
বিশেষ প্রতিবেদক
আফগানিস্তানে প্রায় দেড় যুগ ধরে চলা আমেরিকার আগ্রাসী কর্মকাণ্ড এখন নিরেট ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। দেড় যুগের যুদ্ধে খুব একটা সাফল্য তারা ঘরে তুলতে পারেনি। তাই দেশটির অধিকাংশ নাগরিক চান না, অমূলক এই যুদ্ধটি আর দীর্ঘায়িত হোক।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৯ ভাগ সাবেক সামরিক সদস্যসহ ৫৭ ভাগ আমেরিকান বলেছেন, তাঁরা আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যহার বিষয়ক প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। তবে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক এলিটরা (নব্য-রক্ষণশীল, প্রতিরক্ষা উগ্রবাদী ও উদার হস্তক্ষেপবাদী সবাই) এ ধরনের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের সভাপতি রিচার্ড হাসের মতে, আফগানিস্তানে যুদ্ধে জয় পাওয়া যেমন সম্ভব নয়, একইভাবে স্থায়ী শান্তির জন্য আলোচনাও সত্যিকারের কোনো বিকল্প নয়। সিরিয়ায় আমরা যা করতে যাচ্ছি, ঠিক সেভাবে স্রেফ সরে আসাটা ভুল হলেও তাই করা দরকার।
সংশয়ে থাকা হাস স্বীকার করেছেন, যে যুদ্ধে জয়ী হওয়া যাবে না সেই যুদ্ধে আমরা বছরে ৪৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছি। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, তাদের আরও ব্যয় করা উচিত।
গত বছর সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ সেন্টারের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকার প্রতিরক্ষা দফতর আফগানিস্তানে ২০০১ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ব্যয় করেছে ৮৪০ বিলিয়ন ডলার। অন্য এক হিসাবে দেখা যায়, যুদ্ধে এ পর্যন্ত আমেরিকার ব্যয় হয়েছে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। আরেক হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানে যুদ্ধ-সংক্রান্ত সব কিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ২ ট্রিলিয়ন ডলার। আর যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণ ২১ ট্রিলিয়ন ডলার। এই ঋণের এক তৃতীয়াংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নেয়া। এদের মধ্যে চীন আবার সবচেয়ে বড় ঋণদাতা। এমন প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানে অব্যাহতভাবে অপচয় করে যাওয়া কতটা বাস্তবতাপূর্ণ হতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তাছাড়া আমেরিকান সৈন্যদের ঝুঁকিগ্রস্ত করার বিষয়টিও রয়েছে।
আমেরিকা এই যুদ্ধে জয়ী হতে পারবে না বলে প্রথম যে মন্তব্য করেছেন হাস, তা যথার্থ। মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এখন যে মাত্রায় তালেবানদের তৎপরতা আছে সেখানে, তা দমন করতে প্রয়োজন ৬ লাখ ৬০ হাজার সৈন্য। এই সংখ্যাটি মার্কিন বাহিনীতে সক্রিয়ভাবে থাকা মোট সৈন্যের চেয়েও বেশি। আর যেসব এলাকা মার্কিন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ স্থায়ী করতে হলে প্রয়োজন আরও ২ লাখ ৩২ হাজার সৈন্য। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, যে কাজটি এক লাখ সৈন্য করতে পারেনি তা ১৪ হাজার বা ৭ হাজার সৈন্য কীভাবে করবে?
তবে হাস একথাও বলেছেন যে, স্থায়ী শান্তির জন্য আলোচনাও সত্যিকারের কোনো বিকল্প নয়। এর মাধ্যমে তিনি আসলে তালেবানবিহীন ও বন্ধুপ্রতীম একটি সরকার আফগানিস্তানে প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেছেন। কিন্তু তা কি সম্ভব?
দেড় যুগেরও বেশি সময়ের যুদ্ধে আমেরিকার মতো পরাশক্তি যেখানে তালেবানের খুব একটা কিছু করতে পারেনি, বরং তাদের প্রভাব এখনও সুবিস্তারিত, সেখানে বন্ধুপ্রতীম, সহজ করে বললে শক্তিশালী পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করা এবং তাকে স্থায়ী করা কতখানি সম্ভবপর?
হাস আরেকটি অভিমতে প্রতিবেশী ছয়টি দেশকে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরো বড় ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন। এসব দেশ হচ্ছে চীন, ইরান, পাকিস্তান, রাশিয়া, ভারত ও ইইউ।
কিন্তু বড় ভূমিকা পালনে এসে তারা কতখানি সফল হবে, তাও চিন্তার বিষয়। রাশিয়া তো আগে একবার মার খেয়ে গেছে, পুনর্বার মার খাওয়ার ইচ্ছে কি সাহস রাষ্ট্রটির আছে কি-না, তা দেখা দরকার। অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোও আমেরিকার ১৭ বছরের বেগারখাটা এবং প্রচুর সৈন্য ও অর্থের অপচয় দেখে আগ্রহী হবে বলে মনে হয় না।
আফগানিস্তান থেকে বের হওয়ার উপায় নিয়ে যন্ত্রণাদগ্ধ হওয়ার বদলে আমেরিকার উচিত এই নিয়ে অনুতপ্ত হওয়া যে, তারা ১৭ বছরেও তালেবানের মতো অস্ত্রেশস্ত্রে অনুন্নত ও অনেকটা নিঃস্ব একটা বাহিনীর সঙ্গে জিততে পারল না। উল্টো আরও বাহিনীটির আক্রমণে নিজেদের অর্থ, সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জামাদি বিনাশ করতে হলো নিতান্তই ফায়দাহীনভাবে।
