হলি আর্টিজানের তিন বছর : ফিরে দেখা গুলশান হামলা

রাগিব রব্বানি

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসী হামলার তিন বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ১লা জুলাই রাতে অভিজাত এ রেস্তোরাঁটিতে আকস্মিক হামলা চালায় অস্ত্রধারী কিছু যুবক। তার পরপরই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় শান্ত-সমাহিত এই এলাকাটি। যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল পরদিন সকাল অবধি।

সন্ত্রাসীদের আকস্মিক এ আক্রমণে হলি আর্টিজানে খেতে আসা ১৭ বিদেশি নাগরিক প্রাণ হারান, সেই সঙ্গে কর্মচারীসহ প্রাণ যায় আরও তিন বাংলাদেশির। তার খানিক পরে অভিযান পরিচালনা করতে প্রাণ যায় আরও দুই পুলিশ কর্মকর্তার। নিহত হয় হামলাকারীদের ৫ সদস্যও।

কী ঘটেছিল সেদিন, হামলা থেকে বেঁচে ফেরা হলি আর্টিজানের বাবুর্চি দেলোয়ার এবং রেস্তোরাঁয় খেতে আসা শারমিনা পারভীন বর্ণনা দিয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে।

সেদিন ছিল ২৫ শে রমজান শুক্রবার। গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁর চিত্রটা অনেকটা এই রকম—লন আর বসবার জায়গাগুলোতে বসে আছেন জাপানি অতিথিদের একটি দল, ইটালিয়ান অতিথিদের বড় একটি দল, ছোট ছোট দলে বিভক্ত আরো কিছু বাংলাদেশী এবং আরো দুটি দেশের নাগরিক। কারো কারো টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে, কারো জন্য খাবার তৈরি হচ্ছে।

শারমিনা পারভীন স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে এসেছেন রেস্তোরাঁটিতে।

শারমিনা পারভীন সে-রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘খাবার অর্ডার করতে যাব। মেন্যু দিয়ে গেছে। সেই মুহুর্তেই গোলাগুলির শব্দ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি সন্ত্রাসীরা আমাদের সামনে। শব্দ শুনে যেটা বুঝলাম, ওরা বাইরে লনে অ্যাটাক করেই তারপর ভেতরে এসেছিল। আমাদেরকে হেড ডাউন করতে বলল। আমরা মুসলিম কিনা জিজ্ঞেস করল। ওই টেবিলে শুধু আমাদের ফ্যামিলিই ছিলাম।’

শারমিনা আরও বলেন, ‘তারপর আমাদের সামনে ও পেছনের টেবিলে যারা ছিল তাদের শ্যুট করল এবং চাপাতি দিয়ে কোপানো শুরু করল। আগে গুলি করে তারপর কাছে গিয়ে কুপিয়েছে।’

মিসেস করিমের বক্তব্য যদি সঠিক হয়, তাহলে শুক্রবার রাত নটার কিছু আগে বা পরেই লাশে পরিণত হয়েছিলেন হতভাগ্য ৭ জন জাপানী, ৯ জন ইটালিয়ান, একজন ভারতীয়, দুজন বাংলাদেশী এবং একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক।

তারপর প্রায় সারারাত ধরেই একটি টেবিলে শারমিনাকে তাঁর স্বামী ও দুই সন্তানসহ বসিয়ে রাখা হয়। তাদের টেবিলে এনে বসানো হয় আরও দুজন তরুণী এবং দুই ব্যক্তিকে। তবে সকাল নাগাদ কমাণ্ডো অভিযানের আগেই তাদের বেরিয়ে যেতে দেয় সন্ত্রাসীরা।

এদিকে রাতে যখন গুলি করতে করতে সন্ত্রাসীরা রেস্তোরাঁয় ঢুকছিল, তখন দোতলার ফ্রিজ থেকে মাছ আনতে গিয়েছিলেন বাবুর্চি দেলোয়ার হোসেন। গুলির শব্দ পেয়ে তিনি আরও কয়েকজন সহকর্মীর সাথে দৌড়ে একটি বাথরুমে ঢোকেন। একটি বাথরুমে মোট ৯ জন।

হামলাকারীরা সেটা টের পেয়ে বাথরুমটির দরজা বাইরে থেকে লাগিয়ে দেয়। ভোর পর্যন্ত ছোট্ট বাথরুমটিতে ঠাসাঠাসি করে কোনোমতে প্রাণ রক্ষা করেন রেস্তোরাঁর নয় কর্মী।

এক পর্যায়ে তারা নিজেদের জামাকাপড় খুলে ফেলেন। তারপর অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হলে ভোরে দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসেন, তখনও সন্ত্রাসীদের দখলে রেস্তোরাঁ, বেরিয়ে তারা সামনে পড়েন হামলাকারীদের। বাবুর্চি দেলোয়ার হোসেন বলছেন, ৯ জনের ৩ জনই ভয়ে দোতলা দিয়ে লাফিয়ে পাশের ভবনে চলে যায়।

দেলোয়ার বলেন, ‘আমাদের তিন জনকে ভেতরে নিয়ে যায়। ভেতরে দেখলাম অনেক রক্ত আর লাশ। সবাই ফ্লোরে পড়ে আছে।’

হামলাকারীর সংখ্যা মোট পাঁচজন ছিল উল্লেখ করে দেলোয়ার বলেন, ‘তাদের হাতে বড় একটা অস্ত্র ছিল। ছোট পিস্তল ছিল একটা। আর একটা করে চাপাতি। তাতে রক্তের দাগ।’

এর কিছুক্ষণ পরেই প্যারা কমাণ্ডোদের অভিযান শুরু হয়। প্রাণ রক্ষার্থে আবারো লুকিয়ে পড়েন দেলোয়াররা। হামলাকারীদের ভাগ্যে কী ঘটেছে সেটা দেখার সুযোগ আর হয়নি তাদের।

এদিকে রাত নটায় হামলা শুরুর পর সাড়ে দশটা নাগাদ রেস্তোরাঁয় পরপর দুটো বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় অস্ত্রধারীরা। ইতিমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ব্যারিকেড দিয়ে ফেলেন, যাতে সন্ত্রাসীদের কেউ পালিয়ে যেতে না পারে। পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় গুলি বিনিময় হয়। এতে দুজন পুলিশ সদস্য আহত হয়ে পরে মারা যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নৌ ও সেনাবাহিনীর দুটো ফোর্স আসে রাতেই। পরে সকালবেলা তাদের ৪৫ মিনিটের কমাণ্ডো অভিযানে ৫ সন্ত্রাসী নিহত হয় এবং একজন হয় গ্রেপ্তার। আর এর মধ্য দিয়েই পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, হলি আর্টিজানের এ হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলা। ইসলামের নামে ভ্রান্তিসৃষ্টিকারী বিপথগামী গোষ্ঠী আইএস এ হামলার দায় স্বীকার করেছে।

তবে এই হামলার মধ্য দিয়ে একটা অপবাদের অপনোদন হয়েছে বলে মনে করেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ড. আ ফ ম খালেদ হোসেন।

ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে তিনি বলেন, হলি আর্টিজানের নারকীয় তাণ্ডবে যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের কেউই মাদরাসা বা বাংলাদেশের ইসলামি ঘরানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল না, এটা তো প্রমাণিত সত্য। বিভিন্ন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ছিল তারা। ফলে মাদরাসাকে জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র বলে একসময় যারা বিষোদগার করত, তাদের মুখে ছাই পড়েছে। এবং মানুষের কাছে এটা পরিস্কার হয়ে গেছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাউকে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী বানায় না, সেটা যেকোনো ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ বরং জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ছাত্রদেরকে সোচ্চার করা এবং সত্যিকারের মানুষ হবার দীক্ষা দেওয়া।

ড. আ ফ ম খালেদ বলেন, আমি হলফ করে বলতে পারি, এ দেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে যেভাবে সত্যিকারের মানবিকতার পাঠ দেওয়া হয়, বাংলাদেশের আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সেভাবে মানবিকতার চর্চা বিদ্যমান নেই। হলি আর্টিজানের ঘটনা অবশ্যই দুঃখজনক, তবে এ ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে, কওমি মাদরাসায় সন্ত্রাস কিংবা জঙ্গিবাদের কোনো পাঠ বা প্রশ্রয় নেই।

হলি আর্টিজানের ঘটনায় নিহতদের জন্য শোক প্রকাশ করে ড. খালেদ বলেন, আগামীতে আর কোনো হলি আর্টিজেনের শিকার যেন বাংলাদেশ না হয়, নারকীয় এ হত্যাকাণ্ডের ৩য় বর্ষপূর্তিতে এটাই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে।

আগের সংবাদকাবুলে তালেবান হামলা, নিহত ৩৪
পরবর্তি সংবাদ৭ জুলাই অর্ধদিবস হরতালের ডাক দিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট