কিংবদন্তীর উপাখ্যান

আবু নাঈম মুহাম্মদ ‍সাজিদ :

পরিচিতি

আল্লামা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহ্ইয়া রহ. ছিলেন হক ও হক্কানিয়্যাতের পতাকাবাহী, খ্যাতিমান ইসলামী চিন্তাবিদ ও ইতিহাসবিদ, স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্টের অধিকারী যুগসচেতন বর্ষীয়ান আলেমেদ্বীন, প্রত্যুৎপন্নমতি ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব, প্রথিতযশা সাহিত্যিক, বিদগ্ধ গবেষক ও প্রবন্ধকার, সফল অনুবাদক ও লেখক, বহু অবিস্মরণীয় গ্রন্থপ্রণেতা, নন্দিত মুহাদ্দিস। তিনি দীর্ঘদেহী, শুভ্রবর্ণ, সদা হাস্যোজ্জ্বল, স্পষ্টভাষী, নিষ্ঠাবান, আত্মত্যাগী, উদার, আত্মবিশ্বাসী, কর্মোদ্যমী, সৎসাহসী, বিস্তৃত চিন্তা-চেতনার অধিকারী, দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় নিবেদিত প্রাণ, বাতিলের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, মার্জিত চরিত্রের অধিকারী, আকাবিরে দেওবন্দের চেতনায় উদ্ভাসিত মহামনীষী এবং হকপন্থী ও ইনসাফসমৃদ্ধ জাতি ও সমাজ গঠনে বহুমুখী অবদান রাখা অমর কিংবদন্তী।

জন্ম

তিনি ১৯৫৪ ইং সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সুবহে সাদিকের সময় মোমেনশাহী জেলার তারাকান্দা থানাধীন মালিডাঙ্গা গ্রামে ফরায়েযী বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন।

নামকরণ

তার পিতা হযরত মাওলানা মিয়া হুসাইন রহ. যখন দারুল উলূম দেওবন্দে অধ্যয়ন করেন তখন কোন এক গোধূলিলগ্নে কুরআন তিলাওয়াত করার সময় হযরত ইয়াহইয়া আঃ এর খোদাভীরুতার বর্ণনায় খুবই অভিভূত হন। তিনি তখনই সংকল্প করেছিলেন, প্রথম সন্তান ছেলে হলে তিনি তার নাম ‘ইয়াহইয়া’ রাখবেন। সে হিসাবে জন্মের পর পিতা তাঁর নাম রেখেছিলেন ‘ইয়াহইয়া’। ছাত্রজীবনে করিৎকর্মা ছিলেন বলে তাঁর এক প্রিয় উস্তায তাঁকে আবুল ফাতাহ নামে অভিহিত করেন। পরবর্তীতে তিনি ‘আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহ্ইয়া’ এই যুক্ত নামেই পরিচিত হন।

পিতা-মাতার পরিচয়

পিতা মাওলানা মিয়া হুসাইন রহ. ছিলেন ক্ষণজন্মা মনীষা ও প্রাজ্ঞ আলেমেদ্বীন। একই সাথে বৃহত্তর মোমেনশাহীর উঁচুস্তরের আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ, সমকালীন উলামায়ে কেরামের আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব, জামিয়া ইসলামিয়া সেহড়া মোমেনশাহীর দীর্ঘ দিনের যোগ্য মুহতামিম ও ছাত্রবন্ধুদের ¯েœহশীল উস্তায।
মা মেহেরুন্নিসা ছিলেন একজন অসাধারণ গুণবতী নারী ও রত্নগর্ভা মহিয়সী জননী। ধর্মে-কর্মে, জ্ঞানে-গুণে, ত্যাগ-সাধনায়, চরিত্র মাধুরিমায় তিনি ছিলেন নারী জগতের পরম অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। খোদাভীরুতা ও বাস্তবজীবনে দৃঢ়পদে দীনদারী পালনে সতর্ক দৃষ্টি রাখার ক্ষেত্রে নিজ পরিবার ও পাড়া-প্রতিবেশিদের কাছে তিনি ছিলেন আদর্শ মনীষা।
নিজ সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনকে তিনি আদর্শবান হিসাবে গড়ার জন্য আজীবন মেহনত করেছেন। সন্তানের কল্যাণ কামনা করে এবং তাদের সুস্থ-সুন্দর সোনালী জীবন প্রত্যাশা করে প্রতিনিয়তই তিনি রাতের শেষাংশে ঘন্টার পর ঘন্টা মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে ফরিয়াদ করতেন। তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ মুনাজাত করতেন। তাহাজ্জুদ নামায পড়ে তিনি প্রত্যেক সন্তানের নাম নিয়ে নিয়ে দুআ করতেন। প্রায় সময়ই তিনি দুআ শুরু করতেন বড় ছেলে ইয়াহইয়ার নাম নিয়ে। তার জীবনের নানা দিক উল্লেখ করে দুআ করতেন। তাঁর সুখময় দাম্পত্য জীবনের জন্য, আদর্শবান সুশিক্ষিত সন্তানের জন্য, কর্মজীবনে সাফল্য-সমৃদ্ধির জন্য এবং উভয় জাগতিক উন্নতি-অগ্রগতির জন্য তিনি আকুল কণ্ঠে দুআ করতেন। সন্তানের জন্য তার এরূপ দরদভরা দুআকান্নার গমকধ্বনিতে কখনও কখনও পাশে থাকা ঘুমন্ত লোকদের ঘুমও ভেঙ্গে যেতো।

শৈশবের দিনকাল

কৈশোরের দিনগুলো হয় বড় দুরন্তপনার। এর সাথে সাথে যদি খোদাপ্রদত্ত মেধা ও বুদ্ধির সংযোজন ঘটে তবে কিশোরের দিন কাটে বড় আনন্দে ও আহ্লাদ-উল্লাসে। বালক ইয়াহইয়ার শৈশবের দিন কেটেছে ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর ওপারে, ছবির মত অনিন্দ্য সুন্দর গ্রাম মালিডাঙ্গায়। সারি সারি গাছপালা, সবুজ-শ্যামল ফসলের মাঠ, আদিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ আর সহজ-সরল গ্রামীণ জীবনযাত্রার মাঝেই কেটে গেছে তার সেই দিন-কাল। তবে আর দশটি বালকের চেয়ে তার জীবন ছিল ভিন্ন ধাঁচের। কখনও মায়ের ফুট-ফরমায়েশ করে দেওয়া, কখনও বাবার সাথে চাষাবাদের জমি পরিস্কার করা, নিয়মতান্ত্রিকভাবে নামায-রোযা পালন, আগ বেড়ে বড়দের সালাম দেওয়া, পথের খড়-কুটো সরিয়ে দেওয়া, অন্ধ ভিখারীকে পথ দেখানো ইত্যকার আদব-তাহযীব পালনে মনোযোগী থাকাই ছিল ছেলেবেলায় তার বড় পরিচয়। অদূর ভবিষ্যতে আদর্শ ব্যক্তিত্বগঠন ও সমাজগঠনে স্বপ্নবান এক কিংবদন্তীর ছবি তার চোখে-মুখে বিমূর্ত হয়েছিল সেই শৈশবকালেই।

শিক্ষাজীবন

পারিবারিক ঐতিহ্যানুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয় তাঁর বিদুষী মায়ের কাছে। মায়ের হাতেই তিনি আলিফ-বা-তা-ছা-এর সবক গ্রহণ করেন। মায়ের মুখে মুখে শুনেই মুখস্ত করে নেন কুরআনে কারীমের ছোট ছোট বেশ কিছু সূরা। এরপর তিনি যাওয়া শুরু করেন গ্রামের মসজিদের ফোরকানিয়া মক্তবে। সেখানে কুরআনে কারীমের নাযেরা পাঠ সমাপ্ত করেন।
এরই মাঝে তিনি বাবার সাথে আসা-যাওয়া করতে শুরু করেন মোমেনশাহীর তৎকালীন দারুল উলূম চরপাড়ায়। (যা বর্তমানে জামিয়া ইসলামিয়া সেহড়া মোমেনশাহী নামে প্রসিদ্ধ ও পরিচিত)। এই আসা-যাওয়ার ভেতর দিয়েই লেখাপড়ার বড় পরিবেশের সাথে তিনি পরিচিত হতে থাকেন।

হালুয়াঘাটে স্কুলযাত্রা

একবার মাদরাসার বার্ষিক ছুটিতে বাবার সাথে বাড়িতে এলেন। তখন তার নানা হাজী ইবাদুজ্জামান সাহেবও নিজ মেয়ে, জামাই ও নাতি-নাতনিদেরকে দেখতে মালিডাঙ্গা আসেন। একদিন আলাপচারিতায় তিনি মেয়ের জামাইকে বলে বসলেন, আমার বড় নাতি ইয়াহইয়াকে আমি কিছুদিন স্কুলে পড়াতে চাই।
তার নানা ছিলেন বড়ই পরহেজগার ও দ্বীনদার লোক। আলেম-উলামাদের তিনি খুবই মহব্বত করতেন। নিজে অঢেল সম্পদের মালিক হলেও সম্পদের বড়াই করতেন না কখনও। তৎকালীন যুগে আলেম পাত্র পাওয়া দুস্কর হলেও তিনি তার তিন মেয়েকেই তিন জন যোগ্য ও প্রাজ্ঞ আলেমের সাথে বিয়ে দিয়েছেন।
তার চিন্তা ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি ভেবেছেন, মাতৃভাষায় অভিজ্ঞ হলে নাতি বিজ্ঞ আলেম হয়ে দেশ-জাতি ও উম্মাহর বিশাল খেদমত করতে পারবে। সামাজিক সংকট ও সভ্যতার দ্বন্দ নিরসনে সে শক্ত হাতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। বাতিলের নখরথাবা থেকে দীন-ইসলাম রক্ষায় সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারবে।
এই চিন্তা থেকেই তিনি জামাইয়ের দ্বিমত থাকলেও জোর করে নাতিকে হালুয়াঘাটে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানকার সুপ্রসিদ্ধ কুতিকূড়া কড়ুয়াপাড়া হাইস্কুলে নিজ সন্তান মহিউদ্দীনের সাথে ভর্তি করে দেন। সেখানে তিনি কৃতিত্বের সাথে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।

ময়মনসিংহের জামিয়া ইসলামিয়ায় দরসে নেযামীর পাঠ শুরু

এইচ.এস.সি পরীক্ষা দেওয়ার আগে পিতা বেঁকে বসেন। তিনি আর কিছুতেই তাকে স্কুলে দিতে নারাজ। কেননা তিনি তাকে বড় একজন প-িত আলেম হিসেবে গড়ে তুলবার স্বপ্ন লালন করছেন। সে হিসেবে তিনি আর কোনো সুযোগ দিলেন না। হালুয়াঘাট থেকে সরাসরি নিয়ে এলেন নিজের কাছে দারুল উলূম চরপাড়ায়। নিজের তত্বাবধানে রেখে ভর্তি করে দিলেন ইবতিদায়ী জামাতে।
এখান থেকেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। স্কুলে মেট্রিক পর্যন্ত কৃতিত্বের সাথে পড়াশোনা করার ফলে তার ভেতরে যে চতুর্মূখী প্রতিভার অনন্য গুণ ছিল এখানে এসে তা বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। ফলে এক বছরের ভেতরেই তিনি নিচের দুটি জামাত কৃতিত্বের সাথে উতরে যান। এরপর মুতাওয়াসসিতাহ ২য় বর্ষ ও ৩য় বর্ষও একই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করেন।
এখানে তিনি মুহতামিমের ছেলে পরিচয় বাদেও নিজের অমায়িক আচার-ব্যবহার এবং পড়াশোনায় সাফল্যের সাক্ষর রেখে সহপাঠী ও আসাতিযায়ে কেরামের মন জয় করে নেন। পিতৃসুলভ ¯েœহবাৎসল্য দিয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ আসাতিযায়ে কেরাম যেমন তার মেধার স্ফূরণ ও বিকাশে তাকে বিপুলভাবে সহযোগিতা করেন তেমনি মাদরাসার অন্যান্য জামাতের সেরা সেরা ছাত্ররাও তাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়-সহযোগিতা করেন। দরসিয়াতের পাশাপাশি জাগতিক বিষয়েও চতুর্মুখী যোগ্যতা গড়ে তুলবার জন্যে তিনি উস্তাদদের নির্দেশনাক্রমে পাঠচক্র গড়ে তুলেন। নাস্তার পয়সা বাঁচিয়ে চরপাড়া মোড়ের লাইব্রেরি থেকে তিনি বিভিন্ন বিষয়ের বই-পুস্তক নিয়ে আসতেন। এক সপ্তাহের ভেতরে সেগুলো পাঠ করে আবার ফেরত দিতেন। আবার চার আনা দিয়ে আরও কিছু বই নিয়ে আসতেন। এগুলো পাঠ শেষে ছাত্রবন্ধুদের নিয়ে চলত তার পাঠচক্র। জ্ঞানগভীরতা ও বিষয় আত্মস্থকরণে এসব পাঠচক্রে তিনিই নেতৃত্ব দিতেন। এখান থেকেই পর্যায়ক্রমে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে দক্ষতা অর্জনে কঠোর অধ্যাবসায়ে নিরত হন। লেখালেখি ও বক্তৃতায় তার যে অনন্য দক্ষতা ও পারঙ্গমতা তার পরবর্তী জীবনে পরিস্ফূট হয়ে ছিল বলতে গেলে তার সূতিকাগার ছিল তৎকালীন দারুল উলূম মোমেনশাহীর এই সুপ্রসিদ্ধ জ্ঞানশালার।
এখানে তার ব্যক্তিত্ব গঠণে সবচে বেশি ভূমিকা রেখেছেন তার পিতা মাওলানা মিয়া হোসাইন র.। তিনি সবসময় ছেলেকে চোখে চোখে রাখতেন। প্রয়োজনবোধে পরিমিত শাসন করতেন। পড়াশোনার খোঁজখবর নিতেন। তার সতর্ক নেগরানীর ফলে পড়াশোনা ও আমল-আখলাক গঠন ছাড়া অন্য কোনো মাশগালায় নিরত হওয়ার কোনো সুযোগ তার ছিল না।
তার মুখে শুনেছি, এখানে তার ব্যক্তিত্ব বিকাশে আরও বেশি মনোযোগী ছিলেন উভয় পাকিস্তানের অন্যতম রাহবার আলেম, হযরত মাওলানা আতহার আলী (র)। পিতার নির্দেশে বালক ইয়াহইয়া তখন মাওলানা আতহার আলী র. এর খাস খাদেমের দায়িত্ব পালন করেছেন। বলা যায়, দেশবরেণ্য এই উস্তাদ ও মুরুব্বীর সেবা ও খেদমত ছিল তার জীবনের বিশেষ আলোকবর্তিকা। মুরুব্বীর সোহবতে থেকে তিনি জীবনপথের সমূহ চড়াই-উৎরাই পাড়ি দেওয়ার সাহস লাভ করেছেন। তার দূরদর্শীতা ও জীবনে বাঁকে বাঁকে সূক্ষ্ম ও সচেতন দৃষ্ঠিভঙ্গি লালন দেখে তিনি নিজ জীবনে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে সেই বালক বয়সেই অনুপ্রাণিত হয়েছেন। জাতীয় দূর্যোগ মোকাবেলায় দৃপ্ত প্রত্যয়ের সাথে সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সবক পেয়েছেন সেই উঠতি তারুণ্যের প্রাক্কালেই।

ঢাকার যাত্রাবাড়ি মাদরাসায় পড়াশোনা

১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ অক্টোবর হযরত মাওলানা আতহার আলী র ইন্তিকাল করলে উক্ত প্রতিষ্ঠানে সাময়িক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। মাওলানা মিয়া হোসাইন র প্রতিষ্ঠানটির ইহতিমামের পদ থেকে সরে আসেন। সে বছর রমযানের পর তিনি সদরুল মুদাররিসীন হিসেবে যাত্রাবাড়ি মাদরাসায় যোগদান করেন। বালক ইয়াহইয়াও পিতার সাথে চলে আসেন। এখানে তিনি মুতাওয়াসসিতাহ ৪র্থ বর্ষ অধ্যয়ন করেন।

ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসায় পড়াশোনা

পরের বছর ছিল সম্ভবত ১৯৭৭ খ্রি. মুতাবিক ১৩৯৭ হিজরী। এ বছর তিনি পিতার সিদ্ধান্ত্রক্রমে ফরিদাবাদ মাদরাসায় ভর্তি হন। কারণ ছিল, এ বছরটি ছিল তার সানাবিয়া উলয়া জামাতে অধ্যয়নের বছর। যেহেতু এই জামাতে বর্ষ শেষে বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে সেহেতু পড়াশোনার ক্ষেত্রে উক্ত জামাতে পড়ানোয় দক্ষ ও পারঙ্গম শিক্ষকদের সরাসরি তত্বাবধানে পড়াশোনা করতে হবে। আর ফরিদাবাদ মাদরাসায় তখন দরস দান করতেন যুগ শ্রেষ্ঠ মহামনীষীবৃন্দ। তাদের মাঝে রয়েছেন, হযরত মাওলানা বজলুর রহমান। হযরত মাওলানা ফযলুর রহমান। হযরত মাওলানা আবদুল হাফিজ। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী। হযরত মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী। হযরত মাওলানা মুফতী গোলাম মোস্তফা প্রমূখ ব্যক্তিবর্গ।
এসব মহান ব্যক্তিত্বের সোহবতে থেকে পড়াশোনা ও অধ্যয়নের ফলে তার প্রতিভা বিকশিত হয়েছিল বিষ্ময়করভাবে। পিতার ইচ্ছার মূল্যায়ণ করে মেধাবী ও চৌকস সহপাঠীদের সাথে তিনি তুমুল প্রতিযোগিতার সাথে পড়াশোনা করতে শুরু করেন। দরসে অভিনব ও প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে তিনি উস্তাদদেরকে তাক লাগিয়ে দিতেন। উস্তাদগণ তার প্রশ্ন শুনতেন গুরুত্ব সহকারে। এরপর সহজ সাবলীল ভাষায় তার জিজ্ঞাসার জবাব প্রদান করতেন। তাকরার ও মুতালাআয়ও তিনি অভিনব ও আকর্ষণীয় পন্থায় ছাতদেরকে প্রতিদিনকার সবক বুঝিয়ে দিতেন। যে সবকটি ছাত্ররা দরসে সহজে বুঝতে পারতো না তা তার তাকরার থেকে অনায়াসেই বুঝে নিত। কারণ, তিনি সবক বুঝিয়ে দিতেন বাস্তব জীবনের সহজ সরল উপমা-উৎপ্রেক্ষা ব্যবহার করে।
বর্ষ শেষে দেখা মেলে তার প্রতিভার অসাধারণ ফলাফল। সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় তিনি সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
পরের বছরও তিনি একই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। তিনি যেহেতু কেবল নিজেকে নিয়ে চিন্তা করায় আবদ্ধ ছিলেন না; বরং ছাত্রসমাজকে নিয়েও বিপুল আশা করতেন, তাদের উজ্জল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন, একই সাথে দেশ ও জাতির সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ইসলাম ও মুসলমানদের উন্নতি ও অগ্রগতি সাধনের আদর্শিক চেতনা লালন করতেন সেহেতু তিনি অপরাপর চৌকস ও মেধাবী সহপাঠিদের নিয়ে ইসলামী ছাত্রঐক্য নামে একটি চেতনার প্লাটফর্ম গড়ে তোলেন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে দিন রাত তিনি এর কর্মসূচি ও কার্যক্রম নিয়ে চিন্তা করতেন। সবাইকে নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করতেন। ইসলামবিরোধী শিবিরের অপতৎপরতা রুখতে বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মসূচি প্রণয়নে ব্যতিব্যস্ত থাকতেন। এসবই করতে হত মাদরাসা পরিম-লের বাইরে থেকে। কেননা পড়াশোনার বাইরে মাদরাসায় ভিন্ন কোনো কার্যক্রমের সাথে জড়ানো সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল। এ কারণে উস্তাদদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ছাত্রঐক্যের কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও কিছু অবুঝ ছাত্রের আচরণে জনৈক উস্তাদ সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে সব কিছুই প্রকাশ করে দেয়। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ইয়াহইয়া কাউকে কিছু না জানিয়ে ফরিদাবাদ মাদরাসা ছেড়ে আসেন।

ময়মনসিংহের বালিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা

বৎসরের মাঝামাঝিতে কোথায় যাবেন? কোথায় পড়বেন? এ চিন্তা করতে করতে তিনি চলে আসেন মোমেনশাহীতে এবং তৎকালীন সময়কার সুপ্রসিদ্ধ বালিয়া মাদরাসায় ফযীলত প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। বাকি বছর তিনি এখানেই কৃতিত্বের সাথে পড়াশোনা সমাপ্ত করেন।

চট্টগ্রামের পটিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা

পরের বছর তিনি পিতার সাথে পরামর্শ করে চলে আসেন চট্টগ্রামের পটিয়া মাদরাসায়। এখানে তিনি ফযীলত ২য় বর্ষে ভর্তি হন। পটিয়ায় এসে তিনি প্রথম প্রথম এখানকার ভাষা-বিড়ম্বনার শিকার হলেও পর্যায়ক্রমে এখানকার ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেন। মনোযোগী পড়াশোনা ও উদার আচার-ব্যবহার দিয়ে অল্প কয়েকদিনের মাঝেই তিনি সহপাঠী ও শিক্ষকবৃন্দের মনজয় করে নেন। একই সাথে তিনি ইসলামী ছাত্রঐক্যের চেতনা ও প্ল্যান-প্রোগাম বাস্তবায়নে দৃঢ়পদক্ষেপে অংশগ্রহণ করেন। এভাবেই তিনি ছাত্রসমাজের মাঝে নিজেকে খ্যাতির শীর্ষ চূঁড়ায় উঠিয়ে আনেন।

ঢাকার জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ-এ পড়াশোনা

পরের বছর ছিল ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দ। নিজের পরিচিত মহল ছেড়ে এতো দূরে তার আর মন টানছিল না। পাশাপাশি ইসলামী ছাত্রঐক্যের কার্যক্রম সম্প্রসারণের যে মহৎ মিশন নিয়ে তিনি এতো দূর এসেছিলেন- তা-ও অনেকটা অগ্রসর হয়েছে। এখানে ছাত্রঐক্যের কমিটি হয়েছে। নতুন নতুন প্ল্যান-প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন হচ্ছে। তাছাড়া পুরোনো সহপাঠীরাও যারা এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছিল তারা সবাই জড়ো হচ্ছে ঢাকার মালিবাগে জামিয়া শারইয়্যাহয়। ফরিদাবাদ মাদরাসা ছেড়ে আসা শিক্ষকগণ এই নতুন প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। এ বছরই সেখানে তাকমীল বা দাওরায়ে হাদীস জামাত খোলা হয়েছে। উস্তাদগণেরও মনের ইচ্ছা, ইয়াহইয়া ও ইসহাকদের ন্যায় মেধাবী ও চৌকস ছাত্ররাই হোক দাওরায়ে হাদীসের প্রথম বছরের ছাত্র। তাতে করে ইসলামী ছাত্রঐক্যকে কেন্দ্র করে একই প্ল্যাটফর্মে জড়ো হওয়া চেতনাধারী মেধাবী ছাত্রদের সমাগম হবে এই জামিয়ায়। এতে প্রকারান্তরে প্রতিষ্ঠানের সুনাম-সুখ্যাতি দেশময় দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।
ইয়াহইয়া প্রিয় সহপাঠীদের তাড়া ও স্বনামধন্য ¯েœহশীল উস্তাদবৃন্দের আহ্বান উপেক্ষা করতে পারেননি। আর সবার সাথে তিনিও এসে ভর্তি হন এই জামিয়ায়। প্রাক্তন সহপাঠী ও আসাতিযায়ে কেরামদের পেয়ে তিনি যেন জীবনের সেই হারানো গতি খুঁজে পান। তুমুল প্রতিযোগিতায় আবার তিনি মনোনিবেশ করেন পড়াশোনায়, আমল-আখলাক গঠনে, আসাতিযায়ে কেরামের খেদমত ও তাদের সুষ্ঠু চিন্তা-চেতনা বাস্তবায়নের মিশনে। পড়াশোনার ফাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক ছুটিগুলোতে তিনি ও প্রিয়বন্ধু ইসহাক ছুটে বেড়ান দেশের আনাচে-কানাচে। প্রিয় উস্তাদগণ এখন ইসলামী ছাত্রঐক্যের সাথে সংযুক্ত হয়েছেন। তারা এর নাম পরিবর্তন করেছেন। নাম দিয়েছেন, লাজনাতুত তালাবা বাংলাদেশ। তারাই এখন এর প্ল্যান-পরিকল্পনা প্রদান করছেন। এর গতি-প্রকৃতি ত্বরান্বিত করতে নানান কর্মসূচি প্রদান করছেন। ফলে ইয়াহইয়া ও ইসহাক এখন নেপথ্যে থেকে উস্তাদবৃন্দের ডাকে সাড়া দিয়ে লাজনার কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়াতেই মনোনিবেশ করলেন।
চতুর্মুখী কার্যক্রম ও পড়াশোনা তার ভালোই চলল। বর্ষ শেষে কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় মাত্র তিন নম্বর কম পেয়ে তিনি সারা দেশে চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। কারণ ছিল, মুআত্তা ইমাম মালিক কিতাবের পরীক্ষায় একটি জুয প্রশ্ন তার কমন পড়েনি।

পড়াশোনা ও অধ্যয়নে কৃতিত্বের সাক্ষর ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ইয়াহইয়া পড়াশোনায় বিরল কৃতিত্বের সাক্ষর রেখেছেন। যখন যেখানেই একাডেমিক পড়াশোনা করেছেন সেখানেই তিনি নিজ প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। মনোযোগী অধ্যয়ন ছিল তার সাফল্যের মূল সূত্র। তিনি যখন যা পড়তেন তা প্রথমে নিজের মতো করে অনুধাবন করতেন এরপর সহজেই তা নিজ মগজ-মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে নিতেন। এভাবে অল্পসময় পড়াশোনা করলেই তার দরসী কিতাবাদি সব আত্মস্ত হয়ে যেতো। বাকি সময়টুকু তিনি অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ও অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে অধ্যয়ন করায় ব্যয় করতেন। আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় সহপাঠিদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে বিভিন্ন শরাহ-শুরূহাত ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ অধ্যয়ন করতেন। উস্তাদদের খেদমতে নিরত হতেন এই বাসনায় যে, অবসর সময়ে উস্তাদের অনুমতি নিয়ে তার কাছে থাকা বিপুল গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করতে পারবেন।
তার মুখে শোনা, একবার এক রমযানে তিনি জনৈক উস্তাদের খেদমতে নিরত হন। পুরো রমযান তিনি উস্তাদের ফুট-ফরমায়েশ খেটে দিতেন এবং বাকি সময় মসজিদে উস্তাদের কামরায় অবস্থান করে উস্তাদের কিতাবাদি মুতালাআ করতেন। জ্ঞানপিপাসা তার এমনই ছিল যে, পুরো রমযানে তিনি প্রায় আড়াইশ গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন।

সহপাঠীদের সাথে প্রতিযোগিতামূলক পড়াশোনা

বস্তুত যে বিষয়টি প্রতিযোগিতার সাথে এগিয়ে যায় তার ফলাফল একটু ভিন্নতর হয়। পড়াশোনার ব্যাপারটিও তেমনই। যদি নিজের পড়াশোনার ক্ষেত্রে কাউকে প্রতিদ্বন্দী বানিয়ে নেওয়া যায় তবে কার্যত সেটা নিজের সাফল্যই বয়ে আনে বৈকি। পড়াশোনায় প্রতিদ্বন্দিতার ব্যাপারটি ইয়াহইয়াকে আকর্ষণ করতো সেই ছাত্রকালেই। তিনি যেখানেই যখন পড়েছেন সেখানেই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় নিজের প্রতিদ্বন্দি তৈরি করে নিয়েছেন।
তার যবানে শোনা, পড়াশোনায় এই প্রতিদ্বন্দিতা তিনি সৃষ্টি করতেন নিজের সফলতার জন্যই। দেখা যেত, সহপাঠিরা যেন রাতের বেলা দ্রুত ঘুমিয়ে যায় সেজন্যে তিনি ঘুমের ভান করে বিছানায় শুয়ে যেতেন। প্রতিদ্বন্দি সাথী যখন দেখতো সে ঘুমিয়ে পড়েছে তখন সেও ঘুমিয়ে যেত। কিন্তু ইয়াহইয়া ক্ষাণিক পরেই বিছানা ছেড়ে উঠে যেতেন। চলে যেতেন কামরার বাইরে কোথাও। সেখানে বসে চলত অবিরাম অধ্যয়ন। নীরব নিস্তব্ধ রাতে মনোযোগ থাকত কেবলই বইয়ের পাতায়। তাতে অল্প সময়েই সবক মুখস্ত হয়ে যেত। বাকি সময় তিনি সামনের সবক মুতালাআ কিংবা অন্য কোনো জটিল মাসআলা জানার জন্য অতিবাহিত করতেন। এই অতিরিক্ত অধ্যয়ন তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে রাখত। এ কারণেই দেখা যেত, উস্তাদগণ তাকে খুবই ¯েœহ করতেন। ছাত্রবন্ধুরাও তার জ্ঞান-গরীমাকে সমীহের চোখে দেখত।

সহপাঠীদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ

সহপাঠীদের সাথে তার ছিল হৃদ্যতার সম্পর্ক। পড়াশোনায় যাতে ব্যতয় না ঘটে, সেজন্য তিনি হয়তো সবার সাথে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা রাখতেন না। তবে সবার সাথেই তিনি সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। সবার সাথেই বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করতেন। কখনো কারও সাথে মনোমালিন্য হয়ে গেলে দ্রুতই তা নিরসন করে ফেলতেন। এক্ষেত্রে তার কৌশল ছিল, সে যা পছন্দ করে হয়তো তা কিনে দিয়ে তাকে খুশি করতেন বা এমন আচরণ করতেন, যা দেখে সে খুশি হয়ে যেত। কারও সাথে তার বন্ধুত্বের মাপকাঠি ছিল পড়াশোনা। যারা বেশি পড়াশোনা করে তিনি তাদের সাথেই বেশি বন্ধুত্ব রাখতেন। তার ভাবনা ছিল, হয়তো এর দ্বারা তিনি তার থেকে কোনো ইলমী ফায়দা হাসিল করতে পারবেন। জাগতিক মোহ বা প্রীতির জন্য কারো সাথে তিনি সম্পর্ক গড়তেন না।

উস্তাদদের দুআ পাওয়ার বাসনা

বস্তুত বড়দের দুআ ও নেক নজরই ছোটদেরকে বড় করে তুলে। বড়দের সান্নিধ্য ও কৃপাদৃষ্টিই ছোটদেরকে সুষ্ঠু-সুন্দর জীবন গড়ায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বড়দের ছোট ছোট কাজ ও চিন্তাভাবনায়ও ছোটদের জন্য থাকে বিরাট শিক্ষা ও নির্দেশনা। ইয়াহইয়া এই ভাবনা থেকে সেই শৈশব থেকেই লালন করতেন। যে কারণে জামিয়া ইসলামিয়া মোমেনশাহীতে পড়ার সময় তিনি হযরত আতহার আলী র. খেদমত করেছেন। ঢাকায় পড়াশোনাকালে হযরত মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী, মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, মাওলানা গোলাম মোস্তফা, মাওলানা উবায়দুল্লাহ, হযরত মাওলানা শফীকুল হক আমকুনী ও হযরত মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ র. এর খেদমত করেছেন অকুণ্ঠচিত্তে। কর্মজীবনে পদার্পণ করেও সময়ে সময়ে তিনি তাদের বিভিন্ন ধরনের খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। উস্তাদগণও এই শাগরিদের খেদমত কবুল করে নিয়েছেন সহাস্যবদনে, মমতার সুরভি মেখে।

কর্মজীবন

সিলেটের আকুনী মাদরাসায় অধ্যাপনা

মালিবাগ জামিয়ায় দাওরায়ে হাদীস জামাতে অধ্যয়নের মাঝ দিয়েই তার একাডেমিক শিক্ষাকালের সমাপ্তি ঘটে। জ্ঞানপিপাসা নিবারণের জন্য দেশের বাইরে দারুল উলূম দেওবন্দ যাওয়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পারিবারিক টানপোড়েন আর আর্থিক অসঙ্গতির জন্য তিনি নেমে পড়েন কর্মজীবনে। উস্তাদ ও মুরুব্বী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক দা. বা. এর নির্দেশে সিলেটের গাছবাড়িতে তার পিতার প্রতিষ্ঠিত আকুনী মাদরাসায় সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে তিনি যোগদান করেন। সেখানে তিনি দুই বছর অত্যন্ত সুনামের সাথে মুসলিম শরীফসহ অন্যান্য গ্রন্থাদির পাঠদান করেন।

ঢাকার মালিবাগ জামিয়ায় শিক্ষকতা

এরপর ডাক আসে প্রিয় প্রতিষ্ঠান মালিবাগ জামিয়া থেকে। মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ র. তাকে ডেকে আনেন এবং মুদাররিস হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। এসময় তিনি নিজের আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি ও উপস্থিত বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে ছাত্রদের তাক লাগিয়ে দেন। একই সাথে দরসের বিষয়গুলো তিনি সমকালীন প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যে, ছাত্ররা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার তাকরীর শুনতো। পাশাপাশি তিনি ছাত্রদেরকে দীনের একনিষ্ঠ দায়ী হিসেবে গড়ে তুলবার জন্য প্রেরণাদায়ক আলোচনাও উপস্থাপন করতেন। এসব আলোচনায় ছাত্ররা খুবই উদ্দীপিত হত এবং আগামী জীবন সাজাবার দিক-নির্দেশনা লাভ করত। টানা চার বছর তিনি এখানে শিক্ষকতার পেশায় জড়িত থাকেন।

ঢাকার মতিঝিলে পীরজঙ্গী মাদরাসায় শিক্ষকতা

এরপর কোনো কারণে তিনি মালিবাগ জামিয়া থেকে ইস্তফা প্রদান করেন এবং মতিঝিলের পীরজঙ্গীতে অবস্থিত জামিয়া দ্বীনিয়া শামসুল উলূম মাদরাসায় সিনিয়র মুদাররিস হিসেবে যোগদান করেন। এখানে তিনি দুই বছর শিক্ষকতা করেন।

ঢাকার মালিবাগে অধ্যাপনা ও ভাইস প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব পালন

এরপর আবার ডাক আসে মালিবাগ জামিয়া থেকে। প্রাক্তন প্রতিষ্ঠানে খেদমতের সুযোগ পেয়ে তিনি নিজেকে উজাড় করে দেন। ছাত্রদের পেছনে মেহনত, প্রতিষ্ঠানের আয়-উন্নতির চিন্তা, পাশাপাশি পড়াশোনা ও আমল-আখলাকে প্রতিষ্ঠানটিকে সর্বমহলে সুপরিচিত করবার এক অদম্য নেশা তাকে পেয়ে বসে। অন্যান্য আসাতিযায়ে কেরামকে সঙ্গে নিয়ে বিস্তর পরিকল্পনা করেন। মাদরাসার গঠণতন্ত্র রচনা করে দেন। মাদরাসার সুষ্ঠু পরিচালনা যাতে ব্যাহত না হয় সেজন্য শিক্ষা অবকাঠামোতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। তার এই কর্মপ্রক্রিয়া সর্বমহলে বেশ প্রশংসা কুড়ায়। ছাত্র-শিক্ষকসহ মাদরাসার পরিচালনা পরিষদ তখন তার এই বহুমুখী প্রতিভা ও কর্মতৎপরতায় বিমুগ্ধ হন। তারা পুরস্কারস্বরূপ তাকে এ প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল হিসেবে পদোন্নতি প্রদান করেন।
তার এই পদোন্নতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিতে যেন নবপ্রাণের সূচনা হয়। সারা দেশ থেকে ছাত্ররা এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ভর্তির সময়গুলোতে ছাত্রদের এই ভীড় সামলানো ছিল বড় দুস্কর। তাই তিনিই সর্বপ্রথম ভর্তির জন্য প্রথমে লিখিত ও পরে মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। এ সময়ে রেকর্ড সংখ্যক ছাত্র ভর্তি হয় এই প্রতিষ্ঠানে। যে কারণে ক্রমাগত পর পর দুই বছর ভবন সম্প্রসারণ করার দরকার হয়। পরে এতেও ছাত্র সংকুলান না হওয়ায় তিনি তৎকালীন গৃহ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জনাব মির্জা আব্বাস সাহেবকে রাজি করিয়ে মাদরাসার জন্য খিলগাঁওয়ে দুই কাঠা ভূমি ব্যবস্থা করেন। একই সাথে মাদরাসা মসজিদের সম্মুখস্থ জায়গাটুকুও তাকে মাদরাসার জন্য নিয়ে দেওয়ার ওয়াদা করান।
যেহেতু তার মন-মগজে সারাক্ষণ উচ্চতর গবেষণা ও পড়াশোনা বিরাজ করতো সেহেতু তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করে মালিবাগ জামিয়ায় তাফসীর বিভাগ ও ইফতা বিভাগ চালু করেন।
প্রতিষ্ঠানের এহেন উন্নতি-অগ্রগতিতে যিনি সদা ভূমিকা রেখেছেন তার পেছনে কেউ লাগবে- এটাই স্বাভাবিক। তারা যখন পদে পদে তার জন্য যন্ত্রণার কারণ হয়ে ওঠে তখন তিনি স্বেচ্ছায় ভাইস প্রিন্সিপ্যালের পদ ছেড়ে দেন। এরপর আমৃত্যু এখানে তিনি সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

ঢাকার রামপুরা ওয়াপদা মাদরাসায় শিক্ষা-উপদেষ্টা

মালিবাগ জামিয়ায় হাদীসের গ্রন্থসহ অন্যান্য গ্রন্থের দরসদানের দায়িত্ব পালনকেই তিনি সবচে বেশি বড় করে দেখতেন। একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তিনি তাই ভিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার দায়িত্ব গ্রহণের কথা চিন্তাই করতেন না। কিন্তু সময়ের চাহিদা কখনো কখনো নিজের চিন্তায় ছেদ সৃষ্টি করে। ঢাকার রামপুরা ওয়াপদায় অবস্থিত জামিয়া মোহাম্মদিয়া আরাবিয়া মাদরাসাটি চলছে চলছে করেও যেন চলছিল না। প্রায় বছরই সেখানে শিক্ষক-কমিটির দ্বন্দ্ব লেগেই থাকতো। যদ্দরুণ প্রতিষ্ঠানটির পড়াশোনার মান উন্নত হচ্ছিল না কিছুতেই। তখন সেখানকার সেক্রেটারি একদিন মালিবাগ জামিয়া হযরত মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ দা. বা.-এর কাছে আসেন। প্রতিষ্ঠানের দূরাবস্থার কথা খুলে বলেন এবং এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি কোনো বিহিত করে দেওয়ার আবেদন জানান।
কাজী সাহেব ক্ষণিক চিন্তা করে প্রিয় শিষ্য আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়ার কথা তাকে বলে দেন। সেক্রেটারি সাহেব একদিন তার খোঁজ করে বাসায় উপস্থিত হন। তাকে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা-উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণের জোর আবদার করেন। তিনিও না করতে পারেননি। যখন বুঝেছেন, এই দায়িত্ব গ্রহণে কাজী সাহেব হুজুরের সদয় সম্মতি আছে তখন তিনি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা-উপদেষ্টার পদ অলঙ্কৃত করেন। তার দূরদর্শী ভাবনা ও সুচিন্তিত কর্মপদ্ধতির ফলে মাত্র দু বছরেই প্রতিষ্ঠানটির সকল জটিলতা নিরসণ হয় এবং পড়ালেখায়ও যথেষ্ট অগ্রসর হয়ে যায়।

ঢাকার মধ্যবাড্ডা মিফতাহুল উলূম মাদরাসায় অধ্যাপনা

ভাইস প্রিন্সিপ্যালের পদ ছেড়ে দেওয়ার পর ঢাকার মধ্যবাড্ডায় অবস্থিত মিফতাহুল উলূম মাদরাসা থেকে হাদীসের খেদমতের ডাক আসে। আজীবন হাদীসের দরস-তাদরীসে নিয়োজিত এই জ্ঞানতাপস সেই ডাক উপেক্ষা করতে পারেননি। এ প্রতিষ্ঠানেও তিনি মুসলিম শরীফ অধ্যাপনায় নিযুক্ত হন। প্রায় পাঁচ বছর তিনি এই প্রতিষ্ঠানে হাদীসের খেদমত আঞ্জাম দেন।

ঢাকার খিলগাঁও-এ নতুনবাগ মাদরাসায় অধ্যাপনা

এরপর ডাক আসে ঢাকার খিলগাঁওয়ে অবস্থিত জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম নতুনবাগ মাদরাসা থেকে। সে বছর সেখানে দাওরায়ে হাদীস জামাত খোলা হয়। দাওরায়ে হাদীস জামাতে হাদীসের সর্বোচ্চ গ্রন্থ বুখারী শরীফ পাঠদানের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য তার কাছে জোর আবেদন জানানো হয়। তিনি সানন্দেই এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সপ্তাহের দুদিন তিনি এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যপনার দায়িত্ব পালন করতেন।

ঢাকার মারকাযুল কুরআন বাংলাদেশে অধ্যাপনা

জীবনে তখন তার আলো-ছায়ার খেলা চলছে। কুড়িল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিলেন কমিটির কিছু নাদান সদস্যের হাস্যকর খোঁড়া মন্তব্যে মর্মাহত হয়ে। তার ইস্তফার কথা আঁচ করতে পেরে তারই ছোট ভাই মুফতী মুহাম্মদ তৈয়্যেব হোসাইন সানারপাড়ের মৌচাকে তারই তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত মারকাযুল কুরআন বাংলাদেশের সদরুল মুদাররিসীনের পদ অলঙ্কৃত করার প্রস্তাব নিয়ে হাজির হন। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি তারই নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হচ্ছিল সেহেতু তিনি এই প্রস্তাব গ্রহণে আর দ্বিমত করেননি। প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে তিনি স্বপরিবারে চলে আসেন এই মৌচাকে। প্রতিদিন বাদ ফজর তিনি বেরিয়ে প্রথমে যেতেন মালিবাগ জামিয়ায়, এরপর রামপুরা ওয়াপদা মাদরাসায়, এরপর নতুনবাগ মাদরাসায় নয়তো বেফাক অফিসে আহুত কোনো মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করে তিনি ফিরতেন সেই সন্ধ্যার প্রাক্কালে। বাদ মাগরিব তিনি হাজির হতেন মারকাযুল কুরআন বাংলাদেশে। এখানে এসে তিনি ইফতা ও উলূমুল হাদীস বিভাগে ইসলামী অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি ও ইসলামী আইন ও বিচারব্যবস্থা বিষয়ে দিল জুড়ানো তাকরীর পেশ করতেন। কোনোদিন হয়তো নবীন আসাতিযায়ে কেরামকে নিয়ে বসতেন। তাদেরকে দিক-নির্দেশনা দিতেন। মাদরাসার উন্নতি ও অগ্রগতি বিষয়ে খোলামনে পরামর্শ দিতেন। কোনোদিন হয়তো পুরো মাদরাসার ছাত্রদের জড়ো করে সমকালীন প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে তথ্যপূর্ণ আলোচনা পেশ করতেন। দিন তার বেশ মধুরই কাটছিলো বলা যায়।
কিন্তু বিধি হলো বাম। একদিন মালিবাগ থেকে ফেরার পথে মৌচাকে এসে পড়লেন দুর্ঘটনায়। পেছন থেকে একটি হো-া এসে তাকে ফেলে দিয়ে চলে যেতে চাইল। হো-ার তীব্র ধাক্কায় তিনি রাস্তায় গড়িয়ে পড়লেন। তার ডান পায়ের নলা ভেঙ্গে গেল। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হতে হতে চলে গেল প্রায় পাঁচ মাস।

উস্তাদ হিসেবে বিশেষ বৈশিষ্ট্য

একজন আদর্শ উস্তাদ হিসেবে একজন ব্যক্তির মাঝে যেসব গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তার মাঝে এর সবটাই সমাহিত ছিল। তিনি ছাত্রদেরকে আপন করে নিতে পারতেন খুব সহজেই। ছাত্রদের মন-মেজায ও মেধা যাচাই করতে পারতেন অনায়াসেই। যদ্দরুণ তাদের বুঝ-বুদ্ধির সীমা পরিমাপ করে তিনি খুব গুছিয়ে তাদের সাথে কথা বলতেন। যে ছাত্রের যে বিষয়ে খোরাক দরকার তাকে সে বিষয়েই গাইড করতেন, দিক-নির্দেশনা দিতেন। কারও আরবীভাষায় দুর্বলতা থাকলে তাকে আরবীভাষা আয়ত্বের কলাকৌশল বলে দিতেন। কারও বাংলায় দুর্বলতা থাকলে বাংলাভাষা শেখার পথ-পন্থা বলে দিতেন। কারও ভিন্ন কোনো বিষয়ে জানার প্রয়োজন হলে তাকে সেই বিষয়ে যুক্তিযুক্ত আলোচনা করে পরিতৃপ্ত করে দিতেন। একই সাথে প্রয়োজনবোধে ছাত্রদেরকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতেন। বছরের মাঝে বা শেষে তাদেরকে আনন্দিত করার জন্য মিষ্টি কিনে খাবার পয়সা দিতেন। এ কারণে ছাত্ররা তাকে কেবল শিক্ষক হিসেবে শ্রদ্ধা করত তা-ই নয়; বরং তাকে নিজেদের জীবনের আদর্শ পুরুষ হিসেবে গণ্য করত।
দরসে সবক বুঝিয়ে দেওয়ায় তিনি ছিলেন বিশেষ পারঙ্গম। যে সবক বোঝানোর জন্য ব্ল্যাকবোর্ড ব্যবহার করা প্রয়োজন তিনি সেখানে বোর্ডে লিখে বা চিত্রাঙ্কন করে ছাত্রদেরকে বুঝিয়ে দিতেন। ইতিহাসের ব্যাপার থাকলে মানচিত্র ধরে ধরে ইতিহাস বর্ণনা করতেন। কখনো জীবনের সহজ-সরল উপমা দিয়ে দরসের কঠিন সবকগুলো অনায়াসে বুঝিয়ে দিতেন।
তাছাড়া ফারেগীন ছাত্ররা সবসময় তার কাছে ভীড় জমাত। নিজেদের খেদমতের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা নিবেদন করত। তিনিও তাদের হিম্মত যোগাতেন। প্রয়োজনমাফিক যাকে যেখানে মুনাসিব মনে করতেন সেখানে খেদমতে পাঠিয়ে দিতেন।

ঢাকার তিনটি প্রসিদ্ধ মসজিদে ইমাম ও খতীব হিসেবে দায়িত্ব পালন

জীবনে তিনি ঢাকার প্রসিদ্ধ তিনটি মসজিদে ইমাম ও খতীব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মনে করতেন, সামাজিক সংস্কারের জন্য খতীবের পদ সবচে বেশি উপযোগী। মসজিদের মিম্বর থেকে যত দ্রুত দীনের পয়গাম ছড়িয়ে দেওয়া যায় অন্য কোনো উপায়ে সেটা সম্ভব নয়। এ কারণেই তিনি দরস-তাদরীসের পাশাপাশি একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মসজিদে ইমামতি ও খতীবের দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বক্ষেত্রেই তিনি প্রথমে ধর্মীয় কুসংস্কার ও বিদআত প্রতিরোধে ভূমিকা পালন করেছেন। এরপর বিশুদ্ধ দীনি আদাব-তাহযীব, ধর্মীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহর বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন সহজ-সরল ভাষায়। তার কথা হতো মাপা-মাপা, সরস উপমা সমৃদ্ধ। যে কারণে আপামর সাধারণ জনতা কান সজাগ করে তার বক্তব্য শুনতো। তার আলোচনা শুনে পরিতৃপ্তি বোধ করত। দেখা যেত, জুমার দিন দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লীরা তার বক্তব্য শোনার জন্য ছুটে আসতো। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় প্রতিবছরই মসজিদ সম্প্রসারণ করার প্রয়োজন হত।
তিনি যেহেতু নিরেট দীন ও ইসলামের ধারক-বাহক ও প্রচারক ছিলেন সেহেতু আলোচনায় তিনি কোনো সঙ্কোচবোধ করতেন না। দীনের স্বার্থে যখন যে বিষয়ে যাকে যা বলা দরকার উচ্চকিত কণ্ঠে তখন তা-ই বলে দিতেন। এক্ষেত্রে তিনি কারও কোনো পরোয়া করতেন না। যে কারণে অনেক সময়ই সুবিধাবাদী লোকেরা তার বিপক্ষে অবস্থান নিত। প্রয়োজনে তিনি দায়িত্ব ত্যাগ করতেন তারপরও তিনি কখনো হককে হক বলতে আর বাতিলকে বাতিল বলতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। তিনি নি¤েœাক্ত মসজিদ সমূহে ইমাম ও খতীবের দায়িত্ব পালন করেছেন:
১. শহীদবাগ জামে মসজিদ
২. বায়তুত তাকওয়া জামে মসজিদ, খিলগাঁও
৩. সাহারা কুড়িল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, কুড়িল।

বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-এর সহকারী মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন ও অবদান
তিনি দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বা বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের সহকারী মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপন স্বপ্ন ও ইচ্ছাগুলো বাস্তবায়নে তিনি বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশকে নিয়ে বিরাট স্বপ্ন দেখতেন। বিশেষত এই দেশ ও পরিম-লে ইসলামী শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপক চর্চা ও অগ্রগতিতে যে সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা দরকার শয়নে-জাগরণে তিনি সেই কল্পনার ছবিই আঁকতেন। শুধু বড় পদ আঁকড়ে থাকার ঘৃণ্য মানসিকতা তার কোনো দিনই ছিল না। দীন-ইসলাম ও আগামী প্রজন্মের উজ্জল ভবিষ্যত রচনায় তিনি যেসব চিন্তা-চেতনা লালন করতেন কেবল সেই বোধ ও দায়িত্বানুভূতি থেকেই তিনি বেফাকের যে কোনো কর্মসূচিতে সবার আগে এগিয়ে আসতেন। বেফাকের সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে তিনি এর গঠণতন্ত্র তৈরি করে দিয়েছেন। এর নিজস্ব অবকাঠামো বিনির্মাণে মেধা-বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে আজীবন সহযোগিতা করে গেছেন। তাছাড়া কওমী শিক্ষাধারার সংস্কার ও উন্নয়নে তিনি ব্যাপকভিত্তিতে অবদান রেখেছেন। যুগ-চাহিদা প্রেক্ষিতে সিলেবাস সংস্কার ও আধুনিক শিক্ষা-গবেষণার তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থাবলি রচনার যে ধারা সূচিত হয়েছে- প্রকারান্তরে তিনিই ছিলেন এর প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা। সনদের সরকারি স্বীকৃতি প্রয়োজন- এ কথা সর্বপ্রথম তিনিই উপলব্ধি করেছেন এবং আলেমসমাজে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করিয়েছেন। জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা ও বাতিলবিরোধী কর্মপন্থায় সুচিন্তিত পরামর্শ দিয়ে এবং এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নে তিনি যে বিরাট অবদান রেখে গেছেন, এক জীবনে তার দ্বিতীয় নযীর পাওয়া দুস্কর। এমনকি শুধু বেফাকের আর্থিক উন্নতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নে তার যে অমর কীর্তিমালা- সেগুলো দিয়েও একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব। এখানে সেই না বলা ইতিহাস সংক্ষেপে ইঙ্গিত করা হল মাত্র।

অন্যান্য সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব পালন

উপর্যুক্ত প্রতিষ্ঠান ছাড়া তিনি আরও যেসব সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা নি¤œরূপ :
উদ্যোক্তা সদস্য : ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি বাংলাদেশ, ইসলামী গবেষণা পরিষদ বাংলাদেশ, আল-আনসার ফাউ-েশন, আল-আনসার ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট ও হেল্প বাংলাদেশ।
প্রতিষ্ঠাকালীন সেক্রেটারী জেনারেল: মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী বাংলাদেশ ও কওমী কল্যাণ সংস্থা।
মহাপরিচালক: আল-আমীন রিসার্চ একাডেমি।
সভাপতি: জমিয়ত তালীমুল কুরআন বাংলাদেশ, মালিডাঙ্গা, তারাকান্দা, ময়মনসিংহ
উপদেষ্টা: দৈনিক আমার ইজতিমা, সম্প্রীতি, মাসিক আল-জান্নাত ও দ্বি-মাসিক পরাগ পত্রিকা ইত্যাদি।

বাংলাসাহিত্য চর্চা ও সাধনা

মহান স্বাধীনতার পূর্বে যে কালে তিনি পড়াশোনা শুরু করেছেন, সে কালে যেহেতু এই দেশ ছিল পাকিস্তানের অংশ সেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানের আদলে এই পূর্ব পাকিস্তানের মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমও ছিল উর্দু ও আরবী ভাষা-সাহিত্য। তাছাড়া যেহেতু তখন আলেম-উলামা ও বিদ্বান লোকদের মহলে উর্দুভাষার ব্যাপক চর্চা অব্যাহত ছিল আর বাংলাভাষায় ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞান তেমন প্রচার-প্রসার হয়নি সেহেতু কওমী মাদরাসাগুলোতে বাংলাভাষা এতটা গুরুত্ব অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু দশম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে পড়া বালক ইয়াহইয়া অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে আঁচ করতে পেরেছিলেন যে, অদূর ভবিষ্যতে যদি দেশ স্বাধীন হয়ে যায় তাহলে উর্দুভাষা আর তেমন গুরুত্ব রাখবে না। তখন বাংলাই হবে এই দেশ ও মানুষের জানাশোনার প্রধান মাধ্যম। তখন যদি এই দেশের মানুষের হাতে নিরেট ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞানকে বাংলাভাষায় উপহার না দেওয়া যায় তাহলে মানুষ দীনি বিষয়ে চির অজ্ঞই থেকে যাবে। ধর্মীয় জ্ঞানবিজ্ঞানে তারা আগ্রহ খুঁজে পাবে না। এই চিন্তা থেকেই তিনি আশৈশব বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। স্কুলজীবনেই তিনি প্রায় পাঁচশ-এর অধিক গ্রন্থ অধ্যয়ন করেছেন। পত্র-পত্রিকা ও ম্যাগাজিন সেই অজপাড়া গায়ে দুর্লভ হলেও তিনি কাগজের ঠোঙা ও পথের ধারে পড়ে থাকা ছেঁড়া পত্রিকার পাতা কুড়িয়ে নিতেন। সেখান থেকেই ভাষার শব্দ ও তথ্য আহরণ করতেন।

গবেষণা-অধ্যয়ন ও রচনার ফিরিস্তি

কর্মজীবনে তিনি নিজের জ্ঞানজিজ্ঞাসার জন্য বরেণ্য আলেমগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। তাদের সাথে বসে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করে তার সমাধান জেনে নিতেন। এক্ষেত্রে তার উস্তাদ হযরত মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ, হযরত মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী, হযরত মাওলানা সুলতান যওক নদভী, হযরত মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারূক এবং সরাসরি উস্তাদ নন এমন ব্যক্তিত্বদের শাইখুুল হাদিস হযরত মাওলানা আজিজুল হক, হযরত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, হযরত মাওলানা মুফতী ফজলুল হক আমিনী, হযরত মাওলানা আবদুল জাব্বার জাহানাবাদী র.-এর শরণাপণœ হতেন সবচে বেশি। দীনি বিষয়ে সহকর্মী বা যোগ্য শিষ্যদের কাছে জানাশোনা বা জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে তিনি কখনো কুণ্ঠাবোধ করতেন না।
তাছাড়া যেহেতু পারিবারিকভাবে বই কিনে পড়বার মতো খুব বেশি আর্থিক সঙ্গতি ছিল না, সেহেতু তিনি পরিকল্পনা করে নিজ মসজিদের মুসল্লিদেরকে তাশকীল করতেন, যেন তারা গবেষণার জন্য অমুক অমুক দরকারি গ্রন্থমালা ক্রয় করে মাদরাসায় ওয়াকফ করে দেন। প্রায় বছরই তিনি এই কাজটি করতেন। এভাবে দেখা যেতো, প্রতিবছরই কর্মস্থল মালিবাগ জামিয়ার কুতুবখানা সমৃদ্ধ হয়ে উঠতো। এক বছর তিনি এভাবে তাশকীল করে প্রায় দশ লক্ষ টাকার কিতাব ক্রয় করে মালিবাগ জামিয়ার কুতুবখানায় প্রদান করেন। এক সময় তো এটা সর্বজন সুবিদিত ছিল যে, মালিবাগ জামিয়ার কুতুবখানা ঢাকার মাদরাসাগুলোর মাঝে সবচে বেশি সমৃদ্ধ কুতুবখানা।
তার চিন্তা ছিল, এ গ্রন্থগুলো নিজের কাছে না থাকলেও প্রতিষ্ঠান থেকে সাময়িক সময়ের জন্য নিয়ে মুতালাআ করা যাবে। শিক্ষার্থী ও গবেষকদের গবেষণায়ও বিরাট কাজে দেবে। হয়েছেও তা-ই, জীবনভর তিনি জাতির জন্য যেসব অমূল্য রচনা তৈরি করে গেছেন, তার অধিকাংশই তৈরি হয়েছে মালিবাগ জামিয়ার এই সুবৃহৎ গ্রন্থাগারের সহায়তা নিয়ে।
এর বাইরে তিনি যখনই যেখানে যেতেন সেখানেই প্রাথমিক আলাপচারিতার পর এমন বিষয়ে আলাপ জমিয়ে তুলতেন, যা কখনো কখনো নিজের জ্ঞান-সমৃদ্ধির কাজে দিত। প্রসঙ্গত কখনো কোনো বিষয়ে নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাও অন্যদের সাথে মতবিনিময় করতেন। এতে তিনি নিজেও উদ্দীপিত হতেন, অন্যরাও সমান উপকৃত হত।
তিনি দরসী পড়াশোনার বাইরে সমসাময়িক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে অধ্যয়ন করতে বেশি পছন্দ করতেন। এ কারণে তিনি পত্রপত্রিকার পাশাপাশি নতুন নতুন রচনা ও গবেষণা অধ্যয়নে গভীর মনোযোগ দিতেন। আধুনিক বিষয়াষয়কে ইসলামী আদলে প্রকাশ করবার এক সুতীব্র বাসনা তার ভেতরে কাজ করত। কারণ, আধুনিক বিষয়গুলোকে শরয়ী মেযাজ ও মানহাজের আলোকে প্রকাশ করাকে তিনি দীনি দাওয়াতের অন্যতম ফরীযা ও দায়িত্ব-কর্তব্য জ্ঞান করতেন। ইসলামের রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, আইন-আদালত ও বিচারব্যবস্থা, জনঅধিকার ইত্যকার বিষয়ে অধ্যয়ন তাকে যতটা আকর্ষণ করত অন্য বিষয়গুলো ততটা আকর্ষণ করত না। কারণ, সে বিষয়গুলো তিনি শিক্ষাজীবনের সূচনা থেকেই গভীর মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করে ফেলেছিলেন।
এসব কারণেই তিনি যখনই যেখানে সফর করেছেন সেখানেই আলেম-উলামা বা উর্ধ্বতন শিক্ষক ও গবেষকদের সাথে বসে তিনি এসব বিষয়ে দীর্ঘসময় মতবিনিময় করতেন। এমনকি সৌদি আরবে তিনি পাঁচ বার হজে গিয়েছেন। প্রতিবারই তিনি সেখানকার বয়স্ক আলেম-উলামার সাথে সাক্ষাত করেছেন কিংবা সেখানকার আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করেছেন। সেখানকার বড় বড় পাঠাগারগুলো ঘুরে দেখেছেন। প্রয়োজনমাফিক সেখান থেকে নিজের আগ্রহের বিষয়ে গ্রন্থাদি ক্রয় করে এনেছেন। কখনওবা বিভিন্ন সেমিনারে নিজ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে বক্তৃতা করেছেন।
তার সব পড়াশোনাই হতো কুরআন-সুন্নাহমাফিক জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার শ^াশত চেতনার আলোকে। যে কারণে জীবনের সময় মেপে মেপে তিনি অধ্যয়নে মনোযোগী হতেন। একটু অবসর বা ফুরসত পেলেই তিনি জ্ঞানের সরোবরে সমাহিত হতেন। প্রাতিষ্ঠানিক ছুটিগুলোয় দেখা যেত, পরিবারের আর সবাই নানা আয়েশে-আহ্লাদে মেতে থাকলেও তিনি ডুবে থাকতেন বইয়ের পাতায়। কিংবা সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে নিজের অধ্যয়নের নির্যাস খুঁজে পাবার ভাবনায়। সাংসারিক ব্যস্ততা ও কোলাহলের ভেতরে জ্ঞান সাগরে এভাবে আত্মসমাহিত হবার অনন্য নযীর দ্বিতীয়টি পাওয়া মেলা ভার। এমনই ছিলেন তিনি। এমনই ছিল জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানবিকাশে তার কীর্তি-অবদান। যা হয়তো কেউ খোদায়ী ইশারায় অদম্য ইচ্ছাশক্তি বলেই অর্জন করতে পারে।

লেখালেখির উপাখ্যান

পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি প্রচুর ডায়েরীও লিখতেন। নিত্যদিনের ঘটনা-রোজনামাই ছিল তার লেখার মূল প্রতিপাদ্য। তবে চেতনা সৃষ্টিকারী পদ্য-কবিতাও লিখতেন, যখন তেমন কোনো বোধ-আবেগ তার ভেতরে জমাট হয়ে উঠত। ডায়েরীর পাতায় পাতায় বিমূর্ত হয়ে উঠত তার হাসি-কান্নার কথা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশার কথা। আগামী দিনে দীনের আদর্শবান দায়ী হয়ে উঠবার বিশদ কল্পনা ও পরিকল্পনার কথা।
এরপর ক্রমে ক্রমে তার লেখার বিষয় পরিবর্তন হতে শুরু করে। তিনি সমকালীন বিষয়ে কলম ধরেন। পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে তার লেখা ছাপা হয়। লেখার শব্দচয়ন, বাক্যবিন্যাস আর বিষয়বিন্যাস পাঠকের কাছে এতই আকর্ষণীয় হয়ে উঠে যে, তারা তাকে ক্রমাগত গ্রন্থ লেখায় মনোনিবেশ করার জোর আবদার জানায়।
পাঠকবৃন্দের আবদারে তিনিও আগ্রহ খুঁজে পান। চিন্তা করে তিনি এমন বিষয়ই বেছে নেন, যা পাঠককে দীনি মাশগালায় যুক্ত হতে প্রবলভাবে পথনির্দেশ করে। দীর্ঘদিনের চিন্তা ও গবেষণার প্রেক্ষিতে ‘আল্লাহর পথে সংগ্রাম’ হয়ে উঠে তার প্রথম গ্রন্থ। এরপর তিনি সমসাময়িক বিষয় হিসেবে রচনা করেন, ইসলামের দৃষ্টিতে পীর-মুরিদী।
ইত্যবসরে তিনি ইসলামিক ফাউ-েশন বাংলাদেশের লেখক-সম্পাদক ও অনুবাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। সেখানে তিনি বুখারী শরীফ-এর আংশিক বাংলা অনুবাদ করে দেন এবং প্রিয়বন্ধু মাওলানা ইসহাক ফরীদির সাথে যুক্ত হয়ে অনুবাদ করে দেন দারুল উলূম দেওবন্দের ইতিহাস নামক এক সুবৃহৎ গ্রন্থ। পাশাপাশি তিনি সীরাতে সাইয়্যিদ আহমাদ শহীদ নামক গ্রন্থটিও অনুবাদ করে দেন।
কিন্তু ফাউ-েশনের সাথে যুক্ত হয়ে যখন তিনি দেখলেন, নিজের পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে পারছেন না তখন স্বেচ্ছায় সেই পথ থেকে সরে আসেন। সূচনা করেন ইসলামী গবেষণা পরিষদ বাংলাদেশ-এর কাজ। বছর দুয়েক যেতে না যেতেই যখন দেখতে পেলেন তার এই স্বপ্নসৌধ চুষে খেতে মানবরূপী কিছু দানব উঠে পড়ে লেগেছে তখন আবার তিনি পিছুটান দেন। এবার আর কোনো যৌথ কর্মপন্থায় না গিয়ে একাকীই রচনা-গবেষণা ও লেখালেখির পথ বেছে নেন। এ সিদ্ধান্ত তার জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। মাদরাসার দরস-তাদরীস আর মসজিদের ইমামতির পর যে সময়টুকু তিনি অবসর পেতেন তার সবটাই তিনি গবেষণার পেছনে ব্যয় করেন। ফলে একে একে তার হাত দিয়ে বের হয়ে আসে সংখ্যায় সামান্য হলেও কিছু কালজয়ী গ্রন্থ। নি¤েœ সেগুলোর নাম উল্লেখ করা হল:
১. দেওবন্দ আন্দোলন; ইতিহাস ঐতিহ্য অবদান
২. ¯্রষ্টা ও তাঁর স্বরূপ সন্ধানে
৩. ইসলামী অর্থনীতির আধুনিক রূপায়ণ
৪. আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইসলাম
৫. হাদীস অধ্যয়নের মূলনীতি
৬. ইসলামী আইন ও বিচারব্যবস্থা
৭. ইসলাম ও যৌনবিধান
৮. রচনাসম্ভার
৯. ইসলাম ও সমাজব্যবস্থা
১০. জেগে উঠো হে ঘুমন্ত শতাব্দী
১১. তালিবানে ইলমের জীবন গড়ার কর্মসূচি
এগুলো ছাড়াও তিনি দক্ষ হাতে সম্পাদনা করে দিয়েছেন শহীদবাগ জামে মসজিদে তার মুসল্লী বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক আইজি জনাব আমীনুল্লাহ সাহেবের বেশ কিছু গ্রন্থ। সেগুলোর তালিকা হলো :
১. ব্যবহারিক জীবনে আল-কুরআন
২. আল-কুরআনের নিষিদ্ধ বিষয়
৩. পার্থিবজীবনে ইসলাম
৪. দৈনন্দিন জীবনে কুরআন-সুন্নাহর দুআ-দরূদ
৫. মহাপ্রলয় ও শেষ বিচার
৬. আমেরিকায় ইসলামের দাওয়াত
আল্লামা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া লেখালেখির কথকথা শিরোনামে সংযুক্ত লেখায় তার সম্পাদিত আরও কিছু গ্রন্থের তালিকা উল্লেখ করা হয়েছে; তথায় দ্রষ্টব্য।

পারিবারিক জীবন

পিতা মাওলানা মিয়া হুসাইন ও মাতা মেহেরুননিসা র.-এর ঔরসজাত সন্তান-সন্তুতি ছিল মোট ১২ জন। এর মাঝে এক ছেলে ও এক মেয়ে জন্মের পর ইন্তিকাল করেছেন। বাকি দশ জনের মাঝে ছেলে ৮ জন আর মেয়ে ২ জন। ইয়াহ্ইয়া ছিলেন সবার বড়। বড় সন্তান হিসেবে তিনি ছোট ছোট সব ভাই-বোনকেই আদর-¯েœহ দিয়ে আগলে রাখতেন। পিতা-মাতার সেবা-খেদমত করাকে অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। নিজের সংসারের চেয়েও তিনি মিয়া-মেহেরুননিসার সাজানো সংসারকে সুখে-আনন্দে প্রাণবন্ত করে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। বাবার মৃত্যুর পর গোটা পরিবারকে একই সুতোয় গেঁথে রাখার প্রয়াসে নিরলস ভূমিকা রেখেছেন। অসুস্থ মায়ের সেবা-শুশ্রƒষা ও খেদমতে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে তিনি যে অনন্য নযীর স্থাপন করেছেন- কখনো কখনো তা হয়তো কল্পনা করাও অসম্ভব। একইভাবে পিতার ইন্তিকালের পর ছোট ছোট ভাইগুলোকে আদর-মায়া ও ¯েœহ-শাসন দিয়ে, পড়াশোনায় অগ্রগতির তদারকি করে এবং আচার-ব্যবহার ও আখলাকে হাসানার প্রশিক্ষণ দিয়ে, সর্বোপরি প্রত্যেকের সুষ্ঠু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়ে তিনি যে অমর কীর্তি স্থাপন করেছেন- তা হয়তো কোনো যুগে, কালে-ভদ্রে দেখা মেলে। নি¤েœ তার ভাই-বোনদের নাম ও পরিচিতি উল্লেখ করা হল:
১. হাফেয বদরুল ইসলাম। তিনি দেশ সেরা হিফয শিক্ষক হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। প্রাথমিক জীবনে তিনি টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। এরপর চলে আসেন ঢাকার চৌধুরিপাড়া মাদরাসায়। দীর্ঘ দুই যুগ এখানে শিক্ষকতা করার পর বড় কাটারা মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। এরপর তিনি আসেন তেজগাঁও জামিয়া ইসলামিয়ায়। সবশেষে এখন তিনি নিজ বাড়িতেই একটি হিফয মাদরাসা পরিচালনা করছেন। তার ৪ ছেলে ৪ মেয়ে।
২. মুফতী শামসুল ইসলাম। তিনি পাকিস্তানে করাচির বিন্নুরী টাউন মাদরাসায় ইফতা অধ্যয়ন করেছেন। দেশে আসার পর তিনি মোমেনশাহীর চরপাড়ায় অবস্থিত জামিয়া ইসলামিয়ায় দীর্ঘ দুই যুগ শিক্ষাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ময়মনসিংহে খাদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদরাসা তার হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরপর শিকারিকান্দায় তারই হাতে গড়া জামিয়াতুস সুন্নাহ মুজাহিরুল উলূম মাদরাসায় নায়েবে মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে একদিন সড়ক দুর্ঘটনায় ইন্তিকাল করেন। তার ৫ ছেলে ১ মেয়ে।
৩. মরিয়ম বেগম। স্বামী মাওলানা আমীর হোসাইন। মিরপুর মিল্কভিটা মসজিদের ইমাম। তার ৬ ছেলে ১ মেয়ে।
৪. মুফতী তৈয়্যেব হোসাইন। তিনি লালবাগ জামিয়া ঢাকায় পড়াশোনা সমাপ্ত করে এখানে শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি এ প্রতিষ্ঠানের নাযেমে তালিমাত ও শূরা সদস্য নির্বাচিত হন। এর পাশাপাশি তিনি বড় কাটারা মাদরাসার প্রিন্সিপ্যাল, দারুল উলূম কাকরাইল মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপ্যাল ও মারকাযুল কুরআন বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপ্যাল এবং দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় সহ.সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি বহু গ্রন্থের লেখক, অনুবাদক ও সম্পাদক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন। তার ৪ মেয়ে ২ ছেলে।
৫. মাওলানা তাহের। তিনি কর্মজীবন শুরু করেন মৌলভীবাজারের দারুল ঊলূম টাইটেল মাদরাসায় শিক্ষাসচিব হিসেবে। বৃহত্তর সিলেটের কওমী শিক্ষাবোর্ড আযাদ দীনি এদারায়ে তালিমের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন তিনি ভাটারার ছোলমাইদ দারুল উলূম মাদরাসার প্রিন্সিপ্যাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
৬. ফরিদা বেগম। স্বামী মাওলানা জয়নুল আবেদীন। তিনি জমিয়ত তালিমুল কুরআন এর মহাব্যবস্থাপক। একই সাথে লালমনিরহাটে দারুল উলূম মাদরাসা ও মারকাযুল কুরআন মহিলা মাদরাসার প্রিন্সিপ্যাল। তার ৭ ছেলে ৪ মেয়ে।
৭. ডাক্তার তাজুল ইসলাম। তিনি শিশু ও মেডিসিন বিষয়ে এফসিবিএস পাশকৃত। বর্তমানে জামালপুর জেলাসদর হাসপাতালে বিভাগীয় প্রদান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
৮. মাওলানা নজরুল ইসলাম। তিনি জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ-ঢাকার শিক্ষাসচিব, মায়াকানন জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব, দারুল উলূম মায়াকানন মাদরাসার প্রিন্সিপ্যাল, খাদিজাতুল কুবরা ময়মনসিংহ-এর প্রিন্সিপ্যাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার ২ ছেলে ১ মেয়ে।
৯. মাওলানা ফখরুল ইসলাম। তিনি শেখ জনুরুদ্দিন দারুল কুরআন চৌধুরিপাড়া মাদরাসার সিনিয়র উস্তায ও তালতলা চাঁন জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার ২ ছেলে ২ মেয়ে।
উল্লেখ্য, ভাইবোনসহ তাদের সন্তানাদির খোঁজখবর রাখা ও তাদের সবার তারবিয়্যতের সুচারু দায়িত্ব পালন করেছেন আল্লামা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া। জীবনের শেষ ভাগে তিনি অসুস্থাবস্থায়ও নিয়মিতভাবে তাদের সবার খোঁজখবর নিয়েছেন।

পরিবারের সদস্যদের দেখভাল ও তারবিয়্যত

আজীবন তিনি একজন আদর্শ অভিভাবকের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব সুচারুরূপে আঞ্জাম দিয়েছেন। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ব্যাপারে তিনি খোঁজ-খবর রাখতেন। নিজে সবার সাথে জয়-যোগাযোগ রক্ষা করতেন। কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যেতেন। কেউ মারাত্মক কোনো অসুস্থ হলে তিনি নিজের বাসায় নিয়ে এসে তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। নিজেও তার সেবা ও মানসিক পরিচর্যা করতেন।
একইরূপে পরিবারের কারও বিয়ে-শাদি করা বা দেওয়ার হলে তিনি নিজেই উদ্যোগ নিয়ে মুরুব্বী ও অভিভাবক হিসেবে যাবতীয় দায়-দায়িত্ব সম্পাদন করতেন। তার চিন্তা ও পরিকল্পনায় বিয়ে-শাদিগুলো অনায়াসেই সরল-সুন্দররূপে সম্পন্ন হতো।
পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মকে হিদায়াত করার জন্য তিনি বেছে নিতেন প্রতিষ্ঠানগুলোর ছুটির সময়গুলো। এসময় তিনি সবাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যেতেন। সেখানে ঘোরাফেরা ও আনন্দ-উদযাপনের শেষ সময়ে তিনি সবাইকে নিয়ে বসতেন। কার কী সুবিধা ও অসুবিধা, কার কী সাফল্য ও ব্যর্থতা- সেগুলো নিয়ে আলোচনা ও আত্মসমালোচনা করতেন। সবাইকে সুন্দর জীবন গঠণে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতেন। কারও বিশেষ কোনো সমস্যা ও অসুবিধা দেখা দিলে তাকে একান্তে ডেকে নিয়ে বুঝাতেন-নসীহত করতেন। হৃদয় থেকে উৎসারিত তার সেসব কথা-বার্তা আজ যেমন হৃদয়-কন্দরে আনন্দের আবেগ জড়ো করে তেমনি তার শূণ্যতা বুক-ছেঁড়া হাহাকার হয়ে ইথারে ছড়িয়ে পড়ে। আহা! কী অমূল্য রত্ন ছিলেন তিনি- এই অধম ও অভাগার জন্য!

বৈবাহিক জীবন

যেহেতু তিনি দশম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে পড়াশোনা করেছেন, এরপর মাদরাসার পড়াশোনা একদম গোড়া থেকে শুরু করেছেন, সেহেতু জালালাইন জামাতে অধ্যয়নের সময়ই তার বিয়ে-শাদির বয়স হয়ে যায়। তাছাড়া ছোট ছোট ভাই-বোনগুলোকে নিয়ে মা-ও একা একা কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। এ কারণে জালালাইন জামাতে অধ্যয়নকালে এক পরীক্ষার বন্ধে তার বিয়ের ইন্তিজাম করা হয়। পারিবারিক মুরুব্বীদের উপস্থিতিতে তিনি বিয়ে করেন একই গ্রামের অধিবাসী, ধর্মানুরাগী ব্যক্তিত্ব খন্দকার সিরাজুল ইসলাম সাহেবের বড় কন্যা মুসাম্মত শাহানা সুলতানাকে। বধু হিসেবে তিনি ছিলেন বড়ই গুণবতী। সবার সাথে অমায়িক আচার-ব্যবহার, সংসারে মনোযোগী এবং রান্নাবান্নায় বিশেষ পারঙ্গম। একই সাথে পুরো পরিবারের দায়-দায়িত্ব সামলানো ও মেহমানদারিতে অতুলনীয় গুণের অধিকারী। স্বামীর সেবা-যত্ন, সন্তান প্রতিপালনসহ নিজ জীবনে সব কিছুতেই তিনি বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শণ করেছেন।
নিজ স্ত্রীর সাথে তার কেটেছে অনন্য জীবন। দু’জনের বোঝা-পড়া, প্রীতি-আনুগত্য, আস্থা-নির্ভরতা, বিশ^াস-ভালোবাসা ও পরস্পরের প্রতি কল্যাণকামিতা ছিল ঈর্ষাতুল্য। দু’জনে মিলে আপন পরিবার ও সংসার এতটাই দক্ষতার সাথে সামলে নিয়েছেন- যার গল্পগুলো জানতে পারলে পাঠক যারপরনাই উপকৃত হবে। সময় ও সুযোগ হলে কখনো হয়তো সেই গল্পগুলো লিখে যেতে চাই।

সন্তানাদি

তাদের ঔরসে জন্ম নিয়েছে, ৪ মেয়ে ও ৩ ছেলে। এক মেয়ে জন্মের পরপরই ইন্তিকাল করেছে।
ছেলে তিনজন হল:
১. বুশরা সুলতানা। স্বামী, হাফেয মাওলানা হাবীবুর রহমান আকন্দ। শিক্ষাসচিব, তেজগাঁও রেলওয়ে জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসা। খতীব, নূরাণী জামে মসজিদ, জে ব্লক, বারিধারা, ঢাকা।
২. মুফতী আবু নাঈম মুহাম্মদ সাজিদ। আলেম, মুফতী ও শিক্ষাসচিব, মারকাযুল কুরআন বাংলাদেশ। এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, আরএ-ডি, দারুত তাকবীর [মাদরাসা প্রজেক্ট] লেকচার পাবলিকেশন্স ঢাকা ।
৩. হুমায়রা সুলতানা। স্বামী, হাফেয মাওলানা মুফতী আবদুল্লাহ মুকাররম ইবনে মাওলানা আবদুর রহমান হাফিজ্জী। শিক্ষাসচিব, জামিয়া আরাবিয়া মাখযানুল উলূম তালতলা, ময়মনসিংহ। খতিব, কাচিঝুলি জামে মসজিদ, ময়মনসিংহ।
৪. রুতায়বা সুলতানা। স্বামী, মাওলানা মুফতী মাহমুদ হাসান ইবনে মাওলানা আবদুল আউয়াল। শিক্ষাসচিব, জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া, হাজিপাড়া, কাশিপুর, নারায়ণগঞ্জ। খতীব, কাশিপুর জামে মসজিদ।
৫. আবু তামীম মুহাম্মদ যায়েদ। জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া, হাজিপাড়া, কাশিপুর, নারায়ণগঞ্জ-এ মুতা-১ম বর্ষে অধ্যয়নরত।
৬. আবু শামীম মুহাম্মদ শাকের। জামিয়া ইমদাদুল উলূম ছোলমাইদ ভাটারা মাদরাসায় মুতা-৩য় বর্ষে অধ্যয়নরত।

নিজ পরিবারে যে বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে চেয়েছেন

নিজ পরিবার নিয়ে তার স্বপ্ন ছিল নিঃসীম সুন্দরতম। পরিবারের সবাইকে দীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করা, নববী আদর্শে আদর্শবান করে গড়ে তোলা, সত্য ও সুন্দরের শাশ^ত চেতনায় মন-মনন জাগরুক করে তোলা, আচার-ব্যবহার, আখলাকে হাসানাহ, চরিত্রমাধুরিমার গুণে গুণান্বিত করে তোলা- এ-এই ছিল তার সারাজীবনের ভাবনা। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নেই তিনি আমৃত্যু চেষ্টা-পরিশ্রম করে গেছেন। এর বাইরে পরিবারের সবাই যেন হাসিমুখে থাকে, কারো মনে যেন কোনো দুঃখ- বেদনা না থাকে, কেউ যেন মনের অজান্তে কোনোরূপ চাপাকষ্ট বয়ে না বেড়ায়- সেজন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। কাউকে মুখ গোমড়া দেখলে এমন কথা বলতেন- যা শুনে সে হেসে দিত। কিংবা হয়তো তাকে কাছে বসিয়ে এমন মধুর কথা বলতেন- যা শুনে তার দুঃখ ঘুচে যেত। সে আবার স্বপ্নমুখর হয়ে উঠতো। ছোট বাচ্চাদের সাথে দুষ্টুমি করা ছিল তার সহজাত স্বভাব। মোটকথা, একটি পরিবারকে আনন্দঘন পরিবেশ উপহার দেওয়া ছিল তার নিত্যকার ভাবনা। তিনি বলতেন, আমাদের এই পরিবারটি একটি সুন্দর সাজানো বাগান। বাগানে যেমন ফুলপাখিরা নিত্যআনন্দে দিন কাটায়- আমি চাই, আমার পরিবার ও সংসারও সারাক্ষণ এমনি হাসিখুশি থাকুক, সবার মনেই আনন্দের বান ছুটুক।

ব্যক্তিজীবন

ব্যক্তিজীবনে তিনি খুবই দূরদর্শী, চিন্তাশীল ও নীতিবান ব্যক্তি ছিলেন। দুনিয়ার জীবনের চেয়ে আখেরাতের অনন্ত জীবনকেই বেশি প্রাধান্য দিতেন। যতটুকু হলে দুনিয়ার জীবন সম্মানজনকভাবে কাটানো যায়- কেবল ততটুকুর জন্যই চেষ্টা করতেন। অর্থবিত্ত গড়ার চিন্তা কখনও প্রশ্রয় দিতেন না। অনাড়ম্বরপূর্ণ সহজ-স্বাভাবিক জীবন যাপন করতেন। সর্বোপরি মানুষের হীত ও কল্যাণ কামনায় সদা চিন্তা-ফিকির করতেন।

উদারপ্রাণ মহৎ ব্যক্তিত্ব

বড় ও নামীদামী অনেকেই হতে পারেন, কিন্তু তার মতো ব্যক্তিত্ব সচরাচর পাওয়া দুষ্কর। ব্যক্তিত্ব ও আদর্শে তিনি ছিলেন এক বৃহৎ বটবৃক্ষ। যার ছায়ায় পথিক বিশ্রাম নেয়। সফরের ক্লান্তি দূর করে আবার পথ চলবার শক্তি-সাহস সঞ্চয় করে নেয়। তিনি এমনই ছিলেন। জীবনপথে নানা সংশয়-সংকটে নিপতিত ব্যক্তিরা তার কাছে ছুটে আসতো। তার কাছে নিজের সমস্যা ও দুঃখের কথা শোনাতো। তিনি তাদের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। সমস্যার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতেন। এরপর যে বিষয়টি ভালো মনে করতেন- সেটিই তাকে বলে দিতেন। তার পরামর্শ মেনে জীবনের দুর্যোগ দূর করা মানুষের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়।
আবার জীবনের চলতি পথে এমন কিছু মানুষও এসেছিল তার জীবনে- যারা তার সুপরামর্শ, দয়া ও নেক নজরের কল্যাণে নানারূপে উপকৃত হলেও কৃতঘœ হতে দেরি করেনি। কালের বিবতর্নে তার সাথে বেয়াদবিও করেছে। কিন্তু তিনি তাদেরকে উদারমনে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুযোগ থাকলেও তার ক্ষতি করার কথা কখনো চিন্তাও করেননি।
ব্যক্তিত্ব ও আদর্শে যারা বড় হন- তারা এমনই হয়ে থাকেন। বিশেষত, নববী ওরাসাতের জিম্মাদারী নিয়ে যারা পথ চলেন তারা কখনো হিংসা-বিদ্বেষ, গীবত-কূটনামি, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদির পেছনে পড়েন না। তারা সবসময় ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দাওয়াত ইলাল্লাহর প্রেরণায় সম্মুখে এগিয়ে যান।

মানুষের সাথে আচার-ব্যবহার

মানুষের সাথে আচার-ব্যবহারে তিনি ছিলেন খুবই সতর্ক। কেউ তার কোনো কথায় বা আচরণে কষ্ট পাক- এটা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারতেন না। দেখা যেত, কোনো কারণে বয়সে ছোট এমন কাউকে যদি রাগের সাথে কিছু বলতেন, তাহলে পরবর্তীতে তার সাথে দেখা-সাক্ষাত হলে রাগের জন্য ওজরখাহি করতেন। তবে তার সচরাচর অভ্যাস ছিল, তিনি কেবল শরীয়তগর্হিত কাজ হতে দেখলেই রাগ করতেন। ব্যক্তিগত স্বভাব-অভ্যাসবশত কারও সাথে রাগ করতেন না।
বড়দের সাথে তার কৃত আচরণ হতো ছোটদের জন্য শিক্ষণীয়। বয়সে বা জ্ঞানে বড়- এমন ব্যক্তিদের সাথে তিনি শিষ্যসুলভ আচরণ করতেন। তার কোনো প্রয়োজন সমাধা করে দিতে পারলে তিনি পরিতৃপ্তি বোধ করতেন।

সত্যকথন ও এর ওপর দৃঢ়তা

সত্যকথন ছিল তার সহজাত আখলাক। শরয়ী শিক্ষা ও মানহাজের আলোকে যা সত্য বলে প্রমাণিত- তিনি সবসময়ই সে সত্যের পক্ষাবলম্বন করতেন। নিজে সত্য বলতে পছন্দ করতেন। অপর কেউ অসত্য বলেছে বলে প্রমাণ পেলে তিনি প্রচুর রাগ করতেন। তাছাড়া সত্যকথনে তিনি কাউকে তোয়াক্কা করতেন না। সত্যকথা বললে চাকরি থাকবে না- অনেকেই এ ভয়ে সত্য পরিহার করে। কিন্তু তিনি কখনই মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করাকে প্রশ্রয় দিতেন না। পরিবার থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে জাতীয় পরিম-ল- সর্বক্ষেত্রেই তিনি সবসময় সত্যকথনে গুরুত্ব দিতেন। সত্যের পক্ষেই অনড়-অবিচল থাকতেন। এক্ষেত্রে কারও চোখ রাঙানিকে কখনো ভয় করতেন না।

সবার সাথে হাসিমুখে সাক্ষাত

পরিচিত-অপরিচিত সবার সাথে হাসিমুখে সাক্ষাত করা ছিল তার অন্যতম গুণ। কেউ তার সাথে দেখা করতে এলে তিনি স্মীত হাসি দিয়ে তাকে বরণ করতেন। মুখে সারাক্ষণ হাসির আভা ছড়িয়ে রাখতেন। হাসিখুশির কথা বলে মজলিস প্রাণবন্ত করে রাখার এক বিরল গুণ ছিল তার।

মেহমানদারি করিয়ে তৃপ্তি লাভ

মেহমানদারিতে তিনি ছিলেন বিশেষ দক্ষ ও পারঙ্গম। বিশেষ করে আলেম-উলামা ও তালিবুল ইলমদেরকে মেহমানদারি করিয়ে তিনি বেশ তৃপ্তি বোধ করতেন। কেউ বাসায় এলে তিনি বাজার থেকে বড় বড় সুস্বাদু মাছ-গোশত ও তরি-তরকারি কিনে আনতেন। বাসায় এনে সেগুলো রান্নার প্রক্রিয়াও নিজের মতো করে বলে দিতেন। তাছাড়া কে কি পছন্দ করে তা আগে থেকে জেনে নিতেন এবং তার জন্য সেরূপ ব্যবস্থা করার চেষ্টা করতেন।

নির্লোভ জীবন

আল্লাহ তাআলা তাকে যে অসাধারণ মেধা ও বুদ্ধি দান করেছিলেন, এমনিভাবে তাকে যেরূপ কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দান করেছিলেন, তাতে কয়েকটা বাড়ি-গাড়ি করা তার জন্য কোনো ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু তিনি মনে করতেন, মেধা-বুদ্ধি সবই আল্লাহরই দান। সুতরাং এই মেধা-বুদ্ধিকে যদি তার দীনের প্রচার-প্রসারে ব্যয় করা না হয় তাহলে তা এক প্রকার খেয়ানত। জীবন চলবার মতো অর্থকড়ির ব্যবস্থা হয়ে গেলে এরপর আর দুনিয়া কামানোর পেছনে লেগে থাকা মানে নিজের পরকালীন জীবনকে বরবাদ করে দেওয়া। এ কারণে তিনি দিন চলবার মতো আর্থিক ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ার জন্য যতটুকু সময় দেওয়া প্রয়োজন কেবল ততটুকুই সময় দিতেন। বাকি সময়টুকু তিনি রচনা ও লেখালেখির পেছনে ব্যয় করতেন। লেখালেখির ক্ষেত্রেও তিনি এমনসব বিষয়ই বেছে নিতেন, যে বিষয়ে কালের ভাষায় রচনা ও গবেষণা পরিবেশন করা নিতান্ত প্রয়োজনীয়।

সময়ানুবর্তিতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা

মানুষের জীবন হলো কিছু সময়সমষ্টির নাম। অল্প কিছুদিনের হায়াত দিয়ে মানুষকে এই পৃথিবীতে পাঠানো হয়। এই সময়ের ভগ্নাংশগুলো যাদের হেলায়-ফেলায় কেটে যায়, নিজ জীবনে তারা কিছুতেই সাফল্যের সাক্ষর রাখতে পারে না। এ কথা তিনি সবসময় চিন্তা করতেন। যে কারণে খাওয়া-দাওয়া, গোসল-নামায, পড়াশোনা, মানুষের সাথে দেখা-সাক্ষাত ইত্যকার যাবতীয় বিষয়গুলোই তিনি সময় মেপে মেপে করার চেষ্টা করতেন। নিজের জীবনকে নির্দিষ্ট রুটিনমাফিক পরিচালনা করাকে তিনি খুবই গুরুত্ব দিতেন। কোনোদিন নিয়মের ব্যতয় ঘটলে সেদিন তার মন-মেজায বেশি ভালো যেত না। এদিক বিবেচনায় বলা যায়, সময়ানুবর্তিতার এই গুণটি তাকে এত বড়ো হতে সবিশেষ সাহায্য করেছে।

সভা-সম্মেলন ও সেমিনারে ওয়ায-বক্তৃতা, উপস্থাপনায় দক্ষতা ও পারঙ্গমতা

সভা-সেমিনারে উপস্থাপনা, বয়ান ও বক্তৃতা তিনি বিশেষ দক্ষ ছিলেন। মালিবাগ জামিয়ার বার্ষিক অনুষ্ঠানগুলোতে তিনি যে আকর্ষণীয় ভঙিমায় অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন- তা আজও তার ভক্ত-অনুরক্তের মুখে মুখে শোনা যায়। শ্রোতাগণ তন্ময় হয়ে তার উপস্থাপনা উপভোগ করতেন।
তাছাড়া ছাত্রদের তারবিয়্যতি মজলিসে নসীহত, জাতীয় পর্যায়ে সভা-সেমিনারে তার দেয়া ভাষণ-বক্তৃতা, দেশের আনাচে-কানাচে অনুষ্ঠিত দীনি মজলিসে তার উপস্থাপিত ওয়ায ও বয়ান ছিল খুবই জাদুকরী। তিনি অল্প কথায়, সুন্দর উপমা দিয়ে সহজ-সাবলীল ভাষায় নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পছন্দ করতেন। যার ফলে, শ্রোতাগণ সহজেই বক্তৃতার মর্ম অনুধাবন করতে পারত। কুরআন-সুন্নাহর রেফারেন্সসহ তার দেওয়া বক্তৃতাগুলো সহজেই শ্রোতাদের মনে রেখাপাত করত।

ইসলাহে নফস ও আধ্যাত্মিক সাধনা ও মুজাহাদা

আত্মসংশোধন ছিল তার সারাজীবনের সাধনা। জীবনের শুরু ভাগে তিনি কারো হাতে বায়আত না হলেও বড় বড় আলেম-উলামা ও বুযুর্গানে দীনের সাথে তিনি নিত্য উঠাবসা করতেন। তাদেরকে দেখে দেখে তিনি নিজের সংশোধনের চেষ্টা করতেন। প্রয়োজনবোধে নিজের উস্তাদগণের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে জীবন পরিচালনা করতেন।
বয়স যখন পঞ্চাশের কাছাকাছি প্রায়, তখন তিনি ইসলাহী সম্পর্ক গড়েন মাদানী সিলসিলার হক্কানী পীর-বুযুর্গ, নানুপুর মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা শাহ জমিরুদ্দীন নানুপুরী র. এর সঙ্গে। বায়আত গ্রহণের মাত্র এক সপ্তাহ পরই তিনি পীর সাহেবের কাছ থেকে খেলাফত লাভ করেন। কিন্তু তিনি কাউকে বায়আত করাননি। আমৃত্যু পীর সাহেবের দেয়া আত্মসংশোধনের সবক ও নির্দেশনা অনুসারে আমল করে গেছেন।

বড় কিছু অসুস্থতার নেয়ামত

যাদের জীবনের পুরোটা সময় অতিবাহিত হয় উম্মাহর ফিকির-ভাবনায়, আল্লাহ তাআলা তাদের জীবনে কিছু বড় অসুস্থতার নেয়ামত দান করেন। যার উসিলায় তিনি তার প্রিয় বান্দার সমূহ ভুলভ্রান্তিগুলো ক্ষমা করে দেন এবং তাকে নিজের বিশেষ বান্দার কাতারে ঠাই দান করেন।
আল্লামা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া র.-এর জীবনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তিনি যেহেতু নিজের জীবন, সময় ও কর্মগুলো আল্লাহর ওয়াস্তে ব্যয় করেছেন এবং ইলায়ে কালিমাতুল্লাহর মিশন বাস্তবায়নে নিজের সুস্থতা-অসুস্থতার দিকে ফিরে তাকাননি সেহেতু আল্লাহ তাআলাও তাকে পছন্দ করে নিয়েছেন। নিজের মুকাররাব বান্দা হিসেবে গণ্য করার জন্য তিনি তার জীবনে তিনটি বড় অসুস্থতা দান করেছেন। এর একটি হল হো-া এক্সিডেন্টে পা ভেঙ্গে যাওয়া। আর দুটি হলো, ব্রেণ স্ট্রোক করা। যদিও প্রেসার, ডায়াবেটিসের ন্যায় দুষ্ট রোগগুলো দীর্ঘ দিন ধরেই তার শরীরে বাসা বেধে ছিল।

জীবনে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনামালা

তিনি যে গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন, আজও সে গ্রামটি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় স্বনির্ভর নয়। এখানে জনসাধারণের মাঝে শতকরা প্রায় ৫০% লোক অতিদরিদ্র। গ্রাম ছেড়ে তিনি শহরে এসে থাকলেও গ্রামের মানুষগুলোর জন্য তার মনের ভেতরে একটি শূণ্যতা অনুভব করতেন। এ কারণে ঈদের আনন্দ-উপলক্ষ, বিয়ে-শাদি এবং রোগ-শোকের দিনগুলোতে তারা যেন নিদারুণ কষ্টে দিন না কাটান সে জন্য তিনি একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রতি ঈদের সময় তিনি বিত্তবানদের থেকে অর্থ উঠিয়ে তাদের জন্য শাড়ি-লুঙ্গি, লাচ্ছা-সেমাই, চাল-ডাল ইত্যাদি কিনে নিয়ে যেতেন। অতি অসুস্থদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। সহায়-সম্বলহীনদের হাতে অর্থকড়ি দিয়ে আসতেন।
হো-া এক্সিডেণ্টে যখন তার পা ভেঙ্গে যায় কিংবা যখন ব্রেণ স্ট্রোক করে তিনি বিছানায় শায়িত তখন কোনোদিন এর জন্য কোনো অনুযোগ করতে বা হা-হুতাশ করতে দেখা যায়নি। তিনি এগুলোকে তকদীরের লিখন বলে সহ্য করে নিতেন এবং আল্লাহর কাছে রোগমুক্তির দুআ করতেন। আশ্চর্যকর ব্যাপার হলো, এসব অসুস্থতার পরও তিনি আরও তিনটি মোটা বই লিখেছেন এবং অন্যদের বই সম্পাদনা করে দিয়েছেন। কাজপাগল একজন মানুষের এসব ঘটনা খুবই বিস্ময়কর। হিম্মত বা আত্মমনোবল একজন মানুষকে এতটা কর্মসক্ষম করে দিতে পারে!

ইন্তিকাল

ইন্তিকালের আগে তিনি তৃতীয়বারের মতো ব্রেণ স্ট্রোক করেন। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। অবশেষে ২০ শে মে ২০১৭ খ্রি. মুতাবিক ২৩ শে শাবান ১৪৩৮ হি. শনিবার সকাল ৮.৩০ মিনিটে কাকরাইলস্থ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে আই.সি.ইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কালের এই মহা কিংবদন্তী ইহজীবন ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন…!

জানাযা ও দাফন

ইন্তিকালের দিনই বাদ ইশা দীর্ঘদিনের প্রিয় প্রতিষ্ঠান মালিবাগ জামিয়া মসজিদে অসংখ্য-অগণিত আলেম-উলামা ও ত্বলাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন নিজ গ্রামের বাড়ি মালিডাঙ্গায় পারিবারিক কবরস্থানে কালজয়ী এ মহান ব্যক্তিত্বকে সমাহিত করা হয়। আল্লাহ তাআলা তার কবরকে শীতল রাখুন। তাকে মুত্তাকীন, সিদ্দীকীন ও শুহাদাদের সাথে জান্নাতের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করুন। তাঁর নীতি-আদর্শ ও চেতনা আঁকড়ে ধরে আমাদেরকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।

আগের সংবাদবেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ায় তাঁর কর্ম, অবদান ও প্রত্যাশা
পরবর্তি সংবাদস্মৃতিতে যিনি অম্লান