আবুল মনসুর আহমদ : বিস্মৃত মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী

কাজী মাহবুবুর রহমান

আজ ১৮ মার্চ উপমহাদেশের খ্যাতনামা সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদের ৩৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। আবুল মনসুর আহমদ একাধারে রাজনীতিবিদ, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদাধিকারী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং খ্যাতিম্যান লেখক ছিলেন। মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদে বিশ্বাসী এই লেখক ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার ধানীখোলা গ্রামে ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনেই তাঁর সাহিত্যসাধনা শুরু হয়। ঐ সময় আল-ইসলাম, সওগাত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা প্রভৃতি সাময়িকীতে তাঁর বহু গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। বিএ পাস করার পর তিনি খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন এবং সাংবাদিকতা অবলম্বন করে পর্যায়ক্রমে সোলতান, মোহাম্মদী, খাদেম, দি-মুসলমান-এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। তিনি আইন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯২৯ সালে ময়মনসিংহ জজকোর্টে আইনব্যবসা শুরু করেন। পরে ১৯৩৯ হতে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত পর পর দৈনিক কৃষক, নবযুগ ও ইত্তেহাদের সম্পাদকরূপে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।

১৯৪৭-৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে আবুল মনসুর আহমদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির ব্যাপক বিস্তার ঘটানোর লক্ষ্যে তমদ্দুন মজলিশ-এর উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বলিয়াদী প্রিন্টিং প্রেস থেকে ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা না উর্দু’ পুস্তিকাটি প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে আবুল মনসুর আহমদ পূর্ব-বাঙলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে পূর্ব-বাঙলায় মন্ত্রিসভা গঠিত হলে তিনি জনস্বাস্থ্য বিভাগের মন্ত্রী হন।

আবুল মনসুর আহমদ সুভাষ বসুর অনুরক্ত ছিলেন। সুভাষ বসুর নেতৃত্বে তিনি কংগ্রেস আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের একজন সক্রিয় সদস্য হন। রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে খিলাফাত ও অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে তিনি কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নীতির সঙ্গে একমত হতে পারছিলেন না৷ তাঁর কাছে অসহযোগ আন্দোলনকে অবাস্তব মনে হতো। ফলে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং পরিপূর্ণভাবেই মুসলিম লীগের রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৪০ সাল থেকে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবেও কাজ করেন। মূলত তিনি কৃষক-প্রজা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আসেন। ১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাওলানা আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ছয়দিন উক্ত দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে (১৯৫৬-৫৭) তিনি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সময়ে অল্প কিছু দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর স্থলাভিসিক্তও হন।

আবুল মনসুর তাঁর সাহিত্যজীবনে ছিলেন বিশিষ্ট স্যাটায়ারিস্ট। ফুড কনফারেন্স, আয়না, সত্য মিথ্যা–এসব গ্রন্থই তার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত তাঁর বইয়ের সংখ্যা ১৯। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর নাম ফুড কনফারেন্স, আয়না, আবে হায়াত, সত্য মিথ্যা, আসমানী পর্দা, গালিভারের সফরনামা, পাক-বাংলার কালচার, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, ছোটদের কাসাসুল আম্বিয়া (১ম ও ২য় খণ্ড), শেরে বাংলা হইতে বঙ্গবন্ধু প্রভৃতি।

বাংলার কৃষক-প্রজা আন্দোলন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে রূপান্তরের বিশ্লেষণ আবুল মনসুর আহমদের প্রথম উপন্যাস ‘জীবন ক্ষুধা’। ‘মা খাকি’ নামে তিনি আরও একটি উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর রচিত ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ আত্মকথা উপমহাদেশীয় রাজনীতির একটি বিশ্বস্ত দলিল এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বহু মূল্যবান তথ্যে সমৃদ্ধ। অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের সাহিত্যে এক মাত্র এই বইটির মাধ্যমেই রাজনৈতিক সাহিত্যের অভাব পুরণ হয়েছে।

তিনি বাঙালি ন্যাশনের নতুন ভাষার সাহিত্যের স্বপ্নদ্রষ্টা। একটি স্বাধীন দেশের জন্য তিনি একটি স্বাধীন ভাষারও স্বপ্ন দেখতেন। এবং তাঁর চরিত্রে পরিলক্ষিত হতো আধুনিক মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদ। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর চরিত্রের এই অংশটিকে প্রসংশার সাথে চিহ্নিত করেন। ১৯৭৯ সালের আজকের এই দিনে বরেণ্য এই মহান ব্যক্তি ইন্তেকাল করেন। তাঁর প্রতি বিনিম্র শ্রদ্ধা।

আগের সংবাদজ্ঞানার্জনে ‘বুদ্ধিবৃত্তি’/’আক্বল’র ভূমিকা : শায়খ আকরাম নাদভি
পরবর্তি সংবাদলন্ডনে এক কিশোরকে ইসলাম-বিদ্বেষী খ্রিষ্টানের চুরিকাঘাত