১৬ মার্চ কি মুক্তি পাবেন আফিয়া সিদ্দিকি?

মুসান্না মেহবুব

দীর্ঘদিন ধরে মার্কিনিদের হাতে অমানবিকভাবে বন্দী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুসলিম স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. আফিয়া সিদ্দিকি আগামীকাল (১৬ মার্চ) মুক্তি পাচ্ছেন বলে একটি সংবাদ প্রচারিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে গতকাল Afifa Movement (official) পেজে পাকিস্তানের একটি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া আফিয়া সিদ্দিকির বোন ড. ফওজিয়া সিদ্দিকির একটি সাক্ষাৎকারের ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করা হয়েছে। ভিডিও ক্লিপটিতে দেখা যায়, ড. ফওজিয়া সিদ্দিকি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলছেন, গত জানুয়ারিতেই আফিয়া সিদ্দিকিকে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টালবাহানা করে দেওয়া হয়নি। ১৬ মার্চ তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে কি-না এ নিয়েও সংশয় রয়েছে আফিয়ার পরিবারের। তবে তাদেরকে এ ব্যাপারে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, ১৬ মার্চ আফিয়াকে মুক্তি দেওয়া হবে।

এই মুক্তির পেছনে কাদের অবদান জানতে চাইলে ড. ফওজিয়া বলেন, আমাদের পরিবারের সর্বাত্মক চেষ্টার ফলেই আমরা এতদূর এগোতে পেরেছি। বাকি কী হয় এখনও বলা যাচ্ছে না।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এ ব্যাপারে কোনো চেষ্টা চালাচ্ছেন কি-না, এ বিষয়ে আফিয়া সিদ্দিকির বোন বলেন, তিনি বা তাঁর সরকার যদি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতেন তবে গত জানুয়ারিতেই আফিয়া সিদ্দিকি মুক্ত হয়ে যেতেন।

ইমরান খান অবশ্যি বারবার বলে আসছেন, নির্যাতিতা এই প্রতিভাবান মুসলিম রমণীর মুক্তির ব্যাপারে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তান নয়, বরং তালেবানের সঙ্গে আমেরিকার শান্তি আলোচনায় বন্দীবিনিময় চুক্তির আওতায়ই মুক্তি পাবেন ড. আফিয়া সিদ্দিকি। তবে আফিয়ার পরিবার তালেবান-সংশ্লিষ্টতার এই ব্যাপারটাকে নানাভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে। এটা আফিয়ার নিরাপত্তা এবং অন্য নানাবিধ কারণে হতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

কে এই আফিয়া সিদ্দিকি?
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন মুসলিম স্নায়ুবিজ্ঞানী তিনি। হাফেজে কুরআন, মুসলিম সংগঠক এবং মুসলিম নারী স্কলারও। পিএইচডি ডিগ্রিধারী এই মুসলিম রমণীকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ২০০৩ সালে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আল-কায়েদার সাথে যোগাযোগ থাকার অভিযোগ এনে পাকিস্তানের করাচির রাস্তা থেকে তাঁর তিন সন্তানসহ গুম করে।

আফগানিস্তানের সামরিক ঘাঁটিতে তাঁকে ৫ বছর বন্দী করে অমানুষিক বর্বরতাপূর্ণ নির্যাতন চালানো হয় হয়। সেখানে তাঁকে দৈনিক ৩/৪ বার করে ধর্ষন করা এবং বিবস্ত্র করে পবিত্র কুরআনের ছেঁড়া পাতার উপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে কাপড় নিতে বলার মতো অমানবিক নির্যাতনেরও অভিযোগ আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের শারিরীক নির্যাতন করা হতো।

আফগানিস্তানের বাগরাম কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিরা অভিযোগ করেছিলেন, নির্যাতনের সময়ে আফিয়ার আর্তচিৎকার অন্য বন্দীর পক্ষে সহ্য করাও কঠিন ছিল। নির্যাতনের মাত্রা এতবেশী ছিল যে তার গগণবিদারী চিৎকার আশ-পাশের কয়েদিরা সহ্য করতে না পেরে নির্যাতন বন্ধের দাবিতে অনশন শুরু করে।

২০০৮ সালে তাঁকে স্থানান্তর করা হয় নিউইয়র্কের এক গোপন কারাগারে। বর্তমানে তিনি পুরুষদের সাথে ওই কারাগারে বন্দী। কারাবন্দী নম্বর ৬৫০। চলমান নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিলেন ‘পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষের মধ্যে যারা ড. আফিয়া সিদ্দিকাকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে তাদেরকে অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।’ কিন্তু তিনি ক্ষমতাগ্রহণের অনেক দিন পার হয়ে গেলেও তাঁর সে প্রতিশ্রুতি আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

আদালতে মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যার চেষ্টার অভিযোগে ৩৮ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানীকে ৮৬ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে আফগানিস্তানে অজানা রাসায়নিক পদার্থ ও হামলার পরিকল্পনার নোটসহ গ্রেফতার দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে ৭টা মামলা দায়ের করা হয়। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়। সরকারপক্ষের আইনজীবী দাবি, গ্রেফতারের সময় তার কাছে গুরুত্বপূর্ন স্থানের মানচিত্র পাওয়া যায়।

২০১০ সালে মার্কিন আদালত কর্তৃক ড. আফিয়াকে ৮৬ বছর কারাদন্ডের রায় ঘোষনা করার পর পাকিস্তানের রাস্তায় বিক্ষোভ হয়। তিন সন্তানের জননী হার্ভার্ড পিএইচডিধারী আফিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সন্তাসবিরোধী যুদ্ধের আর একটি নির্দোষ শিকার। বিক্ষোভকারীরা বলেন, ‘বিশ্ব জুড়ে সব জায়গায়তেই অভিযুক্তরা “বেনেফিট অব ডাউট” বা সন্দেহাতীতভাবে দোষী প্রমানণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত নির্দোষ বলে বিবেচিত হয়। ফলে সকল সুবিধা পায়। কিন্তু ড. আফিয়া তা পাননি বরং নির্যাতনের শিকার হন।’

তাঁর ওপর অমানবিক নির্যাতনের বিষয়টি আলোচিত হয় কারাগার থেকে তাঁর বহুল আলোচিত চিঠিটি লেখার পর। চিঠিটিতে আফিয়া জানান, তাঁর ওপর শারীরিক, পাশবিক নির্যাতনের পাশাপাশি একের পর এক তাঁকে ধর্ষণ করা হয়। তাঁর একটি কিডনিও বের করে ফেলা হয়েছে, ফলে তিনি এখন আর হাঁটতে পারেন না।

আগের সংবাদএকদিনের জন্য নিউজিল্যান্ডের সকল মসজিদ বন্ধ রাখার নির্দেশ
পরবর্তি সংবাদনিউজিল্যান্ডের মসজিদ আল নুরে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তা বর্বরোচিত : আল্লামা আহমদ শফী