
রাগিব রব্বানি
চলমান তাবলিগ-সঙ্কটে সার্বিক আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ড বিবেচনা করলে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাদপন্থীদের পক্ষাবলম্বন করছেন বলেই প্রতীয়মান হয়। সাদ সাহেবকে ‘মাগলুবুল হাল’ আখ্যায়িত করতঃ তাঁর পক্ষে নানা কিসিমের সাফাই গেয়ে প্রচারমাধ্যমে মাওলানা মাসউদের অব্যাহত বক্তব্য-বিবৃতি এই সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করে। তাছাড়া কিছুদিন আগে বাংলাদেশের অন্যতম মুহাক্কিক আলেম, আহলে ইলমদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু মাওলানা আবদুল মালেক সাহেব সাদ সাহেবের বিভ্রান্তি নিয়ে যৌক্তিক ও ইলমি সমালোচনা করার কারণে ইকরা মাদরাসার ছাত্রদের মজলিসে প্রদত্ত এক বয়ানে মাওলানা মাসউদ তাঁকে ‘বেয়াদব’ ও ‘মূর্খ’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় পরে মাদরাসা ঘরানার আপামর ছাত্র-উস্তাদের তুমুল সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে।
কিন্তু তাবলিগ-সঙ্কটের শুরু থেকে তিনি নিজেকে সালিশ বা তৃতীয় পক্ষ দাবি করে আসছেন। বলে আসছেন, তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত এ বিবাদের নিষ্পত্তির জন্য চেষ্টা করছেন। যাতে দেওবন্দ মাদরাসা ও এ ঘরানার উলামায়ে কেরামের সঙ্গে সাদপন্থী তাবলিগিদের যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে, তা মিট্মাট হয়ে যায়।
গত ২৩ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর উদ্যোগে সাদপন্থী ও উলামায়ে কেরামের মধ্যে আসন্ন ইজতেমা উভয়পক্ষের অংশগ্রহণে করার জন্য সাময়িক একটি সমোঝতা হয়। দাবি করা হচ্ছে এই সমোঝতার মূল অনুঘটক মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ।
এ দাবির সূত্র ধরে গত ২৬ জানুয়ারি (শনিবার) ময়মনসিংহ খাগডহর জামিয়া আশরাফিয়া মাদরাসায় জাতীয় দীনি শিক্ষাবোর্ডের ব্যানারে মাওলানা মাসউদের একান্তজনরা তাবলিগ-সঙ্কট নিরসনে ‘বিশেষ ভূমিকা’ রাখায় তাকে সংবর্ধনা দেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের বক্তব্যে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ দাবি করেন, তিনি তাবলিগ-সঙ্কট নিরসনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ জন্য মাওলানা সাদ কান্ধলভি ও দেওবন্দ মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ অব্যাহত আছে। ইজতেমা উপলক্ষে উভয়পক্ষের সমোঝতার পেছনে মূল ভূমিকা তাঁর ছিল দাবি করে তিনি বলেন, এই সমোঝতার দ্বারা ঐক্যপ্রক্রিয়ার ২০ ভাগ কাজ এগিয়েছে। এখনও আরও অনেক কাজ বাকি আছে। আমরা যদি ইজতেমাটা ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারি, তাহলে ঐক্যপ্রক্রিয়ার ৫০ ভাগ কাজ হাসিল হয়ে যাবে। তবে আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দারুল উলুম দেওবন্দ ও নিজামুদ্দীন মারকাজের মধ্যে যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করা। এটা যদি করে ফেলতে পারি, তবে তাবলিগ-সঙ্কটের পুরোপুরি সমাধান হয়ে যাবে।
এ সময় সম্প্রতি তিনি কাবা শরিফের মূল ঘরে ঢোকার বিরল সুযোগ ও সৌভাগ্য লাভ করার কথা উল্লেখ করে বলেন, কাবা শরিফের ভেতরে ঢুকে বারবার যে দোআগুলো করেছি তার অন্যতম ছিল, আল্লাহ তাআলা যেন উম্মতের চলমান এ সঙ্কট ও বিভেদকে দ্রুত দূর করে দেন।
রাবেতা আলম আল-ইসলামি তাঁকে বাংলাদেশের গ্র্যান্ড মুফতি খেতাব দিয়েছে এবং তিনি আল্লামা আহমদ শফি দা. বা.-এর চেয়েও বেশিকাল ধরে বুখারির দরস দিচ্ছেন দাবি করে মাওলানা মাসউদ এ বক্তব্যে আরও বলেন, ঐক্যপ্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সফল করতে উলামা ও সাদপন্থী উভয়পক্ষের সাধারণ তাবলিগিদেরকে কোনো ধরনের প্রোপাগাণ্ডা ছড়াতে কিংবা বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকতে হবে। দুই পক্ষের মধ্যে কোনো জায়গায় বিবাদ সৃষ্টি হলেও তা চেপে রাখার এবং এর মীমাংসার জন্য দরকার পড়লে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
চলমান সঙ্কটের পেছনে জামায়াত-শিবির মূল কলকাঠি নাড়ছে দাবি করে এ ধরনের ‘মুনাফিকুন’ থেকে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ। এ সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকেও সতর্ক থাকতে বলেন তিনি। ফেসবুককে ‘ফেতনার কিতাব’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আজকের এ সঙ্কটের মূল কারণ হচ্ছে ফেসবুক। এখানে নানা কিসিমের মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো হয় এবং এ থেকে মানুষ বিভ্রান্তির শিকার হয়।
গত ১ ডিসেম্বর টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে অবস্থানরত উলামায়ে কেরাম, তালাবা ও তাঁদের অনুসারী সাধারণ তাবলিগি সাথিদের ওপর সাদপন্থীদের বর্বর হামলা তাবলিগের কেউ করেনি বরং ‘মুনাফিকুন’ জামায়াত-শিবির ও এদের দ্বারা প্রভাবিত কিছু বিভ্রান্ত লোক করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, আলেম এবং সাদপন্থী—উভয়পক্ষেই এই ধরনের কিছু ‘মুনাফিকুন’ ঢুকে পরষ্পরের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে হাঙ্গামা বাঁধিয়েছে। হাঙ্গামায় প্রকৃত তাবলিগিদের কেউ অংশগ্রহণ করেনি।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা গেছে হামলার দিন ভোর রাতে মাওলানা মাসউদের মাদরাসা জামিয়া ইকরার সামনে থেকে বাস বোঝাই করে সাদপন্থী তাবলিগিদের কিছু লোক টঙ্গী ইজতেমা মাঠ দখল করতে রওনা হচ্ছে। কিন্তু সেই ভিডিওটি যিনি ধারণ করেছিলেন তাঁর নাম উল্লেখ করে তাঁকে ও তাঁর বাবাকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করে মাওলানা মাসউদ দাবি করেন, সেদিন তিনি মাদরাসায়ই ছিলেন না। এবং ইকরা থেকে এ রকম কোনো দল টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে যায়নি।
তবে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ইকরার এক ছাত্র ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের কাছে সে-সময় এই ভিডিওর সত্যতা স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, এদের মধ্যে ইকরা মাদরাসার ছাত্র-উস্তাদ কেউ ছিলেন না। তবে আগের রাতে এই গ্রুপ—দুই শ’র মতো হবে সংখ্যায়—ইকরা মাদরাসা মসজিদে রাতযাপন করেছেন এবং এখান থেকে ১ ডিসেম্বর ভোর রাতে তাঁরা টঙ্গীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।
আরও পড়ুন : যে কারণে টঙ্গী সংঘর্ষের দায় এড়াতে পারবেন না ফরীদ উদ্দীন মাসউদ
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ উঁচু পর্যায়ের একজন আলেম এবং দারুল উলুম দেওবন্দের মেধাবী ও কৃতি ফাজিল হওয়া সত্ত্বেও উলামায়ে কেরামের সঙ্গে সাদপন্থী তাবলিগিদের চলমান এ সঙ্কটে তাঁর এমন দ্বিমুখী অবস্থান সাধারণ তাবলিগিদের বিভ্রান্ত করছে বলেই মনে করছেন বোদ্ধা সমাজ।
