
শরীফ মুহাম্মদ
নব্বই দশকের শুরুর দিকের সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি কেমন ছিল, এমন প্রশ্নে আমি নব্বইয়ের শুরু এবং আশির দশকের শেষ এই দুই সময় মিলিয়ে একটি যুগ হিসেব করব। এভাবে করাটা সহজ। তখন ছিল আমাদের কৈশোরের শেষ এবং যৌবনের শুরুর দিক। ওই সময়ে সাহিত্যের যেই সুবাতাস এবং আবহ বইছিল, আজ ফিরে দেখলে ওটাকে বড় মায়াময় একটা সময় বলে মনে হয়। এটা আমার জন্যে যেমন সত্য, আমার মনে হয়, বাংলাদেশে ইসলামকেন্দ্রিক যেই সাহিত্যের ইতিহাস, তার সঙ্গেও তেমন সত্য। ওই সময়টা ছিল একটা শিশুর প্রথম চোখ মেলার মতো। একটু একটু করে শিশুর বোধবুদ্ধি খোলার মতো। অন্তত আমাদের এই অঙ্গনটিতে আমি এমনই দেখেছি। তখন আমরা প্রচুর বইপত্র পড়তাম। এগুলো পেতে বেশ কষ্ট হত আমাদের। আমাদের পরিবেশে সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক আছে এমন লোকের সংখ্যা খুব কম ছিল। তবু একটা প্রাণপ্রাচুর্য ছিল তখন। আমরা অনেক আগ্রহ নিয়েই বইপত্র কিনে ও নানাভাবে সংগ্রহ করে পড়তাম। সাহিত্যের দুটি দিক—তথা আলেমদের সংস্পর্শমুক্ত সাধারণ সাহিত্য আর ওলামায়ে কেরামের সাহিত্য এই দুটিরই তখন আলাদা আলাদা বিশেষত্ব ছিল। সাহিত্যের সাধারণ ধারাটির কথাই যদি বলি, তখন এর একটা বড় দিক ছিল পত্র-পত্রিকার সাহিত্যের পাতা। এই জিনিসটি তখনকার পাঠকদের বেশ প্রভাবিত করেছিল। এছাড়াও মাঝেমাঝে যেসব সাময়িকী বের হত, সেগুলোও মানুষকে খুব স্পর্শ করত।
তখন ফেব্রুয়ারির বইমেলাও এখনকার মত ছিল না। খুব ছোট, একদম ভিড়মুক্ত ছিল। আমি তখন মাদরাসার উপরের দিকের জামাতে পড়ি। বয়স সতেরো-আঠারো হবে। অবশ্য মেলায় যাই আরো আগে থেকেই। পনেরো-ষোলো থেকে শুরু করে আমার বয়স বিশ-বাইশ হওয়া পর্যন্ত বাংলা একাডেমির চত্বরে এমন ছোট-খাটো মেলা দেখেই অভ্যস্ত ছিলাম আমি।
তখন আমরা অপেক্ষা করতাম ঈদ-সংখ্যার জন্য। খুব কম পত্রিকাই তখন ঈদ-সংখ্যা করে। ‘বিচিত্রা’-র ঈদ-সংখ্যার কথা মনে পড়ে। ওই সময়ের বাংলা সাহিত্যের সেরা লেখকরা বিচিত্রার ঈদ-সংখ্যায় লিখতেন। কিছু দিন পর ইনকিলাব হাউজ থেকে বের হতে শুরু করল পূর্ণিমা। ওরাও বেশ মানসম্মত ঈদ-সংখ্যা করত। তৎকালীন লেখকদের ভেতর যারা একটু ডানঘেঁষা, বা ইসলামি ভাবধারার, অথবা যাদেরকে একটু কম সেক্যুলার মনে করা হত, তারা পূর্ণিমায় লিখতেন। তারাও তখনকার বড় লেখকই ছিলেন। দেখতে দেখতে নব্বইয়ের মাঝামাঝি দিকে এসে অনেক ম্যাগাজিনই ঈদ-সংখ্যা করা শুরু করল। দৈনিক পত্রিকাগুলোর ঈদ-সংখ্যার ঐতিহ্য শুরু হয় আরও পরে। একটা দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে অতিরিক্ত আট দশ পৃষ্ঠার ঈদ আয়োজন থাকত; তবে পৃথক ম্যাগাজিন আকারে ঈদ-সংখ্যা প্রকাশ করার ইতিহাস খুব বেশি পুরানো না।
দুই
তখন আমরা এই ঈদ-সংখ্যা আর ফেব্রুয়ারির মেলার জন্য অপেক্ষা করতাম। আরও একটি অপেক্ষা আমাদের ছিল তখন—হাত চালাচালি করে বই পড়ার একটা অভ্যাস ছিল। সেবা প্রকাশনীর প্রচুর বই পড়েছি হাত চেলে। বিভিন্ন ফুটপাথে কলকাতার লেখকদের বই কিনতাম আমরা। তারপর ওই একটি বইই চক্রকারে আমাদের হাতে হাতে ঘুরত। দেখা গেল, আমি গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ এগিয়ে সেখানকার বইপড়ুয়া বন্ধুদের কাছ থেকে একটি বই এনেছি, তারপর ঢাকায় এসে সেটা আমার ছাত্রবন্ধুদের হাতে হাতে ঘুরত। এই প্রক্রিয়ায় আমরা তখন পড়ে ফেলেছিলাম শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এমনকি নীহাররঞ্জন গুপ্তেরও অনেক বই। তখনকার রেওয়াজটাই এমন ছিল, কেউ কোনো বই পড়লে অন্যের সঙ্গে তা গল্প করত এবং আগ্রহ করেই তা অন্যকে পড়তে দিত।
তখন কামরাঙ্গীচর মাদরাসায় পড়তাম। লালবাগে একটা প্রাচীন পাঠাগার ছিল। এক সপ্তাহের জন্য বই নেওয়া যেত সেখান থেকে। বই নেওয়ার ব্যাপারে আমি উদ্যোগী কম ছিলাম। তবে যারা নিতেন, তাদের থেকে নিয়ে পড়তাম। দেখা যেত এক সপ্তাহ মেয়াদের দু দিনের মাথাতেই বইটি শেষ হয়ে গেল। তখন অবশিষ্ট দিনগুলিতে অন্যদের হাতে হাতে বইটি ঘুরত।
আমাদের ময়মনসিংহের কাঠগোলা বাজারসংলগ্ন গলগণ্ড এলাকায় অনেক সিনিয়র ভাইয়েরা এমন ছিলেন, তাদের কাছে সেবা প্রকাশনীর অনেক বই থাকত। তখন ছিল আট আনা পয়সার যুগ। এক টাকা দিয়ে বই এনে আট আনা পয়সায় আবার ফেরত দিয়ে দিতাম। তখন বইপত্রের এত প্রাচুর্য ছিল না। তবে যতটুকু বই যারাই পড়ত, খুব মায়া এবং ভালবাসা নিয়েই পড়ত। তাছাড়া তখন সময় কাটানো বা অবসর-বিনোদন এসবেরও উপলক্ষ খুব কম ছিল। বই পড়েই সময় কাটত বেশি। আর মফস্বল শহরগুলোতে দৈনিক পত্রিকা পৌঁছুতে পৌঁছুতে দুপুর গড়িয়ে বিকেলও হয়ে যেত। আমাদের কামরাঙ্গীচর মাদরাসায় যেতে যেতেই এগারোটা বাজত। আমরা লুকিয়ে চুরিয়ে আসরের নামাজের পরে পত্রিকাটি পড়ার চেষ্টা করতাম। আর উপরের দিকের ক্লাসে উঠে যাবার পর ক্লাসে একটা পত্রিকা রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। সেটাও হত বিকালের দিকে। সবক শেষ হয়ে গেলে। এসব করেই তখন সময় কাটত আমাদের। আর আমাদের জামিয়া নূরিয়া কামরাঙ্গীচরের একটা বিশেষত্ব ছিল, আমাদের শিক্ষকদের ভেতর অনেকেই লেখালেখি করতেন। এই সুবাদেও সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল কিছুটা। তখন বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করার খুব একটা ভাল ব্যবস্থা ছিল না আমাদের, বরং দুষ্করই ছিল, তবু আমরা নিজেদের মতী করে ছোট ছোট দেয়ালপত্রিকা বের করতাম। এখন দেশের প্রথম শ্রেণির মাসিক পত্রিকাগুলি যেমন মর্যাদাপূর্ণ, তখন আমাদের কাছে দেয়ালপত্রিকা এমন মর্যাদাপূর্ণ ছিল। এখন ঢাকার একটা শ্রেষ্ঠ পত্রিকায় লেখা প্রকাশ হলে আমার যেমন অনুভূতি হয়, তখন দেয়ালপত্রিকায় লেখা প্রকাশ হলে আমার তেমন অনুভূতি হত।
( চলবে)
লেখক : আলেম, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক, সম্পাদক-ইসলাম টাইমস টুয়েন্টি ফোর ডট কম
