
ওমর ফারুক :
কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স সমমান) পরীক্ষার জন্য পরীক্ষার্থীর সর্বনিম্ন বয়স ২১ বছর হতে হবে। গত ১৫ অক্টোবর কওমি মাদরাসার সম্মিলিত শিক্ষাবোর্ড হাইয়াতুল উলইয়ার নিজস্ব ওয়েবসাইটে ২০১৯ সালের দাওরায়ে হাদীসের ‘পরীক্ষার্থী নিবন্ধন ফরম পূরণের নিয়মাবলী’ সংক্রান্ত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
নতুন এ বিজ্ঞপ্তির ফলে দেশব্যাপী কওমী মাদরাসা ও কওমী শিক্ষার্থীদের মাঝে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা উঠেছে। বিশেষ করে ২০১৯ সালে দাওরায়ে হাদীস পরীক্ষার্থীদের মাঝে যারা জন্মসনদ অনুযায়ী বয়সের দিক দিয়ে ১৮-২০ তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। বিষয়টি সমাধানের পথ খুঁজছেন তাদের অভিভাবকরাও। অনেকেই এর মধ্যে নতুন করে বয়স বাড়িয়ে জন্ম সনদ সংগ্রহের পথ খুঁজছেন বলেও সোশ্যাল মিডিয়া সূত্রে জানা গেছে।
দাওরায়ে হাদীসে পরীক্ষার জন্য হঠাৎ করে ২১ বছর কেন বয়স সীমা নির্ধারণ করা হলো, এ বিষয়ে হাইয়াতুল উলইয়ার দফতর সম্পাদক ও পরীক্ষা কমিটির অন্যতম সদস্য মাওলানা অসিউর রহমান জানিয়েছেন, সরকারি আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই বয়সের এই বাধ্যবাধকতা। অনেক সময় ছেলেরা না বুঝে বয়স দিয়ে রাখে ১৬-১৮ বছর। অথচ এ বয়সে মাস্টার্স পরীক্ষা দেয়া অসম্ভব।
তবে নোটিশ ঘোষণার পরবর্তী একটি বৈঠকে ২১ বছর বয়সসীমা আপাতত কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলেও জানিয়েছেন অসিউর রহমান। তিনি জানান, এ বিষয়ে তদারকির জন্য আপাতত দুই জনকে দায়িত্ব দেয়া দেয়া হয়েছে। তারা প্রতিবেদন জমা দিলেই বয়সসীমা নির্ধারণের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
এদিকে বিষয়টি কার্যকর করতে কোনো ধরণের সমস্যা নেই বলে মন্তব্য করেছেন দেশের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা মঈনুদ্দীন রুহী। তিনি বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতসহ উপমহাদেশের অনেক দেশেই মাস্টার্স সার্টিফিকেট অর্জন করতে বয়স সর্বনিম্ন ২১ হওয়া শর্ত। বয়সের পরিপক্কতার একটা ব্যাপারও রয়েছে। কুরআন হাদীসের জ্ঞান অর্জন ও কওমি মাদরাসাগুলোর ক্ষেত্রেও বিষয়টি ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। মানতেক, বালাগাত ও ফালসাফার মতো বিষয়গুলো বোঝার জন্য বয়স গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের ছেলেরা যে বয়সে এসব পড়ে থাকে তা তাদের জন্য উপযোগীও নয়। তাই দাওরায়ে হাদীসের সার্টিফিকেট অর্জনের জন্যও বয়সটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
কিন্তু কওমি মাদরাসার যে সিলেবাস রয়েছে তা তো অধিকাংশ কওমি শিক্ষার্থীদের বয়স ১৮-২০ হওয়ার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। তাহলে কী করে বিষয়টি বাস্তবায়ন সম্ভব? এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক, এটা এখনই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এটার জন্য দীর্ঘ প্রসেস ও সময়েরও ব্যাপার রয়েছে। সুচিন্তিতভাবে কওমি সিলেবাসকেও নতুন করে সাজাতে হবে। সারাদেশে কেন্দ্রীয়ভাবে এক ধরণের সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে। পুরো সিলেবাসের মেয়াদও বাড়াতে হবে। যুগোপযোগী ও আধুনিক কিছু বিষয় সংযোজন করে কোন কোন জামায়াতকে দুই বছর মেয়াদী করতে হবে। আমরা এখনও ইবনে সিনা যুগের দর্শন ও ফালসাফা পড়ে থাকি। এগুলোরও সংস্কার প্রয়োজন।’
অনেকটা একই ধরণের মতামত দিয়েছেন রাজধানী মুগদার জামিয়াতুস সালাম মাদরাসার সাবেক শিক্ষা সচিব মাওলানা আরাফাত হুসাইন। তিনি বলেন, ‘প্রচলিত কওমি শিক্ষা সিলেবাসের প্রেক্ষিতে বিষয়টি আমার কাছে যৌক্তিক বলে মনে হচ্ছে না। যেখানে একজন কওমি শিক্ষার্থীর ১৭-১৮ বছর হওয়ার মধ্যেই দাওরায়ে হাদীস শেষ হয়ে যায়, সেখানে তাদের জন্য সর্বনিন্ম ২১ বছরের প্রশ্ন কী করে আসে? এ ছাড়া বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বর্তমান সময়ে তাখাসসুস ছাড়া শিক্ষার্থীদের খেদমতে নিয়োগের বিষয়টিও কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে তাদের বয়স সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হলে তো পরবর্তীতে তাখাসসুস শেষ করতেই ২৩-২৪ বছর লেগে যাবে। যা পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটের বিবেচনায় কঠিন।’
এদিকে চলতি বছর যারা দাওরা পড়ছেন তাদের অধিকাংশের বয়সই ২০ পার হয়নি। সুতরাং এ অবস্থায় সিদ্ধান্তটি বহাল থাকলে তারা বিপদে পড়বেন। এ কারণে তাকমিল শিক্ষার্থীদের দাবি এখনই যেন বয়সের সীমা নির্ধারণ করা না হয়।
এ ব্যাপারে জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের শিক্ষার্থী মুনশি আরমান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি নিজেও চিন্তায় রয়েছি। আমার বয়সও এখনো ২০ পূর্ণ হয়নি। আমাদের বিষয়ে কী করা হবে আমরা বুঝতে পারছি না। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে পুনরায় বিবেচনা করা উচিত।’
এদিকে অনেকেই এ সমস্যা থেকে উত্তরনের জন্য দাওরায়ে হাদিসকে দুই বছর করার কথা দাবি জানিয়ে বলেন, দুই বছর দাওরায়ে হাদিস পড়ালে আরো যোগ্যতা সম্পন্ন হয়ে ওঠবে কওমির ছাত্র- ছাত্রীরা। ইলমের মধ্যে গভীরতা আসবে। শিক্ষার্থীরা সঠিক বয়সে পরীক্ষাও দিতে পারবে।
বিষয়টি নিয়ে আল হাইয়াতুল উলইয়ার সদস্য ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার মহাসচিব মাওলানা আব্দুল কুদ্দুসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘একজন কওমি শিক্ষার্থীর দাওরায়ে হাদীস শেষ করতে হলে অন্তত ২১ বছর বয়স হওয়াটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই হবে। একজন শিক্ষার্থী যদি পাঁচ বছরেও মাদরাসায় ভর্তি হয় তাহলে তার দাওরায়ে হাদীস শেষ করতে ষোল বছর লাগবে। সে হিসেবে একুশ বছর করা হয়েছে।’
কিন্তু আমাদের দরসে নেজামিতে তো বার বছরেই দাওরায়ে হাদীস শেষ হয়ে যায়, সেখানে ষোল বছরের বিষয়টি কীভাবে আসলো? এ বিষয়ে তিনি বলেন, এখন থেকে ষোল বছর লাগবে দাওরায়ে হাদীস শেষ করতে। নতুন সিলেবাস করা হচ্ছে। আগামী বছর থেকেই বিষয়টি কার্যকর হবে। তবে বর্তমানে যেসকল দাওরায়ে হাদীস শিক্ষার্থীর বয়স একুশের নিচে তাদের ব্যাপারে পরবর্তী বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এদিকে বিষয়টি চলতি বছরেই কার্যকর হচ্ছে না, এমনটাই প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশ থেকে মনোনীত আল হাইয়াতুল উলইয়ার সদস্য মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘নতুন যে নীতিমালা ও সিলেবাস প্রণয়ন করা হচ্ছে এতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই একজন শিক্ষার্থীর দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত আসতে একুশ বছর লেগে যাবে। এর নিচে হলে বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। আমাদের দেশে যে শর্ট কোর্স চালু রয়েছে সেটির ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে এটি এভাবে চলতে পারে না।’
তবে মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, বয়সসীমা একুশের বিষয়টি হঠাৎ করেই বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। এটি ধীরে ধীরে ক্ষেত্র তৈরি করে ও সকল মাদরাসায় নোটিশ পাঠিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।
উল্লেখ্য, আগামী ৮ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে তাকমিল জামাতের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা। জাতীয় সংসদে কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি আইন পাশ হওয়ার পর হাইয়াতুল উলইয়ার অধীনে এটিই দাওরায়ে হাদীসের প্রথম কেন্দ্রীয় পরীক্ষা। যদিও এর আগে আল হাইয়াতুল উলইয়ার অধীনে আরও দুটি দাওরায়ে হাদীসের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেও দুটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সকল শিক্ষার্থীও নতুন সনদ পাবে বলে আল হাইয়াতুল উলইয়ার নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন।
