যেসব বিষয় নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে

তুহিন খান 

একাদশ সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র দুইদিন বাকি। শেষ মুহূর্তের প্রচারণা-প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রাজনৈতিক দলগুলি। নির্বাচন উপলক্ষ্যে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনীতির ময়দান। প্রচারণার সাথে তাল মিলিয়ে চলছে প্রোপাগান্ডা ও সহিংসতা।

২০১৪ সালের নির্বাচনটিকে বাদ দিলে, প্রায় দশ বছর পরে বাংলাদেশে নির্বাচন হচ্ছে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, এবারের নির্বাচনেই প্রথম, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে সবগুলো দল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেশের যে অবস্থা ছিলো, যে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমীকরণ ছিলো, গত দশ বছরে, বলা ভালো, গত চার বছরে তা পালটে গিয়েছে অনেকটাই। ভোটের মাঠের মূল লড়াইটাও কাগজে-কলমে বদলে গেছে অনেকটাই, আওয়ামী লীগ-বিএনপির পরিবর্তে এবার লড়াইটার অফিশিয়াল নাম আওয়ামী লীগ-ঐক্যফ্রন্ট।

ফলে পালটে গেছে নির্বাচনের প্রধান ফ্যাক্টরগুলিও। ২০০৮ সালে যে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলে ক্ষমতায় এসেছিলো আওয়ামী লীগ, এবারে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সেই ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার’ই অনুপস্থিত। ফলে, পরিবর্তিত এই প্রেক্ষাপটে, এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের মূল ফ্যাক্টরগুলো কী কী হতে পারে?

এক. তরুণ ভোটার। এবারের নির্বাচনের সবচাইতে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে তরুণ ভোটারদের ভোট। দলগুলিও সে ব্যাপারে সচেতন। ফলে, তাদের নির্বাচনী শ্লোগানের বেশিরভাগই দেওয়া হচ্ছে তরুণদের লক্ষ্য করে, তরুণ প্রার্থীর সংখ্যাও বাড়িয়েছে দলগুলো।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নবম সংসদ নির্বাচনের পর যারা ভোটার হয়েছেন, তাদের আমরা তরুণ ভোটার হিসেবেই বিবেচনা করতে পারি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, নবম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের পর থেকে ১০ বছরে দেশে ভোটার বেড়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ ৫৫ হাজার ৩৭৮ জন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনের সময় দেশে মোট ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৩ জন। সে হিসাবে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় যোগ হন ১ কোটি ৮ লাখ ৭৮ হাজার ১৬৪ জন নতুন ভোটার। এখন দেশে ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১ জন। শুধু এবার ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ৪৬ লাখ ৫৫ হাজার ৫৪৫ জন নতুন ভোটার। নির্বাচন কমিশন জানায়, নতুন ভোটারদের বয়স ১৮ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ২৬ বছর বয়সের ভোটার রয়েছেন ৪৭ লাখ, ২৩ বছরের ৭০ লাখ, ২১/২২ বছরের ৩৭ লাখ, ১৯/২০ বছরের ২৭ লাখ এবং ১৮ বছরের ৪৬ লাখ ভোটার রয়েছেন। আর ১ কোটি ২১ লাখ ৭৭ হাজার ২১৪ জন ভোটার একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রথম ভোট দেবেন।

তরুণ ভোটারদের ভোট এবারের নির্বাচনে সবচাইতে বড় ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল। ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে দুইটি বড় ছাত্র আন্দোলনও এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।

দুই. নারী ভোটার। এবার নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৫ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ১০৫। আর নারী ভোটারের সংখ্যা ৫ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ২৭৬। অর্থাৎ নারী-পুরুষ ভোটারদের সংখ্যার ব্যবধান ৮ লাখ ৮১ হাজার ৮২৯ জন। আর পুরুষ ও নারী ভোটারের অনুপাত ৫০.৪২ঃ ৪৯.৫৮। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন এই ভোটারদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ভিন্ন মাত্রার। শিক্ষিত ও বয়সে তরুণ এই নারীরা ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদেরই ভোট দেবেন। বিষয়টি মাথায় রেখে রাজনৈতিক দলগুলোও নারী ভোটারদের নির্বাচনে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন। নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর উন্নয়নের বিষয়টি পেতে যাচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব। অবশ্য ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নপ্রত্যাশীরা নারী ভোটারদের গুরুত্ব দিয়েই তাদের প্রাক-নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন।

তিন. ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। এবারের নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলি ভোটের হিশাবে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারেন বলে অনেকেই মনে করছেন। গত তিন-চার মাস আগেও, কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলির সাথে ক্ষমতাসীনদের সম্পর্ক এবং বিরোধীপক্ষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বেশ উত্তপ্ত ছিলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। সংসদে এবার অনেক আলেম আসতে পারেন বলেও ছিল জোর গুঞ্জন। তবে, অনেকেই মনে করছেন, এই শেষ সময়ে এসে, পরিস্থিতি অনেকটাই যেন পালটে গেছে। মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকে আলেম-ওলামাদের তেমন কোন প্রভাব রাজনীতির মাঠে দেখা যায়নি।

চার. ভারত ফ্যাক্টর। বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘ভারত ফ্যাক্টর’র কথা বরাবরই বলে এসেছেন বিশ্লেষকরা। গত জুনে বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার ভারত সফরে নতুন করে ব্যাপারটি আলোচনায় আসে। বিগত দশ বছরে ভারতের ক্ষমতার পালাবদল সত্ত্বেও, আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, নয়াদিল্লি যেই ক্ষমতায় আসুক তার সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। গত অক্টোবরে ভারতের সাউথ ব্লকে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভিকে সিং বলেন, ‘নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ যে ইচ্ছাই প্রকাশ করবে, তার প্রতি আমরা সম্মান জানাব। নির্বাচনের এখনও কিছুটা সময় আছে। দেখা যাক, পরিস্থিতি কোন পথে অগ্রসর হয়।’

বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ভারতের কোনো বার্তা আছে কিনা জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিই আমাদের সমর্থন থাকবে। বাংলাদেশের জনগণই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। নির্বাচনের ইস্যু আমরা বাংলাদেশের জনগণের ওপর ছেড়ে দিতে চাই।’

পাঁচ. জামায়াত ও জাতীয় পার্টি। এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে জামায়াত ও জাতীয় পার্টি। ভোটের রাজনীতিতে সবসময়ই মূল পার্শ্ব-প্রভাবক এই দল দুইটি বর্তমানে যথাক্রমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধ।

দলের নিবন্ধন ও প্রতীক বাতিল হলেও, ২২ টি আসনে বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিয়ে লড়বে জামায়াত। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও এ ব্যাপারে তাদের মৌন সমর্থন জানিয়েছে। আবার অনেক জায়গায় স্বতন্ত্র প্রার্থীও দিয়েছে জামায়াত, যা ঐক্যফ্রন্টের ভোটব্যাংককে বিভক্ত করে ফেলতে পারে। ফলে, ঐ আসনগুলোতে জয়-পরাজয় বদলে দিতে পারে অনেক হিশাব।

একই অবস্থা জাতীয় পার্টিরও। মহাজোট থেকে ৫০ আসন আশা করলেও, তারা শেষ পর্যন্ত পেয়েছে ২৯ টি আসন। ফলে, আরো ১৩২ আসনে তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী দিয়েছে। যা ঐ আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলতে পারে।

ছয়. সোশাল মিডিয়া। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই প্রথম নির্বাচন উপলক্ষ্যে এত ব্যাপকভাবে সোশাল মিডিয়া ব্যবহৃত হচ্ছে। ক্ষমতাসীনরা যেমন জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন সোশাল মিডিয়ায়, ঠিক তেমনি বিরোধীরাও বসে নেই। অনেকেই হামলা-মামলার মুখে মাঠে নামতে না পারলেও, সোশাল মিডিয়ায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন ভিডিও বার্তা, উজ্জীবিত করছেন নেতা-কর্মী ও ভোটারদের। বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা তাদের ভিডিও বার্তা সোশাল মিডিয়ায় বুস্ট করছেন, অনেক ভিডিওবার্তা ভাইরাল হচ্ছে। অনেকে আবার নির্বাচনী ভিডিও মিউজিক ইউটিউবে আপ্লোড করছেন। অনেক গণমাধ্যমকর্মী, কবি-সাহিত্যিক নিজ নিজ ফেসবুক প্রোফাইলে পোল খুলে নির্বাচনী জরিপ চালাচ্ছেন।

নির্বাচনের আরো অনেক ফ্যাক্টর থাকলেও, অভিজ্ঞ মহল বলছেন, দুই কোটি তরুণ ও পাঁচ কোটি নারী ভোটারই ঠিক করবেন এবারের নির্বাচনের ফলাফল। আর তাই এবারের নির্বাচন বাংলাদেশে একটি নতুন প্রজন্ম ও সময়ের সূচনা করবে বলে আশা সবারই।

আগের সংবাদগুজব যাচাইয়ে এবার র‍্যাবের ফ্যাক্ট চেক বিষয়ক পেইজ !
পরবর্তি সংবাদবাংলাদেশের গণতান্ত্রকে নস্যাৎ করতে পারে ভারত: ড. কামাল