
যিয়াদ বিন সাঈদ
পূর্ব প্রকাশের পর
বিকেলটা নিভে যাচ্ছে। মেঘ, পাখি, উঁচু উঁচু গাছ আর যে রিকশাটিতে চড়ে বসেছি আমি এবং আমার পিতা—সূর্য তাকে স্পর্শ ক’রে ক’রে ডুবে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সমস্ত দিনের আলো, তার পেছনে আবরিত এক অন্ধকার ঘাপটি মেরে বসে ছিলো এতোটা সময়। আঁধারের রঙে মাখা নক্ষত্রের আলোটিই যেন আমাদের চলার শক্তি। পিতা বলছেন, শক্ত করে ধরে বসো। আমি ভাবি—যে পথটি ধরে যাচ্ছি যেদিকে, সেখানে তো শক্ত ও দৃঢ়তারই তাগাদা। সেখানে আছে ভয়, সশ্রদ্ধ বিস্ময়, শঙ্কা ও অভিশঙ্কার ত্রসন। তাহলে কি জীবনের দিকে এরকমই এক ভীতিকে হামল করে আমাকে চলতে হচ্ছে আজ? কী বলে নফস?
আগের কিস্তি : ছন্দ ও দ্বন্দ্বের এই হাঁটা (১)
হ্যাঁ, এ চলন জীবনমুখী। ভাঙনের নদী পেরিয়ে দুই হাজার ছয়ের সে সন্ধ্যায় আমি আমার পিতার হাত ধরেই চলেছিলাম ইলমে নববির এ সুপ্রসন্ন দহলিজে, পবিত্র আঙিনায়। কিন্তু সূচনায় আলো, তবু ভেতরে যে গভীর অন্ধকার! নানুবাসায় থাকাকালীন ভাইয়ার সেইসব আসা-যাওয়া আমাকে সত্যিই প্রচণ্ড ভীতি ও শঙ্কায় ফেলে দিয়েছিলো। মনে হ’তো শুধু নিস্তব্ধ রাত্রির বুক চিরে ভেসে আসছে ডাহুকের কান্না। কাঁদছে ভাইয়া, কতোটা যাতনা সয়ে সয়ে। মিন আন সামি’তু হাত্বা, আমি পালিয়ে যেতে যেতে চাইতাম এর কাছ থেকে। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অথবা কেমন তার গুরুত্ব, তার কোনোটাই আমার ভেতর অনুরণিত হতে পারেনি। বলেছে শুধু এ কীভাবে সম্ভব? এভাবে আম্মু আর আমার খেলনার ঘর-সংসার ছেড়ে যাওয়া কি যায় ?
এতদসত্ত্বেও ভয়ের অভিন্নতা নিয়েই আমাকে যেতে হয়েছিলো সেদিন, যেতে তো হবেই। কিন্তু সেখানের উস্তাদ আর আমারই মতো ছোট্ট ছোট্ট মানুষগুলোকে দেখে এবং তাদের প্রীতির কাছে একটা সময় আমি সব ভুলে গিয়েছিলাম মনে হয়। সন্ধ্যার পর সূর্য যখন অনেকটা আলোহীন, তখন আমাকে নেয়া হলো এ আঙিনার একদম চূড়ান্তে। সবাই পড়ছে। অধীর মনযোগে। সবার হাতে চক শ্লেট। ‘আলিফ মিম ত্বোয়া যোয়া’র ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। আমাকেও দেয়া হলো শ্লেট। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্লাকবোর্ডের সম্মুখে একজন শিক্ষক, তিনি লেখাচ্ছেন। শেখাচ্ছেন। চৌদ্দশত বছর আগের যে শিক্ষা—’ইকরা’—এরই চর্চা করছেন। আমার ছোট্টমন তখন আবারও ভীতসন্ত্রস্ত। কেঁপে উঠছে তটস্থ ‘শাফাতাইন’। আর ভিজে যাচ্ছে ঘামে, মসৃণ ‘জাবহাহ’।
আমাকে লিখতে দেয়া ‘হা’ আমি লিখতে গেলাম যখনই, আমার শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। নবি মুহাম্মদের মতোই বলে ফেললাম চিন্তাহীন স্বরে— ‘আমি পারব না’। সাল্লালাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। কিন্তু সে শিক্ষক দৌড়ে এসে আমাকে আদরের ভঙ্গিতে কোলে তুলে নিলেন। জড়িয়ে ধরলেন। যেভাবে জড়িয়ে নিয়েছিলেন প্রেরিত জিবরিল, নবিজির সমস্ত দেহটাকে। আমার চোখেমুখে লেপ্টে থাকা ভীতিবিহ্বলতা, কেটে যেতে থাকলো ক্রমশ। ইলমে ওহির এ অভূতপূর্ব জাদুর খেলায় আমি আরও বিস্মিত হয়ে গেলাম যেন।
এখান থেকেই মূলত জীবনের একটি আনুষ্ঠানিক সূচনা আমার। গায়ে শুভ্রতা আর মননে নববি চিন্তাকে আলগ মাকামে স্থাপন করে চলেছি আজ অবধি। মাঝে কখনো-বা মন-বিক্ষিপ্তি অথবা অযথা ‘শার’-এর মুখোমুখি হয়েছে, আবার ফিরে এসেছে নিজ আলয়ে। মন্দের সঙ্গে এই যে সংস্পর্শের গল্প অথবা তার থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে খুঁজে আবার নীড়ে ফিরে আসা, এর জন্যে অনেক কারণ বয়ান করা গেলেও আমি বারবার আওড়াবো, ‘ফল্ট উইথ দি আয়রন ফ্লোটস’।
বিপ্লব, সাহিত্য, কবিতা, আধুনিকতা, খ্যাতি এবং নিজস্বতা ইত্যাদি সবকিছুতেই আমি অনেকটা মোহগ্রস্ততা বোধ করেছি সময়ে সময়ে। কোনোটা শুদ্ধতার পরিচ্ছদে চলেছে নিজ গতিতে আবার কখনো এ গতিধারায় এসেছে অশুদ্ধতার মিশ্রণ। সহোদরপ্রীতি তাসিরে তাসিরে ভরে দিয়েছে চিন্তার বিস্তৃত পরিসর। বন্ধুত্বের শক্তি মানসিকতাকে ঠেলে দিয়েছে অবিরল শূন্যের দিকে। এই যে নানামুখী গল্পের সৃষ্টি, তার আসলে নিজস্বতা নেই সত্যিই।
বিক্ষিপ্তভাবেই এ কেসসার বয়ান করে যেতে হবে। নাগপাশ খুলে ফেলে কিছুক্ষণ থেমে আবারও চলতে হবে জীবনের হেমন্ত সৈকতে দাঁড়িয়ে তার দ্বন্দ্ব ও ছন্দের আলাপে। যে জীবনে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হতে থাকবে এ তো আধো-চেনা পুরোনো এক পৃথিবী। বিরাট যুদ্ধ হয়ে গেছে এখানে। কোন পথে যেতে হবে এখন; খোঁজো মুরশিদ হন্যে হয়ে।
চলবে…
লেখক : গদ্যকার
আগের কিস্তি : ছন্দ ও দ্বন্দ্বের এই হাঁটা (১)
