
রাগিব রব্বানি
সার্বজনীন জীবনব্যবস্থা ইসলামের ওপর আরোপিত নাস্তিক ও ইসলাম-বিদ্বেষীদের বিভিন্ন যুক্তি খণ্ডন করে বিগত কয়েক বছর ধরে আলোচনায় আছেন ইসলাম বিষয়ক লেখক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ আজাদ। ২০১৭ সালের একুশে বইমেলায় এরকমই কিছু যুক্তিখণ্ডনমূলক গল্প দিয়ে বিশেষ আদলে সাজানো বই ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ প্রকাশিত হলে পাঠকমহলে অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে। প্রকাশিত হবার অল্পকদিনের ভেতর বইটির হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। এতে বইটি বইমেলার বেস্টসেলার বইগুলোর তালিকার শীর্ষে উঠে আসে। নাস্তিক্যপাড়ায়ও বেশ ঝড় তুলে বইটি। আরিফ আজাদ এজন্য নানাভাবে নাস্তিকদের ট্রলেরও শিকার হয়েছেন।
তার পর থেকেই মূলত আরিফ আজাদের এই জনপ্রিয়তা। প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদের পর আরিফ আজাদ আরও কয়েকটি বই লিখিছেন নাস্তিকদের যুক্তিখণ্ডনকে উপজীব্য করে। অনিবার্যভাবে সেগুলোও পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। এ বছরের বইমেলায় তিনি এনেছেন প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদের সিক্যুয়াল ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ ২’।
আরিফ আজাদের বইগুলো নাস্তিক্যবাদের মুকাবেলায় তাদের যুক্তিখণ্ডনকে উপজীব্য করে লেখা হলেও বইগুলোতে কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যাগত বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে বলে ধর্মবিষয়ে বিজ্ঞ ও আলেম পাঠকরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গত দুই বছরে পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক সমালোচনাও হয়েছে। সম্প্রতি সাজিদ-২ প্রকাশিত হবার পর আবারও এই ধরনের আলোচনা-সমালোচনায় মুখর অনলাইন-পাড়া। বিগত বইগুলোর মতো এ বইয়েও কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যাগত বেশ কিছু বিচ্যুতি তুলে এনেছেন বিজ্ঞ ও আলেমশ্রেণির পাঠকেরা। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে এতটাই জল ঘোলা হয়েছে, আরিফ আজাদের পক্ষে-বিপক্ষে দুটো দল হয়ে গেছে। একদল অন্ধভাবে তাঁর বইয়ের সাফাই গাইছেন, আরেক দল অন্ধভাবে তাঁর ব্যাপারে তীর্যক মন্তব্য করছেন।
এ ব্যাপারে তরুণ অনুবাদক ও গবেষক আলেম মাওলানা আবদুল্লাহ আল মাসউদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘সাজিদ-২ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।… যারা সমালোচনা করছেন তাঁদের সমালোচনা প্রথমত দুই কিসিমের।
‘প্রথম হলো, যাঁরা নাস্তিকতাকে খণ্ডন করে লেখা বইপত্রের সমালোচনা করছেন। নির্দিষ্টভাবে প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ তাদের আলোচ্য বিষয় না।… দ্বিতীয় কিসিমের সমালোচনা হলো নির্দিষ্টভাবে সাজিদ-২ কে নিয়ে। তাঁরা নাস্তিকতা খণ্ডনে লিখিত বইপত্রের ঢালাও সমালোচনা করছেন না, বরং নির্দিষ্টভাবে এই বইটির কিছু বিষয় নিয়ে বলছেন।’
‘যাঁরা এর সমালোচনা করছেন তাঁদের কিছু সমালোচনা সম্পূর্ণ সঠিক ও বাস্তব। আর কিছু আছে এমন যে, সেটাকে সমালোচনার বস্তু না বানালেও হয়। তবুও তাঁরা সমালোচনাকে হয়তো প্রলম্বিত করার জন্য সম্পূর্ণ সঠিক সমালোচনার সাথে এগুলোকেও যুক্ত করে দিচ্ছেন।
‘এখন এই সমালোচনাগুলোকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমাদের অনেক ভাই লেজেগোবরে অবস্থা করে ফেলছেন।… একপক্ষ চোখ বন্ধ করে প্রতিটা সমালোচনার সবটুকুকে সমর্থন দিচ্ছেন। আরেক পক্ষ চোখ বন্ধ করে সমালোচনার সবটুকুকে প্রত্যাখ্যান করছেন। তাঁরা একে দেখছেন হিংসুকদের হিংসা, ‘হুজুরদের’ পৌরোহিত্য, গায়ে জ্বলুনি, ইসলামের ঠিকাদারি নেওয়া ইত্যাদি নানান দৃষ্টিকোণ থেকে। অথচ যেই পয়েন্টগুলো নিয়ে কথা হচ্ছে, তাদের উচিত ছিল সেটা যাচাই করে দেখা যে, এর কতটুকু আদতেই আপত্তিকর আর কতটুকু নয়। যেগুলো আপত্তিকর সেগুলোকে আপত্তিকর বলে মেনে নিয়ে সংশোধন করলেই হয়ে গেল, ব্যস! কারণ ভুল হলে তা স্বীকার করে নেওয়া এবং মেনে নেওয়ার মধ্যেই প্রকৃত কামিয়াবি ও সম্মান। ভুলস্বীকার মানুষকে কখনো ছোট করে না, আরও বড় করে।’
এদিকে সাজিদ-২ নিয়ে কয়েকদিন ধরে এই বিতর্ক চলতে থাকলে এবং বইটির বেশ কয়েক জায়গা সমস্যাপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হলে গতকাল এ বিষয়ে আরিফ আজাদ তাঁর ফেসবুক টাইম লাইনে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লিখেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। কিছু প্রিয় ভাই সাজিদ-২ এর তিন নম্বর গল্পের একটি প্যারা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, উক্ত প্যারা থেকে অনুমান করা যায় যে, এখানে কোনোভাবে জিহাদুত ত্বলাব (আক্রমণমূলক জিহাদ)-কে অস্বীকার করা হয়েছে৷ তাঁদের আপত্তির ব্যাপারগুলো আমার নজরে এসেছে আলহামদুলিল্লাহ।
‘মূলত, উক্ত প্যারা ছাড়া আর কোথাও জিহাদ সম্পর্কিত কোনো আলোচনাই ছিল না। এই প্যারাতে আমি মূলত জিহাদ চলাকালীন মুসলিমদের আচরণ কী হওয়া উচিত তা-ই বুঝাতে চেয়েছিলাম। অর্থাৎ, দিফায়ি (প্রতিরক্ষামূলক) জিহাদের সময়ে অমুসলিমদের সাথে মুসলিমদের আচরণ কেমন হতে পারে সেটা বোঝানোই আমার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু, এটা দ্বারা কোনোভাবে জিহাদুত ত্বলাবকে অস্বীকার করা আমার উদ্দেশ্য ছিলো না।
‘হতে পারে আমার বর্ণনাভঙ্গির দুর্বলতার কারণে উক্ত প্যারায় একটু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। আমার এই দুর্বলতার জন্য আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। বইটির পরবর্তী মুদ্রণে এটা ঠিক করা হবে, ইন শা আল্লাহ। আমি আমার পক্ষ থেকে যাবতীয় সংশোধনী প্রকাশনী বরাবর হস্তান্তর করে দিয়েছি আলহামদুলিল্লাহ।’
উক্ত স্ট্যাটাসে আরিফ আজাদ সাজিদ-২-এ উত্থাপিত একাধিক ভুল থেকে একটি ভুলের স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, যেটা বইয়ের ৪৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ধরা পড়েছিল। কিন্তু ৪৯ নম্বর পৃষ্ঠায় সাজিদের মুখে জিযিয়ার পরিচিতি দিতে গিয়েও ভুল পরিচয় উপস্থাপন করেছেন বলে বিজ্ঞ পাঠকের অভিযোগ, সে ব্যাপারে আরিফ আজাদ কিছু বলেননি। অনুরূপ তাঁর পূর্বের বইগুলোতেও এমন ব্যাখ্যাগত বেশ কিছু সমস্যার কথা সমালোচিত হয়েছে বিগত দুই বছরে, কিন্তু আরিফ আজাদকে সে ব্যাপারে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
সচেতন মহল মনে করছেন, নাস্তিক্যবাদীদের যুক্তিখণ্ডনে যে অবদান রাখছেন আরিফ আজাদ, তা অস্বীকারের জো নেই, কিন্তু বিভিন্ন যুক্তির খণ্ডন এবং উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বেশ কিছু জায়গায় যে পদস্খলনের শিকার হচ্ছেন, তা থেকে উত্তরণের জন্য বিজ্ঞ আলেমদের দিয়ে তাঁর লেখাগুলো যাচাই করিয়ে নেয়া জরুরি। অন্যথায় এমন স্খলন অব্যাহত থাকলে সাধারণ পাঠক শ্রেণির জন্য ব্যাপারটা যেমন ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে, তেম্নি ইসলামের খেদমত করতে লেগে পক্ষান্তরে ইসলামের ক্ষতিই করে বসবেন তিনি।
