কেন বাড়ছে ইসলামোফোবিয়া, যা বলছেন আলেমরা

রাগিব রব্বানি

নিউজিল্যান্ডের দুটো মসজিদে গতকাল জুমার নামাজ আদায়কালে মুসল্লিদের ওপর ঘটে গেল ইতিহাসের নৃশংসতম তাণ্ডব। ইসলামোফোবিয়ায় আক্রান্ত কয়েক পশ্চিমা খ্রিষ্টান যুবকের চালানো এ তাণ্ডবকে পশ্চিমা নেতৃত্ব ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে স্বীকার করলেও একে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে প্রমাণ করার কোশেশ করছে। একই সঙ্গে হামলাকারীদের বর্ণবাদী এবং শেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী বলে পশ্চিমা ও পশ্চিমা ভাবধারা থেকে প্রভাবিত মিডিয়াগুলো তাদের আসল পরিচয় গোপন করারও চেষ্টা করছে।

কিন্তু প্রধান হামলাকারী হিসেবে চিহ্নিত ব্রেন্টন টারান্টের বক্তব্য, তার এ হামলার কারণ দর্শানো এবং হামলায় ব্যবহৃত বন্দুকের গায়ে লেখা বিভিন্ন নাম ও চিহ্ন থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, সে বা তার সাথিবর্গ যে হামলা চালিয়েছে গতকাল, তা কেবল বর্ণবাদ ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের হুজুগ থেকেই করা হয়নি, বরং ইসলাম-বিরোধী খ্রিষ্ট ক্রুসেডের ইতিহাস থেকে প্রভাবিত ও ‘উজ্জীবিত’ হয়েই করা হয়েছে।

আরও পড়ুন : খ্রিষ্টান সন্ত্রাসীর বন্দুকে লেখা ছিল নব্যক্রুসেডের ইশতেহার

গতকাল নারকীয় এই তাণ্ডবের কয়েক ঘণ্টার মাথায় লন্ডনেও ঘটেছে এমন আরেকটি আক্রমণের ঘটনা। পূর্ব লন্ডনের একটি মসজিদের পাশ দিয়ে তিন খ্রিষ্টান যুবক যাওয়ার সময় মসজিদের এক মুসল্লির মাথায় তারা হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছে এবং ইসলাম-বিরোধী নানা স্লোগান দিয়েছে।

দেশে দেশে এই যে ইসলাম-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে, এমনকি বাংলাদেশের মতো মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রেও, এর কারণটা আসলে কী? জানতে চেয়েছিলাম দুজন আলেমের কাছে।

আরও পড়ুন : গণপরিসরে ইসলামভীতি, ধর্মীয় পোশাক খুলতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে

বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মুফতি জহির ইবনে মুসলিম বলেন, পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতে যে ইসলাম-বিদ্বেষ ছড়িয়েছে, সেটার প্রথম কারণ হলো এ সমস্ত দেশে মুসলিম ও ইসলামগ্রহণকারীদের সংখ্যাবৃদ্ধি। মানুষ ব্যাপকভাবে সেখানে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। যার ফলে ইসলামের যারা চিরশত্রু, তাদের মনে একটা আতঙ্ক ঢুকে গেছে, যে, এভাবে যদি মুসলিমদের সংখ্যা বাড়ে, তবে তো খুব শিগগিরই মুসলিমরা সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠবে।

বিভিন্ন জরিপে এই আশঙ্কাটার প্রতিফলনও দেখেছে তারা। আমেরিকার একটি সংস্থার জরিপে তো ইতিমধ্যে বলাও হয়েছে যে আগামী ২০৭০ সালের মধ্যে পশ্চিমা দেশগুলোতে খ্রিষ্টানদের বদলে মুসলিমরাই হয়ে উঠবে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

এই আশঙ্কা ও আতঙ্ক থেকেই তারা মুসলিমদের হেনস্থা, মারধর এবং মসজিদে হামলার পথ বেছে নিয়েছে। যাতে মানুষ এটা মনে করে মসজিদমুখী বা ইসলামের প্রতি আগ্রহী না হয়, যে, মসজিদে গেলে কিংবা মুসলিম হলে নিজের জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।

মুফতি জহির ইবনে মুসলিম এ ছাড়া আরও একটি কারণ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমাদের মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ছিলেন বর্ণবাদের ঘোর বিরোধী। এবং ইসলাম বর্ণবাদের যাবতীয় পার্থক্য মুছে দিয়েছে। ইসলামের এই বর্ণবাদ-বিরোধী অবস্থানের কারণেও পশ্চিমা বর্ণবাদীরা ইসলাম-বিদ্বেষে মত্ত হয়েছে।

আর বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের যে রাষ্ট্রগুলোতে ইসলাম-বিদ্বেষের ছড়াছড়ি দেখা যায়, সেটা পশ্চিমা সংস্কৃতির কুপ্রভাবেরই পরিণতি। এ সমস্ত দেশে একশ্রেণির মানুষ এমন আছে, যারা পশ্চিমাদের অনুকরণকে নিজেদের জীবনের আবশ্যিক কাজ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এবং এদের মাধ্যমেই মূলত এখানে ইসলাম-বিদ্বেষ চর্চিত হয়।

চুয়াডাঙ্গার দারুল উলুম মাদরাসার প্রধান মুফতি মাওলানা মুস্তফা কামাল কাসেমি বলেন, নিউজিল্যান্ডের মসজিদে গতকাল যে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছে খ্রিষ্টান জঙ্গিরা, এটা গত দশক দুয়েক ধরে চলমান পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ইসলাম-বিদ্বেষের নগ্নপ্রকাশ।

কিন্তু কেন এই ইসলাম-বিদ্বেষের ব্যাপকতা, এ বিষয়ে তিনি মুফতি জহির ইবনে মুসলিমের মতোই জানান, ইসলামের প্রতি মানুষের ঝোঁক ও আগ্রহের কারণেই ইসলাম-বিরোধীরা এই বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে।

তবে গতকালের ঘটনাকে তিনি কেবল ইসলাম-বিদ্বেষের প্রভাবের পরিণতি এবং বিচ্ছিন্ন কোনো হামলা বলতে রাজি নন, বরং এর পেছনে ইসলাম-বিরোধী বড় ও শক্তিশালী পক্ষের পরোক্ষ ইন্ধন এবং মদদ রয়েছে বলে মনে করেন।

মুফতি মুস্তফা কামাল কাসেমি বলেন, হামলাকারীরা পুরো হামলার ঘটনা ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করেছে, ২০ মিনিটেরও বেশি সময় ছিল যার ব্যাপ্তি, কিন্তু নিউজিল্যান্ডের প্রশাসন ঘটনাস্থলে হাজির হলো হামলা শেষ হবার আরও ২০ মিনিট পর। নিউজিল্যান্ডের মতো একটা উন্নত রাষ্ট্রে এতটা সময় প্রশাসনের বেখবর থাকার কথা না। এ থেকে কি আমরা ধরে নিতে পারি না, নিউজিল্যান্ডের প্রশাসনের নীরব সম্মতি এবং জ্ঞাতসারেই সংগঠিত হয়েছে এই নৃশংস মুসলিম গণহত্যা?

হত্যাকাণ্ডের পর পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর প্রধানেরা দুঃখপ্রকাশ এবং নিহতদের পরিবারকে সমবেদনা জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে নানা কায়দায় বোঝাতে চেষ্টা করেছেন, এটা বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা। কিন্তু আসলেই কি তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল? হত্যাকাণ্ডের হত্যাকারীদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত বন্দুকের গায়ের লেখা কী বার্তা দেয় আমাদের? দোষীদের গ্রেপ্তার, আদালতে উত্থাপনে রাখঢাক করা এবং তাদের ছবি গণমাধ্যমে অস্পষ্ট করে প্রকাশ করার দ্বারা কি তাদের প্রতি নিউজিল্যান্ড কিংবা পশ্চিমা নেতৃত্বের এক ধরনের সহযোগিতাই পরিস্ফুটিত হচ্ছে না?

মুফতি মুস্তফা আরও বলেন, পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো কিংবা পুরো বিশ্বে এই যে ইসলাম-বিদ্বেষ, মুসলিম নির্যাতন আর গণহত্যা চলছে, এটা আমাদের গাফলতিরই পরিণতি। আমরা ইসলামের মৌলিক চেতনা থেকে দূরে সরে পড়ার কারণে এবং বিশ্ব মুসলিম নেতৃত্বের অনৈক্যের ফলেই এমনটা ঘটছে। যতদিন আমরা ইসলামের মূল চেতনা হৃদয়ে লালন ও কর্মে বাস্তবায়ন করতে না পারব এবং যতদিন না মুসলিম নেতৃত্ব ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে একতাবদ্ধ হতে পারবে, ততদিন অবধি এ নিপীড়ন আমাদের সয়ে যেতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

আগের সংবাদতালেবানের সঙ্গে শান্তিআলোচনা, সসম্মানে আফগান ছাড়ার পথ খুঁজতে মরিয়া আমেরিকা
পরবর্তি সংবাদডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু করার নির্দেশ ছিল: প্রধানমন্ত্রী