হুমায়ূন আহমেদ : নবিজিকে স্বপ্নে দেখার স্বপ্ন

হামমাদ রাগিব

‘আপনি জীবনের শেষ পর্যন্ত লেখালেখি চালিয়ে যেতে চান?’

‘আমি পারবো কি-না জানি না–আমার গোপন ইচ্ছা এবং প্রগাঢ় ইচ্ছা হচ্ছে মৃত্যুর এক-দু ঘণ্টা আগেও আমি যেন বাংলা গদ্য লিখতে পারি, যেন আমি হা-হুতাশ করে না মরি। আল্লাহকে স্মরণ করে মরতে পারি। সে-সময়ে লেখার জন্য আমি একটা গদ্য স্থির করেছি। গদ্যটি লেখার জন্য আমি অনেক সাধনা ও স্টাডি করছি।’

মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে বিবিসি বাংলা দীর্ঘ একটা ইন্টারভ্যু নিয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের। বাতচিতের এক পর্যায়ে হুমায়ূন তাঁর রহস্যঘেরা অন্তিম ইচ্ছেটির কথা এভাবেই ব্যক্ত করেছিলেন।

সেই গদ্যটি, হুমায়ূন যেটা মৃত্যুর এক-দু ঘণ্টা আগে লিখবেন বলে স্থির করেছিলেন, যেটার জন্য তিনি অনেক সাধনা ও স্টাডি করেছেন–কী সেটা? কেনই-বা তা লেখার জন্য মৃত্যুর আগটাকে তিনি বেছে নিলেন? গদ্যটা কি আদৌ তিনি লিখেছিলেন? কিংবা লিখে যেতে পেরেছিলেন?

কাহিনি একটু পেছন থেকে শুরু করা যাক।

বাংলাবাজারে বৃহৎ পরিসরে অন্যপ্রকাশের নতুন বিক্রয়কেন্দ্র উদ্বোধন হবে। উদ্বোধন করবেন হুমায়ূন আহমেদ। যথাসময়ে হুমায়ূন আহমেদ এলেন। উদ্বোধন করলেন নতুন বিক্রয়কেন্দ্রের।

উদ্বোধন-উত্তর মোনাজাতের জন্য একজন মাওলানাকে দাওয়াত করা হয়েছিলো। মাওলানা হৃদয় আকুল করা একটা মোনাজাত দিলেন। উপস্থিত সবার হৃদয়-মন ভিজে উঠলো মোনাজাতে। আপ্লুত হলেন হুমায়ূন আহমেদও। মাওলানার এমন চমৎকার মোনাজাত শুনে তিনি অভিভূত হলেন। তার মনে হলো এটা বইপত্র বিষয়ক খুব উচ্চাঙ্গের এবং উপযোগী একটা মোনাজাত।

অনুষ্ঠানশেষে মাওলানাকে কাছে ডাকলেন হুমায়ূন। নিজের ভালোলাগার কথা জানিয়ে শোকরগোজারি করলেন মাওলানার। আলাপ করলেন বেশ খানিকক্ষণ। মাওলানা জানালেন–‘আপনার সঙ্গে অন্তত লহমা খানেকের জন্য হলেও একান্ত একটু মোলাকাতের তামান্না আমার বহু দিনের। কুদরত আজ অকল্পনীয়ভাবে সেই মওকা দান করেছেন।’

মাওলানার অদ্ভুত এই আকাঙ্ক্ষার কথা শুনে বিস্মিত হলেন হুমায়ূন–‘আমার সাথে এমন জরুর সাক্ষাতের কারণটা কি জানতে পারি?’

‘তেমন কিছু না স্যার! জাস্ট একটা অনুরোধের জন্য। আপনার লেখা কত মানুষ আগ্রহ নিয়ে পড়ে। আপনি যদি আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে একটা বই লিখতেন, তবে সবাই দ্বিগুণ আগ্রহী হয়ে পড়তো। আমার বিশ্বাস আপনি নবিজিকে নিয়ে খুব সুন্দর করে লিখতে পারবেন।’

মাওলানার এই প্রস্তাবটা খুব ভালো লাগলো হুমায়ূন আহমেদের। তিনি খুশি হলেন। মাওলানার কাঁধে হাত রেখে বললেন–‘ভাই, আপনার কথাটা আমার খুব মনে লেগেছে। আমি নবি করিমের জীবনী লিখবো।’

সেদিন থেকে হুমায়ূন প্রিয়নবির সিরাত নিয়ে স্টাডি শুরু করলেন। নবিজির জীবনকাহিনি খুবই স্পর্শকাতর বিষয়, একটুও উনিশ-বিশ করা যাবে না–হুমায়ূন ভালো করেই জানতেন। তাই সিরাত নিয়ে গভীর পড়াশোনায় মনোনিবেশ করলেন তিনি। একদিন গেলেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের মদীনা পাবলিকেশন্সে। সিরাত বিষয়ক যতো বই আছে মদীনার, সংগ্রহ করলেন। মুহিউদ্দীন খানের কাছ থেকে এ-ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পরামর্শও নিলেন।

মাওলানা খানের পরামর্শ নিয়ে হুমায়ূন সিরাত রচনায় হাত দিলেন। তারপর? তারপরের গল্প হুমায়ূনের জবানিতেই শোনা যাক খানিকটা–

‘আমি অন্যপ্রকাশ-এর মাসুমকে বললাম, তুমি একটা সুন্দর কাভার তৈরি করে দাও তো! কাভারটা চোখের সামনে থাকুক। তাহলে আমার শুরু করার আগ্রহটা বাড়বে। মাসুম খুব চমৎকার একটা কাভার তৈরি করে দিলো। বইটার নামও দিলাম নবিজি। অল্প কয়েক লাইন লেখার পরেই একটা ছেলেমানুষি ঢুকে গেলো মাথার মধ্যে। ছেলেমানুষিটা হলো, আমি শুনেছি বহু লোক নাকি আমাদের নবিজিকে স্বপ্নে দেখেছেন। কিন্তু আমি তো কখনো তাকে স্বপ্নে দেখিনি। আমি ঠিক করলাম, যেদিন নবিজিকে স্বপ্নে দেখবো তার পরদিন থেকে লেখাটা শুরু করবো।

‘স্বপ্নে এখন পর্যন্ত তাকে দেখিনি। যেহেতু এক ধরণের ছেলেমানুষি প্রতিজ্ঞার ভেতর আছি, সে কারণে লেখাটা শুরু করতে পারিনি। ব্যাপারটা হাস্যকর। তবু আমি স্বপ্নের অপেক্ষায় আছি।’

হুমায়ূন আবার গেলেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের কাছে–‘নবি করিমকে স্বপ্নে দেখতে চাই। কিভাবে দেখা যাবে নবি করিমকে?’

মাওলানা খান নিজের রচিত সাড়া জাগানো বই ‘স্বপ্নযোগে রাসুল সা.’ হুমায়ূন আহমেদের হাতে ধরিয়ে দিলেন। সাথে দিলেন নবিজিকে স্বপ্নে দেখার মৌখিক কিছু টিপস।

খানের দেয়া বই আর টিপস নিয়ে বাসায় ফিরে এলেন হুমায়ূন। মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগলেন বইটি। একবার শেষ করে আরেকবার। তারপর আরেকবার। কয়েকবার পড়লেন হুমায়ূন বইটি। পড়তে পড়তে কলমজাদুকর আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। নবি করিমকে স্বপ্নে দেখার তিয়াস তার আরোও বাড়তে থাকে।

এরই মধ্যে হুমায়ূনের ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য তাকে আমেরিকা যেতে হবে। আমেরিকা যাবার আগের রাতে ব্যাগ-ব্যাগেজ গোছাবার সময় হুমায়ূন স্ত্রী শাওনকে বললেন–‘আমার জায়নামাজ তসবিহ আর মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের স্বপ্নযোগে রাসুল সা. বইটি ব্যাগে ঢুকিও।’

এই একটি মাত্র বইই সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন হুমায়ূন। নিউইয়র্কে অন্তিম দিনগুলোতে এই বইটিই তার নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল।

চিকিৎসার এই সময়টাতে একদিন তিনি শাওনকে বললেন–আমি একটি জিনিশের অপেক্ষায় আছি। সেই ইচ্ছেটা পূরণ হলে লিখতে বসবো। তুমি আমার জন্য কাগজ-কলম রেডি রেখো। জীবনের শেষ লেখাটা শুরু করতে হবে হয়তো।

তারপর একরাতে হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠে অজু করেন হুমায়ূন। জায়নামাজ বিছিয়ে দু’রাকাত নামাজ পড়েন। অতঃপর কী মনে করে গোসল করেন। গোসল সেরে খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসেন।

হুমায়ূন নবিজি লেখা শুরু করেছেন।

ছেলেমানুষি পণটা কি তবে ভঙ্গ করলেন হুমায়ূন?

আপনার মতো আমারও একই প্রশ্ন; আমি জানি না, বরং কেউই জানেন না এই প্রশ্নের উত্তর। তবে কাহিনিটাকে যোগ-বিয়োগ করলে একটা ফলাফল বেরিয়ে আসে।

ফলাফলটা কি আপনি বের করতে পারলেন প্রিয় পাঠক?

পুনশ্চ : এর কিছু দিন পর, ২০১২ সালের ১৯ জুলাই, নবি করিমের জীবনকাহিনি ‘নবিজি’ লেখা অসম্পূর্ণ রেখেই মারা যান হুমায়ূন আহমেদ। আজ সেই ১৯ জুলাই। হুমায়ূন আহমেদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। আল্লাহ পাক তাঁর সঙ্গে মাগফেরাতের মুয়ামালা করুন।

তথ্যসূত্র : শিলালিপি, ২১ অক্টোবর ২০১১। লীলাবতীর মৃত্যু, হুমায়ূন আহমেদের অপ্রকাশিত রচনা-সংকলন

আগের সংবাদধর্মীয় সম্প্রীতি নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশের সংবিধান : পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন
পরবর্তি সংবাদধর্ষণ মামলার বিচারে ৭ দফা নির্দেশনা দিলো হাইকোর্ট