তাবলিগ-সঙ্কট, যেভাবে মোকাবেলা করতে চাইছেন আলেমরা

হামমাদ রাগিব 

চলমান তাবলিগ-সঙ্কট মোকাবেলায় দেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরাম ঐক্যবদ্ধভাবে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছেন। গত ১ ডিসেম্বর টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে সংঘটিত উলামা-তালাবা ও তাবলিগের সাধারণ সাথীদের ওপর সাদপন্থী তাবলিগিদের সন্ত্রাসী হামলায় তাঁরা ভীষণ ক্ষুব্ধ এবং মর্মাহত। যেকোনো মূল্যে তাঁরা তাবলিগ জামাত থেকে মাওলানা সাদ ও তাঁর অনুসারীদের ফেতনাকে দমন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

গতকাল (৬ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার) রাজধানীর কাজলা ভাঙ্গাপ্রেসে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাক-কার্যালয়ে শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম ও তাবলিগের শুরা সদস্যদের সমন্বয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বেফাকের সিনিয়র সহসভাপতি আল্লামা আশরাফ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠক থেকে সরকারের কাছে তিন দফা দাবি পেশ করা হয়।

আলেমদের পেশকৃত দাবিগুলো হলো—

১. টঙ্গী ময়দানকে মসজিদ মাদরাসা শবগুজারির জন্য অবমুক্ত করে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে।
২. সাদপন্থী তাবলিগিদের নেতা সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম, মাওলানা মোশারফ হোসাইন খান, শাহাবুদ্দিন নাসিম ও ইনুস শিকদারকে স্থায়ীভাবে কাকরাইল থেকে বহিস্কার করতে হবে।
৩. টঙ্গী ময়দানে হামলার মূল নায়ক উল্লিখিত চারজনসহ সাদপন্থী তাবলিগিদের অন্যান্য নেতা মাওলানা আশরাফ আলী, মাওলানা আব্দুল্লাহ মানসুর ও মাওলানা মনির বিন ইউসুফ গংকে অনতিবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে।

বৈঠক থেকে জানানো হয় সরকার অনতিবিলম্বে এই তিন দফা দাবি পূরণ না করলে আগামী ১১ ডিসেম্বর মঙ্গলবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসায় আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠেয় দেশের শীর্ষ আলেম ও তাবলিগি মুরব্বিদের পরামর্শ সভা থেকে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

১ ডিসেম্বরের আগে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাবলিগের বিবাদমান বিষয় নিয়ে উভয়পক্ষের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ১ ডিসেম্বরে টঙ্গী ময়দানে সা’দপন্থীদের হামলার পর রাষ্ট্র কী বলছে, বা তাদের পক্ষ থেকে উলামায়ে কেরামের সঙ্গে কোন যোগাযোগ করা হয়েছে কিনা, এ ব্যাপারে জানতে চাইলে, মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন— ‘হ্যাঁ, যোগাযোগ হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আজও আমাদের কাছে প্রস্তাব এসেছে তাঁর সঙ্গে বসার জন্য, কিন্তু মুরব্বি উলামায়ে কেরাম জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমাদের দেওয়া তিন দফা দাবি পূরণ করার আগ পর্যন্ত আমরা বসব না। সরকার আগে ওয়াসিফুল ইসলামসহ প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের তাবলিগ থেকে বহিস্কার এবং টঙ্গীর সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিক, তারপর আমরা বসব।’

১ ডিসেম্বরের হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে উলামায়ে কেরামের তরফ থেকে আইনি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি-না জানতে চাইলে মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, ‘হ্যাঁ, হামলার ইন্ধনদাতা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে টঙ্গী থানায় একটি এবং গাজিপুর আদালতে একটি মামলা ইতিমধ্যে দায়ের করা হয়েছে। আরও কয়েকটি মামলার জন্যও প্রস্তুতি চলছে।’

ইসলাম টাইমস টোয়েন্টি ফোর ডটকমের সম্পাদক বিশিষ্ট লেখক ও আলেম মাওলানা শরীফ মুহাম্মদের কাছে উলামায়ে কেরামের এ অবস্থান ও সিদ্ধান্তকে তিনি কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন—’উলামায়ে কেরামের এই অবস্থান অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং আত্মমর্যাদাপূর্ণ পদক্ষেপ।

‘রাষ্ট্রপক্ষ তাবলিগের বিবাদমান বিষয় নিয়ে বারবার উলামায়ে কেরামকে ডাকবে আর উলামায়ে কেরাম বারবার সেই ডাকে সাড়া দেবেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করা হবে না রাষ্ট্রপক্ষ থেকে—এটা দুঃখজনক। উলামায়ে কেরামকে রাষ্ট্রের কাছে ধর্না দেওয়া বা নতজানু-আচরণ করার মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসা দরকার ছিল, সেটা হয়েছে। এটা খুব ভালো দিক।’

কিন্তু সামনে নির্বাচন, বিশ্ব ইজতেমাও আসন্ন, উলামায়ে কেরামের এসব শর্তারোপ ও শক্ত মনোভাবের কারণে এই কয়দিনে যদি তাবলিগের ব্যাপারে একটা সুরাহা না হয়, তবে তো ইজতেমা অনুষ্ঠানে একটা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে, আবার নির্বাচন হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে সরকারও এ ব্যাপারে বিরূপ হয়ে যেতে পারে, তখন তো তাবলিগের এই সমস্যাটা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে—এই প্রশ্নের জবাবে মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘দেখুন, ইজতেমা অনুষ্ঠান এত জরুরি কিছু না, সাদপন্থীরা যদি আলাদা একটা ফেরকা হয়ে আভির্ভূত হয়েও যায়, হোক! এ দেশে তো আরও বাতিল ফেরকা আছে—রাজারবাগি, দেওয়ানবাগি, আটরশিরা আছে, উলামায়ে কেরামের মেহনতের কারণে সাধারণ মানুষ আত্মমর্যাদার জায়গাটাকেই সমুন্নত করেছে। মুরব্বিদের এ সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই।’

উল্লেখ্য, তাবলিগ জামায়াত নিয়ে চলমান সঙ্কটের জের ধরে, গত ১ ডিসেম্বর টঙ্গীর ইজতেমার ময়দানে অবস্থানরত ওলামায়ে কেরাম, মাদ্রাসার ছাত্র ও তাবলিগের সাধারণ সাথীদের উপর হামলা করে সা’দপন্থীরা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্ন অনেক জামলার ঘটনাও ঘটেছে। এর প্রেক্ষিতেই থেকেই আসন্ন তাবলিগ সঙ্কট নিয়ে শক্ত অবস্থানে গিয়েছেন আলেমসমাজ।

আগের সংবাদআওয়ামীলীগে বিদ্রোহী ৭৯, শঙ্কায় অনেক আসন?
পরবর্তি সংবাদবাবরি মসজিদ ধ্বংস, ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মিথ্যা বলে বৈধতা দিয়েছিল