যে কারণে টঙ্গী সংঘর্ষের দায় এড়াতে পারবেন না ফরীদ উদ্দীন মাসউদ

হাম্মাদ রাগিব :

গত ১ ডিসেম্বর টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে সংঘটিত সাদপন্থী তাবলিগিদের সন্ত্রাসী হামলার পেছনে ঘুরেফিরে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদের নামটা উচ্চারিত হচ্ছে বারবার। হামলার পেছনে তাঁর পরোক্ষ ইন্ধন রয়েছে বলে মন্তব্য করছেন অনেকে। তাবলিগ প্রশ্নে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ জমহুর উলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশের সাদপন্থীদের সমর্থন করে আসছিলেন বিরোধের শুরু থেকেই।

গত ১ ডিসেম্বর টঙ্গীতে হামলার দিন খুব ভোরে তাঁর মাদরাসা জামিয়া ইকরা থেকে বেশ কয়েকটি বাস ভর্তি হয়ে ইজতেমা ময়দানের উদ্দেশ্যে যাওয়ার অভিযোগ আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত একটি লাইভ ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, জামিয়া ইকরার গলির মুখে বেশ কয়েকটি বাস দাঁড়িয়ে আছে। দলে দলে লোকজন গাড়িতে উঠছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইকরার একজন ছাত্র ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের কাছে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন।

তবে তাঁর দাবি, সেখানে ইকরার কোনো ছাত্র-শিক্ষক ছিলেন না। বরং ইকরা মাদরাসা-মসজিদে আগের রাতে সাদপন্থী চার শতাধিক তাবলিগি সাথি রাত্রিযাপন করে, ভোরে তারাই সেখান থেকে বাসযোগে টঙ্গীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। এই ঘটনা থেকে অভিযোগ উঠে, আলেম-তালাবাদের ওপর হামলাকারীদের ইন্ধনদাতাদের মধ্যে মাওলানা মাসউদও আছেন। নাহলে তাঁর মাদরাসা থেকে হামলার উদ্দেশ্যে কয়েকটি বাস ভর্তি হয়ে লোকজন যায় কীভাবে?

অভিযোগটা আরও পাকাপোক্ত হচ্ছে গত কয়েকদিনে গণমাধ্যমকে দেওয়া তাঁর বক্তব্য-বিবৃতি থেকে। হামলার পরদিন গণমাধ্যমে প্রচারিত এক ভিডিও-সাক্ষাৎকারে তিনি চলমান এ বিরোধের কারণকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন। তাবলিগ জামাতের চলমান এ বিরোধের মূল কারণ বিতর্কিত আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভির শরিয়াহ-বিরোধী বিভিন্ন বক্তব্য ও কার্যকলাপ। উলামায়ে কেরাম মূলত এ জন্যই সাদ সাহেবের বিরোধিতা করছেন এবং তাঁর অনুসরণ থেকে সাধারণ তাবলিগি সাথিকে বিরত থাকার কথা বলছেন। কিন্তু মাওলানা মাসউদ কারণ হিসেবে বলছেন ভিন্ন কথা।

ভিডিও-সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তাবলিগ জামাতে একটা ঐক্য ছিল, ইসলামের মৌলিক কথাবার্তার ওপর তাঁরা মানুষকে দাওয়াত দিতেন, কিন্তু ইদানীং এসে তাঁদের নেতৃত্বের পদ্ধতি নিয়ে একটা বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং তা চরম আকার ধারণ করে। এক পক্ষ চায় শুরা পদ্ধতির নেতৃত্ব, আর আরেক পক্ষ চায় একক আমিরের নেতৃত্ব। দুটো পদ্ধতিই শরিয়াহ-স্বীকৃত। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে ওয়াজাহাতি-এতাআতি নামে দুটি পক্ষ আজ মারমুখো অবস্থানে। এটা দুঃখজনক। আর এটা কেবল বাংলাদেশে, বাইরের বিশ্বে আর কোথাও এমন সমস্যা নেই।

এ দিকে গতকাল (৪ ডিসেম্বর) তাঁর একটি বিবৃতি এসেছে কোনো কোনো জাতীয় দৈনিকে। সেখানে তিনি মাওলানা সাদ কান্ধলভিকে ডিফেন্ড করে রাখঢাক ছাড়াই বলেছেন, ভারতের প্রখ্যাত ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দ মাওলানা সাদ কান্ধলভিকে ভালোবাসে। দেওবন্দ মাওলানা সাদ-এর বিরুদ্ধে কোনো ফতোয়া দেয়নি বরং তাকে সতর্ক করেছে। দাওয়াতের ক্ষেত্রে মাওলানা সাদ কান্ধলভি মাগলুবুল হাল অবস্থায় আছেন। মানসুর হাল্লাজ যেমন মারেফতের ক্ষেত্রে মাগলুবুল হাল ছিলেন মাওলানা সাদ কান্ধলভি তেমনিভাবে দাওয়াতের ক্ষেত্রে মাগলুবুল হাল ছিলেন। আর যারা মাগলুবুল হাল হয় তাদের কিছু ভুলত্রুটি হয়েই থাকে। যেমন মানসুর হাল্লাজ ‘আনাল হক, আনাল্লাহ’ বলেছেন।’

তাঁর এ রকম বক্তব্যে কওমি ছাত্র-শিক্ষকদের মনে তাঁর প্রতি বিরাজ করছে নানা রকমের ক্ষোভ। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে ছোট বড় প্রায় সকলেই মাওলানা মাসউদ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করছেন। ঢাকা উত্তরার আল-মানহাল মডেল মাদরাসার পরিচালক মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ আজহারির কাছে মাওলানা মাসউদ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ক্ষোভের কারণে প্রথমে তিনি কোনো মন্তব্য করতেই রাজি হননি।

ফাতেহের বিশেষ প্রতিবেদকের পীড়াপীড়িতে অবশেষে তিনি বলেন, ‘ফরীদ উদ্দীন মাসউদ বড় আলেম, কওমি মাদরাসার সন্তান, দারুল উলুম দেওবন্দের ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিলেন, এতদিন তিনি যত যা-ই করুন, ১ তারিখে ইজতেমা মাঠে কওমি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর যে নির্মম অত্যাচার করা হলো, যারাই করুক, তিনি তো অন্তত প্রতিবাদটুকু করতে পারতেন। তিনি দেশের শীর্ষ আলেম। অন্যান্য আলেমদের সঙ্গে বিরোধ থাকুক, সাধারণ আলেম-তালাবারা এই যে নৃশংসতার শিকার হয়ে আজ হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছে তাদের প্রতি অন্তত একটু সহমর্মিতাও তো দেখাতে পারতেন। কিন্তু না, তিনি উল্টো আরও সাদ সাহেবের পক্ষাবলম্বন করে পত্রিকায় বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছেন। নিজের সন্তানতুল্য কওমি ছাত্র-শিক্ষকরা নির্মমভাবে নির্যাতিত হবার পরও যিনি বসে বসে তামাশা দেখেন, বরং সে নির্যাতনের পেছনে তাঁর ইন্ধন জোগানোরও অভিযোগ ওঠে, এ রকম ব্যক্তির ব্যাপারে মন্তব্য করার আর কী থাকে?’ কথাগুলো বলতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে কেঁদে ফেলেন মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ আজহারি।

এ সব অভিযোগ-অনুযোগ এবং টঙ্গী হামলায় তাঁর সম্পৃক্ততা জানার জন্য মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর। তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে ফাতেহের বিশেষ প্রতিবেদক যোগাযোগ করেন তাঁর বড় ছেলে মাওলানা সদরুদ্দীন মাকনুনের সঙ্গে। তিনি জানান, ফরীদ উদ্দীন মাসউদ বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। সপ্তাহখানেক পর দেশে ফিরবেন। টঙ্গী সংঘর্ষে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ বা তাঁর বলয়ের লোকজনের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। এবং ফাতেহের প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা শেষ না করেই ফোন কেটে দেন। পরে আরও কয়েকবার একই নাম্বারে কল দিয়ে তাঁকে আর পাওয়া যায়নি।