
মাজিদা রিফা
সূর্যের দেখা নেই বহু দিন। থৈ থৈ করছে মাঠ। বাড়ির কিনারায় উঁচু জমিটায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। হাতে একটা খলুই। উঁচু জমিন ঝাঁপিয়ে হেঁটে যেতে চায় স্রোত। ভাই আনন্দে হেমন্তী চাঁদের মতো হেসে উঠলো। পানিতে জাল ফেলে দিয়ে বললো—‘প্রচুর মাছ পাওয়া যাবে, তুই খলুই হাতে দাঁড়ায়া থাক। খবরদার পানিতে নামবি না! পানিতে জোঁক আছে, সাপ আছে, হাঙ্গর আছে, মানুষখেকো বাঘ আছে!’
‘মূর্খ!’—মনে মনে বললাম আমি।
সে দারুণ সব মাছ ধরলো। একটা হলুদ কালো ডোরাকাটা সুন্দরীও। যেন মেঘের ফাটলে সূর্য। ভাই বললো—‘রানি-মাছ!’
—‘রাজা কোথায় ওর?’
ভাই বললো—‘দাঁড়ায় থাক, দাঁড়ায় থাক, আমি ধইরা আনি।’
আমি দাঁড়ালাম। কতকাল যে দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সন্ধ্যা নেমে এলো, থৈ থৈ পানিতে ফুটলো ব্ল্যাক ডায়মন্ড। রাত চলে গেল, তারপর আবার দুপুর গড়িয়ে বিকেল। দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর। ভাইটা এখনো রাজা মাছ খোঁজে। খুঁজতে অনেক দূর চলে গেল সে। আমার মনে হলো রানি-মাছটা কাঁদছে। রিনরিনে কন্ঠে কাঁদছে। কাঁদছে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন শিমুল গাছটাও।
আমার বড্ড কষ্ট হতে লাগলো। বুকের ভেতর হাঁসফাঁস। আমি দ্বিধা দু হাতে ঠেলে সরিয়ে পানিতে নেমে পড়লাম। সাথে সাথে কোথা থেকে এসে একযোগে আক্রমণ করলো রক্তখেকো জলপিশাচ! যেন শত শত। হাজারে হাজার। খয়ের রঙের পিচ্ছিল শরীর এঁকেবেঁকে এগিয়ে আসছে দ্রুত। আমি মাছভর্তি খলুই ছুঁড়ে ফেলে চিৎকার করতে করতে লাফিয়ে উঠলাম উঁচু জমিনে।
ভাইটা দৌড়ে এলো। দৌড়ে এলো আরেক লোক। তার নাম মনির চাচা। গ্রামে মনির চাচার প্রতিপত্তি খুব। আমি ভাবছি ভাইয়ের কথা। নিষেধ অমান্য করে পানিতে নেমেছি। সব মাছ ফেলে দিয়েছি। নির্দিষ্ট বেড়াজাল অদৃশ্য করে অনুসরণ করেছি স্বরচিত খোয়াবনামা—সে কি বকা দেবে? দিলো না। মাটিতে বসে আমার পা দুটো ভালো করে দেখে সান্ত্বনা দিয়ে বললো—‘কোথায়! একটাও তো জোঁক নাই!’
মনির চাচা বললেন—‘তুমি বড় হুজুরের মেয়ে না?’
আমি বললাম—‘জি।’
‘হুজুরের মেয়ে, এইভাবে চিৎকার দিলা! বাড়ির বাইরে আসছো ক্যান?’
আমি বললাম—‘জি!’
তিনি ধমক দিলেন—‘যাও! বাড়ি যাও!’
তার কাছেই আমি প্রথম জানলাম, আমি মাওলানার মেয়ে। আমার ভাই মাওলানার ছেলে। তারপর ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে গেল। সবাই বলে কথাটা।ভাই ফুটবল খেলতে গেলে কেউ বলে—‘হুজুরের ছেলে, খেলতে আসছো!’ কেউ বলে—‘হ্যাঁ, মোল্লারা নিজেদের জন্য সব জায়েজ করে নেয়!’
আমরা অনেকগুলো ভাইবোন। তারা এ নিয়েও হাসাহাসি করে। আমি অনেকদিন একটা নোংরা শব্দের অর্থ বুঝিনি। হারুন চৌধুরীর দুইটা বউ, নয়টা সন্তান। কই, তাকে তো কেউ কিছু বলে না!
আব্বা একদিন আম্মার জন্য লাল টুকটুকে একটা শাড়ি কিনে আনলেন। আমাদের বাড়িতে মেহমান এসেছিল। কী সুন্দর দেখতে সবাই! আম্মাও শাড়িটা পরে খুব সাজগোজ করলেন। তালুকদার চাচার বউ বললেন—‘ভাবী মনে হয় ভুলে গেছেন, আপনি হুজুরের বউ।’
আম্মা ভীষণ বিব্রত হলেন। আমার সহজ সরল আম্মা; তিনি অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসলেন। আমি প্রথম জানলাম, হাসিও যে বুকে হুল ফোটায়।
***
আমার ছোট চাচা মুয়াজ্জিন। প্রতি ভোরে তিনি উঠে যান এক আশ্চর্য মিনারে। তার পায়ের নিচে স্থির থাকে ঘুমন্ত এ শহর। তার পবিত্র স্বর ছড়িয়ে পড়ে লোকেদের দেয়ালে, প্লাস্টারে, ছাদে। কিন্তু লোকেরা তাকে তেমন একটা আমলে নেয় না। তার জীবন ছেঁড়া এবড়োখেবড়ো বিগত মানুষের মতো অবস্থান করে জমিনে। এক মধ্যবয়সী তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে আরেক মধ্যবয়সীকে—‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। তার আবার কীসের মতামত!’ এক কালো লোক আরেক কালো লোকের বন্ধু, এক বাঙালি আরেক বাঙালির। শুধু মুয়াজ্জিনের কোনো বন্ধু নেই। মাওলানার জন্য আল্লাহ তায়ালা আলাদা কী আইন দিয়েছেন, কে জানে; সমাজ স্বরচিত আইন দিয়েছে—‘হুজুরদের সমাজবদ্ধ হওয়া অপরাধ।’
হুজুরদেরও পাপ হয়, হতে পারে আরও বেশি। হুজুর কোনো ফেরেশতা নয়, হুজুরকে কু-পথে নিতে শয়তান মরিয়া। তারপরও হুজুর মসজিদে যায়, নামাজ পড়ে, কুরআন শেখায়, দমকা অন্ধকারে জীবনের লণ্ঠন উলটে আলো খুঁজে ছড়িয়ে যায় এর আকাশে ওর আকাশে।
তারপরও লোকে গালি দেয়—‘শালার হুজুর।’
***
মনির চাচা আমার সামনে গালি দিয়েছিল একদিন। তারপর, বহু বছর পর বর্ণগন্ধের বন্যা দেখে দেখে যখন আমি বড় হয়েছি, তিনি ফোন দিলেন আব্বাকে।
আমি ফোন রিসিভ করলাম। পাঁজরার মধ্যে ধকধক করে উঠলো হৃৎপিণ্ড—কী করুণ!—মনির চাচার তরুণী মেয়েটা বন্ধুর বাইকে চড়ে ঘুরতে গিয়েছিল। ছেলেটা রেইস করতে গিয়েছে বলে আ্যক্সিডেন্ট! ছেলেটা বেঁচে আছে। মরে গেছে মেয়েটা!
মনির চাচা কাঁদছেন। জানাজা আছরের পর। আব্বাকে চাই।
আমি বললাম—‘চাচা, আব্বা তো ঘুমিয়ে আছেন। আমি তার ঘুম ভাঙাতে চাচ্ছি না। মেয়েকে কবরে দিয়ে দিন। জানাজা পড়াতে হবে না। আল্লাহ তায়ালার বিধান শুধু মাওলানা, মাওলানার মেয়ে, মাওলানার ছেলের জন্য। আপনাদের জন্য না।’
হঠাৎ চুপ হয়ে গেল ওপাশের মুখর মুদ্রা। নিজের বুক ক্ষত করে সে নিজেই ছুরি মেরেছে। আমার কিছু করার নেই। আমার কোনো দোষ নেই। আমি লাইন কেটে দিলাম।
আব্বা ঘুমিয়ে আছেন। তার শান্ত কান্তিময় মুখে অদৃশ্য পূর্ণিমা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি। অফ-করা ফোনটা অন করে আব্বাকে ডেকে তুললাম। তারপর নিজেও বোরখা পরতে গেলাম। আমি মাওলানার মেয়ে। তারাদের পথ, রোদ্দুরের পথ আমার। গোসল, কাফন, অতঃপর মৃতার শিয়রে বসে সুরা ইয়াসিন পড়ার দায়িত্ব আমার।
লেখক : আলেমা ও সিরাতরচয়িতা
