
ইফতেখার জামিল
(প্রথম পর্বের পর)
মুসলিম জাতীয়তাবাদী ও ব্রিটিশ আমলাদের হাতে রাষ্ট্রীয় জুলুম ব্যাপক হয়ে যাওয়ায় বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের পক্ষ থেকেও বিরোধিতা তীব্র হয়। এবং জালেম-মজলুমের লড়াইয়ে বাংলাদেশের সর্বশ্রেণীর মানুষের সমর্থনে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধের পর বামদের সাথে বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের সংঘর্ষ হয় এবং নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রভাব স্তিমিত হয়। দেশবিভাগের পরবর্তী সময়ে আলেমরা যেমন ধর্মীয় শিক্ষার একাট্টা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি, তেমনি সেকুলাররাও একাট্টা ধর্মহীন ব্যবস্থা কায়েম করতে পারেনি। তাতে জনগণের মধ্যে নতুন ধরণের মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
নব্বই পরবর্তী সময়ে কওমি মাদরাসা শিক্ষা আরো এক্সপান্ড হয়। জুফার আহমদ উসমানী যেমন বিশেষ ধারা ও নেতৃত্ব তৈরি করতে চেয়েছেন, সেটা অনেকটাই বাস্তবায়িত হয়ে যায়। ফলে কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থীরা নানাদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তারা লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন, তাসাউফ, দাওয়াত ও তাবলিগে বিশেষ ভূমিকা পালন শুরু করেন। তবে বিশেষভাবে ভূমিকা রাখা শুরু করেন রাজনীতিতে। পরবর্তী পঁচিশ বছরে সবচে বড় অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলো তাদের নেৃত্বেই সংঘটিত হয়। তসলিমা নাসরিনকে দেশত্যাগে বাধ্য করা, ফতোয়া বিরোধী রায় বাতিল আন্দোলন, নারী ও শিক্ষানীতি স্থগিতে বাধ্য করা এবং সর্বশেষ পাঁচই মের ঢাকা অবরোধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে দেওবন্দি ধারা।
রাজনীতিতে আলোচিত ও সমালোচিত হবার পাশাপাশি নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে চলে আসে। স্বীকৃতির দাবী আগে থেকে শুরু হলেও ২০১৩-পরবর্তী সময়ে এই দাবী নতুন করে প্রাসঙ্গিকতা পায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আলেমদের সাথে রাষ্ট্রের দূরত্ব বাড়তে থাকে। মুক্তিযুদ্ধে আলেমদের নিরপেক্ষ ভূমিকায় এই দূরত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। পাশপাশি ১৯৮০-পরবর্তী সময়ে মাদরাসা ও মসজিদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও রাষ্ট্রের সাথে দূরত্ব থাকায় এগুলো অতটা চোখে পড়েনি। স্থানীয় মধ্যবিত্তের জোরালো সমর্থন থাকায় মাদরাসা ও মসজিদের ওপর হস্তক্ষেপের কোন সুযোগ তৈরি হয়নি।
তবে সেকুলারদের পক্ষ থেকে এই উত্থান দমন করার বিভিন্ন রকম চেষ্টা করা হয়েছে। আইন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে মাদরাসা ও মসজিদের অনেক অনুষ্ঠানে হস্তক্ষেপের চেষ্টা চালানো হয়েছে। ব্র্যাক-গ্রামীণসহ এনজিওদের নামানো হয়েছে। বিশেষত ৯৩’র তসলিমা বিরোধী আন্দোলন, ২০০১-এর ফতোয়া বিরোধী আন্দোলন, ১১’র নারীনীতি বিরোধী হরতাল ও ১৩’র উগ্র নাস্তিক্যবাদ বিরোধী আন্দোলন সুশীল সমাজ ও এনজিওদের মাধ্যমে দমনের চেষ্টা চালানো হয়েছে। তবে মধ্যবিত্তের নীরব সমর্থনে আলেম সমাজ প্রতিবার সফল হয়েছেন। এনজিও ও সুশীল সমাজের সক্রিয়তায় মধ্যবিত্তের ধর্মীয় আগ্রহ ও কল্পনায় বিশেষ পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি।
তবে মনে রাখতে হবে, এই মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশ আলেমদের পার্থিব ভূমিকায় সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট নয়। তাই যারা মাদরাসায় দান করেন, আলেমদের শ্রদ্ধা করেন ও মসজিদে ওয়াজ শুনতে যান, তাদের অনেকেই নিজের সন্তানকে মাদরাসায় দিতে চান না। তারা আলেমদের ‘ধর্মীয়’ বিষয়ে সমর্থন করেন, তবে পার্থিব বিষয়ে অনুসরণযোগ্য মনে করেন না। মুশকিল হচ্ছে, পার্থিব জীবন তো ধর্ম থেকে আলাদা নয়। আলাদা করে ফেললে যে কাঠামোর উত্থান ঘটে, সেখানে সেকুলারদের হস্তক্ষেপের সুযোগ অনেক।
২০১৩ সাল ছিল এই দ্বৈততার সংঘর্ষ। মধ্যবিত্তের ধর্মীয় কল্পনা-বাসনা বনাম পার্থিব খাহেশের বিরোধ। সুশীল ও এনজিওরা পরপর ব্যর্থ হওয়ায় সেকুলার প্রতিবাদকে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের মতো ‘গণআন্দোলন’-এ রুপান্তরিত করার চেষ্টা করা হয়। এবং আলেমদের পক্ষ থেকেও তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। যার সামনে শাহবাগের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সেকুলার কল্পনাও হুমকির সম্মুখীন হয়।
ফলে বাংলাদেশে এই প্রথম আলেমদের সাথে রাষ্ট্রের সাথে ব্যাপক সংঘর্ষ তৈরি হয়। যে সংঘর্ষের ফলশ্রুতিতে আলেমদের বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগ কমে যায়, পাশাপাশি রাষ্ট্রও ধর্ম প্রশ্নের বিস্তারিত মোকাবেলা করতে বাধ্য হয়।
