মুসান্না মেহবুব :
বাংলা অঞ্চলে মুসলিম সভ্যতা গড়ে উঠেছে হাজার বছর আগে। বরং তারও আগে। ১২০৪ বা ৬ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার বহু আগ থেকেই আরব বণিক ও সুফি-সাধকদের দাওয়াত ও প্রাণান্তকর চেষ্টায় বিস্তৃতভাবে মুসলিম সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল এ ভূখণ্ডে। স্থানীয় জনসাধারণ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। একই সঙ্গে ইসলামের প্রাণপুরুষ মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা, তাঁর জীবনাদর্শে উজ্জীবিত হওয়ার প্রচেষ্টা এবং তাঁর জীবনদর্শন চর্চা মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপৃতি লাভ করেছিল সমানভাবে।
কিন্তু ইসলামের দাওয়াত যেভাবে বিস্তার লাভ করেছিল, নানা প্রতিকূলতার কারণে সে অনুপাতে ইসলামি শিক্ষার ব্যাপৃতি সাধিত হয়নি এ অঞ্চলে। সময়ে সময়ে রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের নানামাত্রিক বিরূপ ভূমিকা এবং ইসলামের মূল ভূখণ্ড আরবের সঙ্গে এ অঞ্চলের দূরত্বের কারণে বিশুদ্ধ ইসলামি শিক্ষার বিস্তার-প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে নানাভাবে। ফলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি বাঙালি মুসলিম জনসাধারণের যে ভালোবাসা, তাঁর জীবনাদর্শ গ্রহণের যে উজ্জীবন ও চর্চা—এসব কিছুতে কালের পরিক্রমায় নানা কুসংস্কার ঢুকেছে। আমদানি হয়েছে নানাপ্রকার বিদআত ও অপ্রামাণ্য রীতি-নীতি।
বাংলায় হাজার বছরের মুসলিম সংস্কৃতির চিরায়ত একটি উপলক্ষ আরবি হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাস। নবিজির প্রতি অগাধ ভালোবাসা, সিরাতে নববির চর্চা ইত্যাদির প্রভাব থেকেই রবিউল আউয়াল মাসকে এ অঞ্চলের সাধারণ মুসলিম শ্রেণি গুরুত্ব দিয়ে আসছেন আবহমান কাল থেকেই৷ ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসে নবিজির জন্ম, ধর্মপ্রাণ মুসলমান বলতেই এই ব্যাপারটি সবার জানা, কিন্তু ৬৩ বছর পরে একই মাসে যে নবিজির ইন্তেকালও হয়েছিল, কুসংস্কারের প্রভাবে অনেকের খেয়ালই থাকত না এ বিষয়ে।
ফলে রবিউল আউয়াল মাসকে নবিজির জন্মমাস হিসেবেই কেবল জ্ঞান করা হতো ঢালাওভাবে। এ মাসে ‘মিলাদুন্নবি’কে কেন্দ্র করে কালের পরিক্রমায় গড়ে ওঠে নানামুখী রেওয়াজ-রুসম এবং অনুষ্ঠানাদির প্রচলন। একরকম আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হতো গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে।
নবিজির জীবনী-ভিত্তিক পুঁথিকাব্যের আসর বসত বিভিন্ন বাড়িতে। হতো বাহারি পদের খাবার-দাবারের আয়োজন। গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষ ভেদাভেদ ভুলে একত্রিত হতো এসব আয়োজন-অনুষ্ঠানে। মসজিদের ইমামের মাধ্যমে দোয়া-দুরুদ, নবিজির জীবনীর ওপর ইমাম সাহেবের অল্প-আধটু আলোচনা, নবিজি কীভাবে জন্মগ্রহণ করলেন, হজরত আমিনা ও ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা বিষয়ক নানা কাহিনি, ওহুদ বদর খন্দক ইত্যাদি যুদ্ধের গল্পঘটনা বর্ণনা—আয়োজন-অনুষ্ঠানে সাধারণত এসব কর্মসূচিই পালিত হতো ঢালাওভাবে। রাতে বসত পুঁথিপাঠের আসর। চাঁদের আলো কিংবা কুপি বাতির লালচে আলোয় নবিজির জীবনীভিত্তিক পুঁথির খাতা মেলে একজন আবৃত্তি করতেন সুর করে, সামনে উপবিষ্ট জনতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যেতেন নবিজীবনের সেসব কাহিনিকাব্য।
এসব গল্পঘটনা আর কাহিনিকাব্যে কুসংস্কারের প্রভাব ছিল, ছিল তথ্যউপাত্ত-কেন্দ্রিক দুর্বলতাও, কিন্তু সিরাত চর্চা ও পাঠের যে আকুলতা থাকত গ্রাম-বাংলার অতি সাধারণ এসব মুসলমানের হৃদয়ে, তা ছিল অকৃত্রিম।
রবিউল আউয়ালের এই আমেজকে কেন্দ্র করে নিকট ও দূর অতীতের মুসলিম কবি-সাহিত্যিকের কলমে রচিত হয়েছে অসংখ্য নাতে রাসুল। কাজী নজরুল ইসলামের ‘ত্রিভূবনের প্রিয় মুহাম্মদ’, ‘মা আমেনার কোলে এলো পূর্ণিমার চাঁদ’ ইত্যাদি সংগীত মুসলিম বাংলার রবিউল আউয়াল কেন্দ্রিক চিরায়ত সেই আমেজেরই জ্বলন্ত প্রমাণ।
বর্তমান সময়ে যুগের পরিবর্তন ও বিশুদ্ধ ইসলামি জ্ঞানের চর্চা এ অঞ্চলে ব্যাপৃত হবার ফলে ওলামায়ে কেরাম রবিউল আউয়ালে অনুষ্ঠিত জশনে জুলুশ, ঈদে মিলাদুন্নবি ইত্যকার বিদআত ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করে আসছেন নানাভাবে। ফলে মুসলিম জনসাধারণের অনেকেই সতর্ক হয়েছেন, হচ্ছেন। কিন্তু এই সতর্কতার ফলে রবিউল আউয়ালে সিরাতচর্চার যে আমেজ ছিল এককালে, তা এখন প্রায় বিলীন হয়ে গেছে বললেই চলে। অবশ্যি, গ্রামীণ জীবনের পরিবর্তনও এজন্য সমানভাবে দায়ী।
রবিউল আউয়ালে এখন সিরাতবিষয়ক বিভিন্ন ধরনের সেমিনার ও মাহফিল ওলামায়ে কেরামের অংশগ্রহণে হয় ঠিক, সিরাত বিষয়ক লেখালেখি ও প্রতিযোগিতাও হয়, কিন্তু গ্রাম-বাংলার আবহমানকালের সংস্কৃতিতে রবিউল আউয়ালের যে আমেজ ও জৌলুশ ছিল, তা এখন অনেকখানিই ম্লান হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে গেছে নবিজির সিরাতচর্চায় বাঙালি মুসলিম জনসাধারণের ব্যাপক অংশগ্রহণের চিরায়ত চিত্রটাও।
তবে রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে ঈদে মিলাদুন্নবী, জশনে জুলুশ ইত্যাদি কার্যক্রম সমাজে অনেক ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছিল বিধায় এর মূলোৎপাটন জরুরি ছিল, দেওবন্দি ঘরানার উলামায়ে কেরাম দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টায় এখানে অনেকটাই সফল হয়েছেন। বলছেন অধুনা বিলুপ্ত মাসিক রহমতের সম্পাদক মাওলানা মনযূর আহমদ। তিনি বলেন, রবিউল আউয়ালে গ্রাম-বাংলার সংস্কৃতিতে সিরাতকে ঘিরে আলাদা একটা আমেজ ছিল, এটা তাদের হৃদয়বৃত্তির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু শরিয়াহ-বিবর্জিত বিদআতগুলোর বিরুদ্ধে ওলামায়ে কেরামের সতর্কতার ফলে এই আমেজে এখন ভাটা পড়েছে, মানুষজন সচেতন হবার পাশাপাশি ছোট ছোট এসব বিষয়াবলিও বর্জন করেছে। এটা অটোমেটিকলি হয়েছে। এখানে সংস্কৃতিকে ধরে রাখা যতটা না জরুরি, তারচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদআতের মূলোৎপাটন। ওলামায়ে কেরাম এটাই করেছেন এবং করে যাচ্ছেন।
