‘মুমিন বিল্লাহ’ হওয়ার তিন শর্ত

নাঈম বিন মাসউদ

ইসলামের পাঁচটি রুকনের প্রথম ও প্রধান রুকন হল, আল্লাহর প্রতি ইমান আনা; যাকে সংক্ষেপে বলা হয় ‘ইমান বিল্লাহ’। আল্লাহর প্রতি ইমান আনার পাশাপাশি আরো তিনটি বিষয়ের প্রতি অবশ্যই ইমান আনতে হবে। কেউ এ তিন বিষয়ের কোন একটি বাদ দিলে তিনি মুমিন হিসেবে গণ্য হবেন না। একটি আরেকটির সম্পূরক।

প্রথমত আল্লার অস্তিত্বের প্রতি ইমান আনা। দ্বিতীয়ত তার একত্ববাদের প্রতি ইমান আনা। তৃতীয়ত তার সমগ্র গুণাবলির ও আহকামের প্রতি ইমান আনা।

কথা হল, পৃথিবীর প্রায় সকল মানুষের আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি ইমান রয়েছে, যদিও ভিন্ন ভিন্ন নামে তাকে সম্বোধন করে থাকেন। ‘ইমান বিল্লাহ’র প্রথম শর্তে সবাইকে শামিল করা য়ায়। কেননা পৃথিবীর সকল ধর্মই আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপনে নির্দেশ দান করে। তবে অন্য দুটি শর্ত এ সকল ধর্মে বিদ্যমান নেই।

যাদের আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস নেই তাদের আমরা নাস্তিক হিসেবে জানি। সকল নাস্তিক একটা মৌলিক ধারণায় বিশ্বাস রাখে যে, আসমান, জমিন, গ্রহ-তারা সবকিছু এমনিতেই প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়েছে। এসবের কোন স্রষ্টা নেই। সুতরাং মানুষ বা পৃথিবীর স্রষ্টা বলে কিছু নেই। প্রকৃতির ধারাবাহিক নিয়মে পৃথিবী ও মানুষের অস্তিত্ব লাভ হয়।

কিন্তু দুঃখের কথা হল, তারা যদি আল্লার সৃষ্টি নিয়ে সামান্য চিন্তা করতেন, তাহলে আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি তাদের কোন সন্দেহের অবকাশও থাকত না। যারা নাস্তিকতার দিকে ধাবিত হন তারা আল্লাহর সত্তা নিয়ে গবেষণা করেন কিন্তু তার অপরুপ সৃষ্টি নিয়ে একটু চিন্তাও করেন না। ফলে এ গবেষণা তাদের বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।

কোরআন-হাদিসে অনেক স্থানে আল্লাহর সত্তা নিয়ে ভাবতে নিষেধ করা হয়েছে এবং আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করার প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছে। নিজ দেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ নিয়ে ভাবলেও আল্লাহর অসীম শক্তির মহত্ত্ব প্রকাশ পায়। যেমন কোরআনে এরশাদ হয়েছে, আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও রয়েছে (সৃষ্টির রহস্য); সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত- ২১। আরেক হাদিসে এরশাদ হয়েছে, তোমরা আল্লাহ সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা কর, তার সত্তা নিয়ে ভাববে না; সহিহ মুসলিম।

কিছু লোক হযরত ইমাম আবু হানিফা রহ.-কে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, কিছু লোক আমাকে সংবাদ দিয়েছে যে, একটা সমুদ্রে ব্যবসার মালামাল বোঝাই করা একটা নৌকা কোনো মাঝি ছাড়াই চলছে। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ চিরে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে। কারও পরিচালনা ছাড়াই তা গন্তব্যে এসে পৌঁছেছে।

এ কথা শুনে তারা ইমাম সাহেবকে বলল, কোনো বদ্ধ পাগল ছাড়া এ কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। তখন ইমাম আবু হানিফা রহ. বললেন, তাহলে এ বিশাল আসমান এবং জমিনের কোনো সৃষ্টিকর্তা থাকবে না তা কী করে সম্ভব?

কিছু নাস্তিক বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে ধর্ম ও আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে থাকেন। অথচ বিখ্যাত প্রায় সকল বিজ্ঞানীই ছিলেন আস্তিক। বিজ্ঞানী মারলিন বুকস লিখেন, আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য যদিও আমরা সাধারণ বৈজ্ঞানিক কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারি না। তবুও আমরা মানুষ ও প্রকৃতিতে তার অস্তিত্বের অগণিত প্রমাণ ছড়িয়ে আছে, তা নিয়ে গবেষণা করতে পারি।

ড. অস্কার লিউ ব্রউয়ার লেখেন, নাস্তিকতার অর্থ হচ্ছে দ্বন্দ্ব আর যুদ্ধ। বৈজ্ঞানিক হিসেবে আমি এর কোনোটি চাই না। থিওরি হিসেবে আমি নাস্তিকতাকে অযোক্তিক ও ভ্রান্ত মনে করি। বাস্তব দিক থেকে আমার মনে হয় এটা মারাত্মক ক্ষতিকর।

জীববিদ্যাবিদ ড. আলবার্ট  ম্যাকমরস বলেন, অনেকের কাছে বিজ্ঞান ও ধর্ম হচ্ছে দুটি বিরুদ্ধ শক্তি। কেউ যদি একটিকে আঁকড়ে ধরে, এদের মতে তাহলে অন্যটি বর্জন করতে হয়। আজ আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এ কথা বলছি যে, বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা করার পর আল্লাহর প্রতি আমার বিশ্বাস শিথিল না হয়ে আরো জোরদার হয়েছে এবং পূর্বাপেক্ষা আরো মজবুত হয়েছে। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সাথে আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা করা হয়। বিজ্ঞানীদের এমন হাজারো বাণী রয়েছে যা আল্লার অস্তিত্বের প্রতি সাক্ষ্য দেয়।

দ্বিতীয়ত আল্লাহর প্রতি ইমান আনার সাথে তার একত্ববাদের প্রতিও ইমান আনতে হবে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘বলুন, তিনি আল্লাহ এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জম্ম দেননি এবং তাকে কেউ জম্ম দেয়নি’; সুরা ইখলাস, আয়াত, ১-৪।

প্রথম আয়াতেই আল্লাহ তার একত্ববাদের ঘোষণা দিয়েছেন। অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলেও তার একত্ববাদের প্রতি ইমান নিয়ে আসেননি। ফলে তারা আল্লাহর নিকট মুমিন হিসেবে গণ্য হবেন না। খৃষ্টানদের বিশ্বাস হল, মারয়ম আ. আল্লাহর স্ত্রী ও ইসা আল্লাহর পুত্র। কারণ, মারয়ম আ. কোনো পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই সন্তান প্রসব করেছেন। সুতরাং আল্লাহর পক্ষ থেকেই এ সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছে।

অন্যদিকে ইহুদিদের বিশ্বাস হল, উযাইর আ. আল্লাহর পুত্র। কারণ তিনি সমগ্র তাওরাত কিতাব মুখস্থ করে নিয়েছেন। অথচ আল্লাহ তায়ালা তার নিজের পবিত্রতার ঘোষণা এভাবেই দিয়েছেন, ‘তারা অজ্ঞাতবশত আল্লাহর জন্য পুত্র ও কন্যা সাব্যস্ত করে নিয়েছে। তিনি পবিত্র ও সমুন্নত, তাদের বর্ণনা থেকে’; সূরা আনআম, আয়াত-১০০।

মক্কার মুশরিকরাও আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস রাখতেন কিন্তু তার একত্ববাদে বিশ্বাস করতেন না। ফলে তারা মুমিন হওয়ার গৌরব অর্জন করতে পারেননি। যেমন কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আর যদি আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, কে আসমান, জমিন সৃষ্টি করেছে তাহলে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ’; সূরা আনকাবুত, আয়াত-৬১।

একটু চিন্তা করার বিষয় হল, পৃথিবীতে যদি একাধিক প্রভু থাকতেন, তাহলে এ সুন্দর স্থির পৃথিবী কি তার অবস্থানে থাকতে পারত? তা কখনোই না। কারণ, প্রভুদের মাঝেই তখন বিভেদ সৃষ্টি হত। এক প্রভু তার ক্ষমতার বলে দিন আনতে চাইলে আরেক প্রভু রাত নিয়ে আসতেন। ফলে আসমান, জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি হত।

তৃতীয়ত আল্লাহর সমগ্র গুণাবলি ও তার দেয়া সকল আহকামের প্রতি ইমান আনতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম ও কোরআন-হাদিসে বর্ণিত সকল আহকামের প্রতি ইমান আনতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, বর্তমানে এমন লাখো মুসলমান রয়েছে যারা মুসলমান হয়েও আল্লাহর সাথে শিরিক করছেন। কেউ জেনে-শুনে, কেউ বা মনের অজান্তে মুশরিকের খাতায় নাম লেখাচ্ছেন।

আজ অনেককেই দেখা যাবে, যারা আল্লাহর আহকাম নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করছেন, কেউ বা বিবেকবর্জিত বলছে; যেমন কেউ পর্দার হুকুম নিয়ে মজা করছেন। তার এ মজার কারণে তিনি কুফুরের দিকে ধাবিত হচ্ছেন, এটা নিয়ে তার কোনো খেয়ালই নেই। তাকে এ বিষয়ে সতর্ক করার পরও তিনি আবার করলে তাকে কাফের হিসেবে বিবেচিত করা হবে।

বাংলাদেশের যে কোন মাজারে বা দরগায়ে গেলে যে স্বাভাবিক দৃশ্য দেখা যায যে, কেউ সেজদায় পড়ে আছেন। আবার অনেকে সরাসরি মাজারে শায়িত পির-বুজুর্গের কাছে দোয়া করছেন। ভণ্ড পিরের পাল্লায় পড়ে লাখো মুসলমান ইমানহারা হয়ে যাচ্ছে। যে মানুষগুলো ইমানের স্বাদ নিতে তাদের কাছে গিয়েছিল তারা মুশরিক হয়ে ফিরে আসছে। জাহান্নামের পথকে জান্নাতের পথ মনে করে তাদের অনুসরণ করছে।

সারা জীবনের আমলনামাকে মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। সুতরাং বাংলার হক্কানি ওলামায়ে কেরামকে আরো সচেতন হতে হবে। সাধারণ মানুষকে হেদায়েতের পথ দেখাতে হবে। হযরত শামসুল হক ফরিদপুরি রহ. আলেমদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর মুহাব্বত তোমাদের মাঝে সৃষ্টি কর। অন্যথায় লোকেরা বিদআতীদের শিকার হইবে। মানুষের মনের মধ্যে আল্লাহর মুহাব্বত আছে। তাহা না হইলে তাহারা তাহাদের জান-মাল বিদআতীদের কাছে গিয়া কেন খুয়ায়?’। যদি এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন না করা হয় তাহলে অচিরেই সকলের মাঝে বিদআতের সৃষ্টি হবে। আর এর দায় আলেমদেরই নিতে হবে।

 

আগের সংবাদতাবলীগ জামাত: সঙ্কটের অদ্যোপান্ত
পরবর্তি সংবাদআজন্ম সলজ্জ সাধ (১)