
হামমাদ রাগিব
সদ্য সমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুষ্ঠুতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রশ্ন তুলে আসছে নির্বাচনের দিন থেকেই। জনসাধারণের অনেকের মধ্যেও এ ব্যাপারে রয়েছে আভ্যন্তরীণ একটি অসন্তোষ। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীনদের দাবি, এবারের নির্বাচন গত ৪৭ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোতে তাঁরা এ বিবৃতিই দিয়ে আসছেন।
ঐতিহ্যবাদী ইসলামপন্থীরা কীভাবে মূল্যায়ন করছেন এ নির্বাচনকে? নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে তাঁদের অবস্থান ঠিক কী? ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয়েছিল প্রত্যক্ষ রাজনীতির সাথে যুক্ত নন, এরকম কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় আলেমের সঙ্গে। কিন্তু তাঁদের কেউই এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে ট্রাডিশনাল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন আলেম ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি তৈয়ব ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেছেন, ‘এ নির্বাচনে আসলে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেনি। ঘটার সুযোগও দেওয়া হয়নি। একটা নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে নির্বাচনটা করা হয়েছে, যে পদ্ধতি সম্পর্কে জনগণ অনেকটা অন্ধকারে ছিল।’
‘মিডিয়ায় তো বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ এসেছে, এর বাইরে কেউ যদি নিজেকে বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, বিবেকই বলে দেবে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হয়েছে।’
কিন্তু বহির্বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন রাষ্ট্র তো ইতিমধ্যেই নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ায় ক্ষমতাসীনদের প্রশংসা করেছে। ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের এ জিজ্ঞাসার জবাবে মুফতি তৈয়ব বলেন, ‘বহির্বিশ্ব যার যার স্বার্থ চিন্তা করে এ সমর্থন জানিয়েছে। তাছাড়া এবারের নির্বাচন, বললাম না, বিশেষ নিয়ন্ত্রণে করা হয়েছে, যার দরুণ বিশ্ববাসীর কাছে তা সুষ্ঠু নির্বাচন রূপেই উপস্থাপিত হয়েছে। বহির্বিশ্বের সমর্থনের এটাও একটা বড় কারণ।’
ইসলামী ঐক্যজোট এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেবে কি-না, বা নির্বাচন নিয়ে তাদের অবস্থান ঠিক কী—জানতে চাইলে মুফতি তৈয়ব বলেন, ‘এটা মজলিসে শুরার ব্যাপার। শুরা হয়তো শিগগির বসে এ ব্যাপারে আলোচনা করবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি এখন কিছু বলতে চাই না।’
কথা বলেছিলাম জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা শাহীনূর পাশা চৌধুরীর সঙ্গেও। যিনি গত নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়নে সুনামগঞ্জ-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন। মাওলানা শাহীনুর পাশা ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে কথা বলার আর কী আছে! দেশের জনগণ ভালোভাবেই সেদিন প্রত্যক্ষ করেছে নির্বাচনের নামে কী তামাশার আয়োজন করা হয়েছিল।’
কিন্তু নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীনরা তো বারবার বলে আসছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। নির্বাচনে কারচুপি ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনে যে ভিডিও ফুটেজগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে, সে ব্যাপারে বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এসব বিগত বিভিন্ন নির্বাচনের। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের না। এ নির্বাচনে দু’-একটি জায়গা—যেখান থেকে অভিযোগ এসেছে, সেখানকার আসনগুলোর নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন।
এ কথার জবাবে মাওলানা শাহীনুর পাশা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বললেই যে সেটা সঠিক হয়ে যাবে—এমন না। সেদিন কীভাবে জালিয়াতি করা হয়েছিল, সারা দেশের মানুষ সাক্ষী। আমার আসনে যেসব জায়গায় তাদের প্রভাব বেশি, আগের দিন রাতেই সিল মেরে ব্যালট বক্স ভরে রেখে দিয়েছে। আর যেসব জায়গার তাদের প্রভাব কম, সেখানে ফলাফলের সময় আমার ভোট বেশি হলে, বেশি সংখ্যা তারা নিয়ে কম সংখা আমাকে দিয়ে রেজাল্ট পেপারে জোর করো সাইন নিয়েছে আমার এজেন্টদের। সাইন দিতে অস্বীকৃতি জানালো অনেক এজেন্টকে মারধরও করেছে। আর এ সবকিছু হয়েছে প্রশাসনের উপস্থিতিতে এবং প্রত্যক্ষ সহায়তায়।’
এখন পরবর্তী পদক্ষেপ তাঁরা কী নিচ্ছেন জানতে চাইলে মাওলানা পাশা বলেন, ঐক্যফ্রন্ট আগামী কাল তিন শ’ আসনের সব প্রার্থীদের নিয়ে মিটিং করবে। সেখান থেকেই সিদ্ধান্ত আসবে পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেওয়া যায়।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী আসন থেকে মিনার প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা মাওলানা মাইনুদ্দীন রুহি। তিনি ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে জানিয়েছেন, ‘এটা আসলে প্রহসনের নির্বাচন। ব্যাপক কারচুপি করেও অত্যন্ত কৌশলে সেটাকে ক্ষমতাসীনরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষরূপে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করেছে। এবারের নির্বাচনে খুব একটা সহিংসতা হয়নি, এটা ঠিক, এটাকেই তারা সুষ্ঠুতার বড় দলিল হিসেবে পেশ করছে। কিন্তু সহিংসতা বাঁধবে কার সঙ্গে, বিপক্ষের সবাইকে নির্বাচনের আগেই গ্রেপ্তার করে রাখা হয়েছে। ফলে বাধাহীনভাবে দিন-দুপুরে ডাকাতির মতো তারা ইচ্ছে মতো সিল মেরেছে নিজেদের পক্ষে। যেখানে বাধা দেওয়ার বা সামান্যতম প্রতিবাদ করার কোনো লোক ছিল না।’
‘আমরা আগ থেকেই বলে আসছি, দলীয় সরকারের অধীনে কখনও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না। এটার জ্বলন্ত প্রমাণ দেশবাসী ৩০ তারিখের নির্বাচনে দেখেছে।’
