
রাগিব রব্বানি
ভোটপ্রদানের সময় বাকবিতণ্ডার জের ধরে গত ৩০ ডিসেম্বর রাতে নোয়াখালীতে পারুল নামের এক গৃহিণী নির্মমভাবে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। পারুলের দাবি, ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণে নৌকা মার্কার স্থানীয় সমর্থকরা তাঁকে ধর্ষণ করেছে।
এই ঘটনায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সামাজিক বিভিন্ন সংগঠনও এ ব্যাপারে কথা বলছে। কিন্তু ঐতিহ্যবাদী ইসলামপন্থীদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। তাই কওমি ঘরানার অনেক তরুণ ঐতিহ্যবাদী ইসলামপন্থী নেতৃস্থানীয়দের উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন তুলছেন, কুরআন-বিরোধী নারীনীতিমালা প্রণয়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা গেলে নারী যখন রাষ্ট্রের মৌন সমর্থনে গণধর্ষণের শিকার হয়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়, মারা যায়—তখন কেন এর বিরুদ্ধে আন্দোলন কিংবা জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করা যাবে না?
এঁদের মধ্যে অনেক তরুণ তীর্যক মন্তব্যও করছেন ইসলামপন্থী নেতৃত্ব নিয়ে। সাম্প্রতিক কালে সংঘটিত সামাজিক এ রকম নানা সঙ্কটে দেখা গেছে, আলেমরা যখন নীরব থাকেন, তরুণরা তখন নেতৃত্ব নিয়ে নানা ধরণের মন্তব্য করেন।
নানা ইস্যুতে আলেমদের অনুপস্থিতি কিংবা নীরবতাকে কেন্দ্র করে কওমি ঘরানার তরুণরা এই যে তীর্যক মন্তব্য করছেন, এর কারণ কী? জানতে চেয়েছিলাম ‘মুহাম্মাদ সা. রিসার্চ সেন্টার-এমআরসি’-এর রিসার্চার, তরুণ আলেম, লেখক ও চিন্তক মনযূরুল হকের কাছে।
উত্তরে মনযূরুল হক বলেন, ‘এটা আসলে তাঁরা একটা ক্ষোভ থেকে করে থাকেন। এবং এই ক্ষোভটা তৈরি হয় বিভিন্ন বাস্তবতা থেকে। যেমন ধরুন, জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে আলেমদের নীরবতা। পারুল ধর্ষণ বা বিগত দিনের এই রকম আরও অন্যান্য ধর্ষণের ইস্যু কিংবা নিরাপদ সড়কের জন্য ছাত্রদের আন্দোলন—জনগুরুত্বপূর্ণ এমন কয়টা ইস্যুতে আলেমদের ভূমিকা আছে? অথচ সামাজিক এসব ইস্যুতে ভূমিকা রাখা তো ইসলামেরই নির্দেশনার অংশ।
‘তাছাড়া তৃণমূলের সঙ্গে মেশেন সংক্ষুব্ধ এই তরুণরাই। আর মানুষের কাছে তাঁরা নেতৃস্থানীয়দের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হন। বিভিন্ন ইস্যুতে নেতৃস্থানীয়দের নীরবতা কিংবা জনমতের বিপরীত অবস্থানের কারণে এই তরুণরাই জনসাধারণের নানা প্রশ্ন ও তীর্যক মন্তব্যের মুখোমুখি হন। যেমন ধরুন, আমাদের নেতৃস্থানীয় কেউ টকশোতে গেলেন, সেখানে নানা কায়দায় তাঁকে অপমান করা হলো, তিনি ডিফেন্ড করতে পারলেন না। এই যে তাঁর অপমান, এটা কিন্তু তাঁর একার থাকে না, বরং এটা হয়ে যায় ইসলামপন্থী জনগোষ্ঠীর অপমান। আর তখন তাঁর এই অপমানের বোঝা বয়ে বেড়াতে হয় দাঁড়ি-টুপিধারী সবাইকে। বিশেষ করে তরুণদেরকে, যারা ইসলামকে রিপ্রেজেন্ট করার কাজ করে থাকেন যার যার অবস্থান থেকে। এসব কারণেই বড়দের প্রতি তাঁদের ভেতর একটা সংক্ষুব্ধ মনোভাব দানা বেঁধে ওঠে।’
‘এ ক্ষোভ দূর করার জন্য আসলে মুরব্বি ও তরুণদের মধ্যে যে দূরত্বটা আছে, তা কমিয়ে আনা দরকার। অনেক সময় তরুণরা ভুল বুঝে মুরব্বিদের ওপর খেপেন। মুরব্বিরা যদি এই শ্রেণিকে নিজেদের ধারে কাছে রাখেন, তবে আশা করি ক্ষোভটা তাদের অনেকাংশেই কমে আসবে। কারণ, মুরব্বিদের সীমাবদ্ধতা কিংবা কোনো সিদ্ধান্ত নিলে কীসের আলোকে তাঁরা সেটা নিয়েছেন, এ ব্যাপারে তরুণরা ওয়াকিবহাল থাকবে।’
‘তবে সব কথার শেষ কথা হলো, প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার ক্ষেত্রে তরুণদের আরেকটু সংযত হওয়া প্রয়োজন। আজকের তরুণদেরকে দেখা যায়, প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তাঁদের অনেকে ব্যক্তি আক্রমণ করে ফেলেন। আক্রমণাত্মক কোনো কথায় ভালো ফল আশা করা যায় না, এটা মনে রাখতে হবে তাঁদের। তাঁরা যদি সত্যিকার অর্থেই এ দেশ এবং দেশের ইসলামপন্থীদের কল্যাণ চান, তবে গঠনমূলক সমালোচনা এবং প্রতিক্রিয়া প্রদানে মনোযোগী হবেন।’
