ছন্দ ও দ্বন্দ্বের এই হাঁটা (১) ।। যিয়াদ বিন সাঈদ

যিয়াদ বিন সাঈদ

একটি মিছিল আসছে ওইদিক থেকে। টগবগ টগবগ তাণ্ডবে মিছিলটি ছড়িয়ে পড়তে চাইছে প্রতিটি শূন্যতায়, করতে চাইছে উগ্র আহ্বান। এ মিছিলটির নিজস্ব কোনো বৈভব অথবা ঐশ্বর্য না থাকলেও মিছিলটি ঝলসে-যাওয়া একটি হৃদয়ের গান গাইছে নিরলস।

তার একপাশে কজন মা অশ্রুবিন্দু মুছে দেবার উগ্র শাসনে আঁচলগুলো সদা করছে প্রস্তুত। ওই যে ধাতব ট্যাঙ্কার, যার সামনে হচ্ছে দহন, অগ্নির মতো মুন্তাশের পুত্রের একেকটি কলব,  অথচ মায়েরা হাসছেন। স্লোগানহীন এ মিছিলটির ভেতর তারা করছেন লয়, যতি ও ছন্দের এক স্পষ্ট অনুধাবন।

আর এ মিছিলটিকেই আমি জীবন বলতে চাই। আলোকের রূপ ধরে আলেয়া ছুটে যাবার মতোই এ মিছিলটি ছুটে যাচ্ছে কখনো এদিক, আবার কখনোবা উড়ে যাচ্ছে অন্যপাশে ডানামেলা সালওয়ার মতো। স্পষ্ট দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়ে বলতে চাইছে এ তো এক পদ্মপাতার শিশিরবিন্দু, যেখানে প্রতিক্ষণে প্রশ্ন থেকেই যায়—‘টু বি অর নট টু বি’। এমনই এক দ্বান্দ্বিক জীবনের গল্প আজকে। গল্পটা ঠিক কোত্থেকে শুরু করা যায়, তা নিয়েও দ্বন্দ্ব; কিন্তু দ্বন্দ্বটা মনস্তাত্ত্বিক। আমার জীবনে লালিত দ্বন্দ্বের হিসেবটা কি ঠিক এমনই?

ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত হেরেম অটোমান সুলতানের ‘দ্য গ্রান্ড সেরাগলিও’র চিত্তাকর্ষক বর্ণনা যখন ছোটোবেলায় নানুবাসার উঠোনে রোজ রাতে বসা গল্পের আসরে শুনেছিলাম, তখনই আমি টের পেয়েছিলাম আমি ক্রমাগত একটি দ্বান্দ্বিক জীবনের দিকে হাঁটছি। যে-জীবনের মিছিল দুপাশে ভিন্ন ভিন্ন পথে এগিয়ে যেতে চাইবে—যেমন চেয়েছিলো সে-রাতে। এমনকি সে-রাতে আমার যেতে ইচ্ছে হয়েছিলো ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে ওপারে, যেখানে যাত্রাপালা হতো;  ঝাউবনের ভেতর সৌমেন দাশের শখানেক পত্নী-উপপত্নীর মেলায় কী হবে—ওই অটোমান সুলতানের হেরেমের মতো, সে কৌতূহল থেকেই আমার চাহিদা ক্রমেই বেড়ে উঠছিলো বোধহয়। কিন্তু এরই কিছু সময় পর, দ্বিধার সামনে পড়ে গেলাম, মুখোমুখি হলাম দ্বন্দ্বের—যেন সত্যিই হাঁটছি এক দ্বান্দিক জীবনের দিকে।

এই যে হাঁটছি হাঁটছি—একটি ‘চিন্তা’ আমার ভেতর জেঁকে বসেছিলো সেই ছোটো সময়েই; তার পূর্ণ বাস্তবতা আমার সমস্ত অস্তিত্বে এখন অনুভব করি। এর পেছনের রহস্যটা কী আর কোন যাদ আর রাহেলাহ আমাকে নিয়ে ছুটতে চাইছে এমনই এক দ্বান্দ্বিক জীবনের দিকে, তা নিয়েও আজকের গল্প—গল্পটা আত্মজৈবনিক৷ রুদ্ধ একটি দ্বার খুলে যে-জীবন শুদ্ধতার তালাশ করলেও যেন ঘুরছে ক্ষুদ্র একটি বৃত্তের মাঝে প্রতিনিয়ত।

একটা স্পষ্ট ছবি আমার ভেতর এখনও মাতম তোলে, দৌর্মনস্য এক উতরোলের সৃষ্টি করে। শ্রাবণ মাসের দিন, বিরামহীন বর্ষা যখন; এই বৃষ্টি আসছে, এই আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে; অথবা কখনোবা শীতের সন্ধ্যা, গায়ে জড়িয়ে আলোয়ান, ঢাকা থেকে আমাদের আব্বু আসছেন; আব্বুর সঙ্গে কাঁধে ব্যাগ ঝুলতে-থাকা ভাইয়াও হাসিহাসি মুখে আসছেন নানুবাসায়; মনে হতো, সাপ্তাহিক এ ছুটিটার জন্য তার কত প্রতীক্ষার ক্ষণ গুনতে হয়েছে, অদম্য কলবকে কতবার দমিয়ে রাখতে হয়েছে, হাসির আবরণে সে-যাতনা লুকিয়ে রাখার তীব্র প্রচেষ্টা তার। কিন্তু এ হাসির সময়কাল তো খুব বেশি দীর্ঘ হতো না। শুক্রবার এলে আবার চলে যেতে হতো ঢাকায়। প্রতি জুমাবারই নানুবাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আব্বু আর ভাইয়ার চলে যাওয়া দেখতে হতো। আম্মু কাঁদতেন। ভাইয়াও একটু হাঁটতেন সামনে, আবার পেছনে তাকিয়ে কৃত্রিম এক হাসি দিয়ে আড়াল হয়ে যেতেন।

আসা-যাওয়ার এই ছবিটা দীর্ঘ দিনের। ঢাকায় কী যেন সমস্যা হলো, আম্মু আর আমাকে নানুবাসায় রেখে আসলেন আব্বু। ময়মনসিংহ ইউনিভার্সিটির সুবিশাল মাইদানে নীরব পদচারণা আর প্রতীক্ষার যাতনা সয়ে সয়ে এমনই কেটে গিয়েছিলো আমার শৈশবের একটি বৃহৎ সময়। আকাশ থেকে আলো নিভে যাওয়া ফিল নিয়ে অপেক্ষাতুর এবং কাঁটা-গোলাপ-বিদ্ধ যাতনায় ভর করে তখনই আমি অনুভব করেছিলাম রক্তের প্রতি তীব্র সম্মোহন, অনাদিত্যের আলোয় হুব্বে-আখাবির এক প্রচণ্ডতা।

ওই যে বলেছিলাম মিছিলের কথা—হাঁ, মিছিলের মতোই জীবনের নানা ছন্দ থাকে। হরেক রকমের মিশ্র অনুভূতির মিশেলে জীবন চলতে থাকে। শৈশব থেকে কৈশোর, আবার কৈশোর পেরিয়ে  তারুণ্যের মখমলে সবুজ আঙিনা। একদিন দেখা যাবে সব কিছু শেষে এক নির্বারিত সমুদ্র-দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছে জীবন—যেন  বিরাট যুদ্ধ শেষে নিভে গেছে আধো-চেনা কোনো এক পুরনো পৃথিবী; এমনই এক দীর্ঘ পরিক্রমার মুখোমুখি হতে হয় এ জীবনকে নানা অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন ঘটনার, সঙ্গী করে নিতে হয় হরেক আলওয়ানের চিন্তা-চেতনা আর বোধ-বুদ্ধির বৈসাদৃশ্যতা।

আমার জীবনটাও ঠিক এরকম। সেই শৈশব থেকে প্রকৃতি ও পাখির শরীর ছুঁতে ছুঁতে কেমন নিমীল সোনা পশ্চিমের অদৃশ্য এক সূর্যের দিকে নেমে এসেছি আর ভেবেছি—ঢের দিন চলে গেলো এরই মাঝে, ঢের অভিজ্ঞতা জীবনের সাথে জড়িয়ে গেলো বোধহয়। দ্বান্দ্বিকতা, কবিতার প্যাপিরাস, যুদ্ধ-যুদ্ধ মাঠে রুক্ষ গল্পের অবতারণা অথবা নিরেট নিঃসক্ত অন্ধকারের দিকে খননের অস্ত্র ছাড়াই ভীতিপ্রদ হেঁটে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো প্রাপ্তি নেই।

(চলবে…)

লেখক : গদ্যকার