাকাকালীন সময়ের মূল্যায়ন করতে হলে অনেক সময়ের প্রয়োজন, যা এখন আপাতত আমার হাতে নেই। তবু সংক্ষেপে বলব, আমরা আজ তাঁর অভাব তীব্রভাবে অনুভব করছি। আমার এ যাবতকালের খেদমতের জীবনে অনেক মুহতামিম, নায়েব মুহতামিমের আগমন, প্রস্থান দেখার সুযোগ হয়েছে। তাদের কাউকে ছোট বা খাটো না করে; বরং তাদের সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ মাথায় রেখেই যদি বলি, তবে বলব, মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. এমন কিছু ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের ধারক ছিলেন, যা ক্ষণে ক্ষণে তাঁর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কেন তাঁকে নায়েব মুহতামিমের পদ ছেড়ে দিতে হল, কেন এ সুযোগ্য সুদক্ষ প্রতিভাবান লোকটির যথাযথ মূল্যায়ন করা সম্ভব হল না, সে পর্যালোচনা আজ না-ই বা করা গেল। তবে এ ব্যর্থতা যে আমাদের, তা অকপটেই বলতে পারি। গ্লানির প্রতিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতে, আমাদের কারও হাতে নয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সহায় হোন।
তিনি যখন সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভেঙ্গে যাওয়ায় দুর্বল হয়ে পড়লেন, এরপর উপর্যুপরি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেললেন, তখনও তাঁর ছেলে সাজিদের ভালো কোনো কর্মস্থলের ব্যবস্থা হয়নি, তখন একদিন আমি তাঁকে বললাম, আপনার শারীরিক যে অবস্থা, তাতে আপনার অবর্তমানে পরিবারের হাল ধরার মতো কেউ তো এখনও দাঁড়াতে পারেনি, তাহলে কী হবে! তিনি স্বভাবসুলভ মুচকি হেসে বললেন, রিযিকের মালিক যেহেতু আল্লাহ তাআলা, তাই তিনি আমার জীবদ্দশায় পরিবারের ভরণ-পোষণ আমার সাথে সম্পৃক্ত করে রেখেছেন, আমার চলে যাওয়ার পর যারা থাকবে, আল্লাহ তাআলা রিজিকের বিষয়টি তাদের সাথে সম্পৃক্ত করে দিবেন। সত্যি আল্লাহ তাআলা তা-ই করলেন। স্নেহাস্পদ সাজিদের ভালো কর্মস্থলের ব্যবস্থা হল, তবে তাঁর চলে যাওয়ার পর। তাঁর কথাটির বাস্তবরূপ যেন আমি চোখে দেখলাম।
আরও অনেক কিছু বলার ছিল। স্মৃতিগুলো মনের মণিকোঠায় ভিড় করছে। চোখ বন্ধ করে দেখছি স্মৃতির মিছিল আর মিছিল। তবে আজ এখানেই ইতি টানছি। সময়ের বড় সঙ্কট। আল্লাহ তাআলা তাঁর উত্তরসূরীদেরকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফীক দান করুন। তাঁকে হারিয়ে আমাদের মাঝে তাঁর যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, প্রয়োজনের মুহূর্তে গায়েব থেকে সে অভাব দূর করে দিয়ে তাঁর যোগ্য উত্তরসুরী সৃষ্টি করে দিন। তিনিই সবকিছু করতে সক্ষম। وهو على شيء قدير، آمين يارب العالمين
লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা
