
মুসান্না মেহবুব
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে গত ১৮ মার্চ নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে পাহাড়িরা তাদের শক্তিমত্তারই জানান দিয়েছে। হামলায় এ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে মামলা না হলেও স্থানীয় বাঙালি নেতারা বলছেন, পাহাড়ি এই অঞ্চলে উপজাতিদের সন্ত্রাসী গ্রুপ জেএসএস (সন্তু লারমা) ও ইউপিডিএফ (প্রসীত) পরস্পর প্রতিপক্ষ হলেও এবার তারা এক হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে। এবং বাঘাইছড়ির ঘটনা তাদের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে।
সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস-এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এই হামলা চালিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মূছা মাতব্বর, সহ-সভাপতি হাজী কামাল উদ্দিন, সহ-সভাপতি নিখিল কুমার চাকমা। আওয়ামী লীগ নেতারা কিছু গণমাধ্যমের সমালোচনা করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে কারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হলেও বারবার বলা হচ্ছে এটা দুর্বৃত্তদের কাজ। কেন জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর নাম লেখা হচ্ছে না? তাহলে কি সাংবাদিকরা ভয় পাচ্ছেন?
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অস্থিরতা কিছুটা বিরতি দিয়ে দিয়ে গণমাধ্যমে আলোচিত হলেও অস্থিরতা এবং আতঙ্ক সবসময় লেগেই থাকে পাহাড়ি এই অঞ্চলে। একদিকে উপজাতীয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর হামলা-আক্রমণ-হত্যা, অপরদিকে খ্রিষ্টান মিশনারিদের অপতৎপরতা—এসবের ভেতর সেখানকার মসজিদ, মাদরাসা ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর কী অবস্থা, কেমন কাটছে তাদের দিনকাল—এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম সেখানে দাওয়াতি মেহনতে নিয়মিত সময় দেন এমন একজন দাঈ আলেমের সঙ্গে। নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের সঙ্গে আলাপ করতে রাজি হন তিনি। আমরা ধরে নিলাম তাঁর নাম মাওলানা আবদুল্লাহ।
মাওলানা আবদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেছিলাম পার্বত্য চট্টগ্রামের মসজিদ-মাদরাসার কী অবস্থা এবং বাঙালি মুসলমানরা কতটা নিরাপদ সেখানে? উত্তরে তিনি জানান, আসলে এই অঞ্চলের বিষয়টা খুব ভয়াবহ। মুসলিম বাঙালিরা সারাক্ষণ একটা আতঙ্কের ভেতর দিয়ে সময় পার করেন। উপজাতীয় সন্ত্রাসী বাহিনী, যাদেরকে ‘শান্তি বাহিনী’ নামে ডাকা হয়, এদের ভয়ে সারাক্ষণ মুসলমানদের তটস্থ থাকতে হয়। পাঞ্জাবি-টুপি বা ইসলামি লেবাস পরতে ভয় পান পাহাড়ের একটু ভেতর দিককার মুসলমানেরা। এমনকি সেখানকার যাঁরা ঢাকা-চট্টগ্রামের বিভিন্ন মাদরাসায় পড়াশোনা করেন, বাড়ি গেলে তাঁদেরকে ‘শান্তি বাহিনী’র ভয়ে পাঞ্জাবি-টুপি ছেড়ে শার্ট-প্যান্ট পরে থাকতে হয়।
‘শান্তি বাহিনী’র ভয়ে কতটা আতঙ্কগ্রস্ত সেখানকার স্থানীয়রা তা জানাতে গিয়ে মাওলানা আবদুল্লাহ আরও বলেন, কিছুদিন আগে আলিকদম নামক এলাকায় আমরা একটা মসজিদ নির্মাণ করেছি। উদ্বোধনের দিন স্থানীয় একজনকে আজান দিতে বললাম মসজিদের মাইকে। আমার কথা রক্ষার্থে সে আজান দেওয়া শুরু করল ঠিক, কিন্তু তার পুরো শরীর কাঁপছিল। কণ্ঠেও পড়েছিল সে কাঁপুনির প্রভাব। আজান শেষে এমনটা কেন হলো জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, শান্তিবাহিনী যদি জানতে পারে আমিই আজান দিচ্ছি, তবে আমাকে হয়তো ব্রাশফায়ারের মুখোমুখি হতে হবে।
সেখানে খ্রিষ্টান মিশনারিদের তৎপরতা কতটা ব্যাপক জানতে চাইলে মাওলানা আবদুল্লাহ জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি এলাকাই আমার ঘোরা হয়েছে। দাওয়াতি কাজে এই এলাকায় এত বার যাওয়া হয়েছে যে, অনেক এলাকা নিজের এলাকার মতোই আমার কাছে পরিচিত। দুঃখজনক হলো, আজ থেকে ২০-২২ বছর আগে এখানে ১ পার্সেন্টরও কম খ্রিষ্টান থাকলেও বর্তমানে খ্রিষ্টান মিশনারিদের তৎপরতার কারণে তা ৮৫ থেকে ৯০ পার্সেন্টে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার করা পর্যবেক্ষণের সর্বনিম্ন হিসাবটা বললাম আপনাকে।
ছোট-বড় প্রায় ১৪টি উপজাতীয় গোষ্ঠীর বসবাস এই অঞ্চলে। এদের অধিকাংশই খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে যাচ্ছে। এবং সেটা খ্রিষ্টান মিশনারিদের তৎপরতায়। উপজাতিদের মধ্যে ছোট ছোট যে গোষ্ঠীগুলো, তাদের প্রায় সকলেই খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে নিয়েছে। গহীন পাহাড়ের ভেতর তাদের বসবাস, কিন্তু আপনি যদি সেখানে যান আর তাদের জীবনমান দেখেন, তবে মনেই হবে না, আপনি বাংলাদেশে আছেন, মনে হবে ওয়েস্টার্ন কোনো কান্ট্রিতে এসেছেন।
খ্রিষ্টান মিশনারিরা তাদের শিক্ষাদীক্ষা থেকে শুরু করে রাস্তা-ঘাট সব কিছু করে দিচ্ছে। বিনিময়ে তাদেরকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করছে। কনভার্টেড এসব খ্রিষ্টানদের সঙ্গে কথা বললে আপনি চমকো যাবেন। এদের ভাব ও আচারে মনেই হবে না এরা বাংলাদেশ নামক কোনো রাষ্ট্রকে স্বীকার করে। তাদের এমনও এলাকা আছে যেখানে খ্রিষ্ট মিশনারিদের দ্বারা প্রুফ করা। সেখানে যেতে হলে বিশেষ বাহিনীর পারমিশন লাগে। আর নির্দিষ্ট লোক ব্যতীত সেখানে ঢোকার পারমিশনও পাওয়া যায় না। রাঙ্গামাটির বড়কল উপজেলায় আছে এমন একটি এলাকা।
বান্দরবানের মিরিঞ্জা নামক একটা এলাকা আছে, সেখানের উঁচু এক টিলায় মং সম্প্রদায়ের বসবাস। যাদের অধিকাংশই খ্রিষ্টান হয়ে গেছে। খ্রিষ্টান মিশনারিদের কল্যাণে উন্নত হয়েছে তাদের জীবনমান। মং সম্পদায়ের নেতাদেরকে ‘কারবারি’ বলা হয়। সেখানে একবার সফরে গেলে এক কারবারির সঙ্গে কথা হয়েছিল আমার। সে জানাল, ধর্ম যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, এমনটা ধারণায়ও ছিল না তাদের। একসময় তারা মনে করত জন্মসূত্রে মুসলিম না হলে কেউ মুসলিম হতে পারত না। এই খ্রিষ্ট মিশনারিরা আসার আগে তাদের কেউ কেউ মুসলিম হতে চাইলে এমন কেউ ছিল না, যে তাকে মুসলিম বানাবে। স্থানীয় বাঙালি মুসলিম যারা ছিল, তারা তাদেরকে মুসলিম সমাজে দাখিল করতে অস্বীকৃতি জানাত। খ্রিষ্টান মিশনারিরা এসে এখন তাদের মনোভাব বদলে দিয়েছে। দলে দলে তাই তারা খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে পাচ্ছে উন্নত জীবনমানের ব্যবস্থা।
খ্রিষ্টান মিশনারিদের মুকাবেলায় এসব এলাকায় ওলামায়ে কেরামের দাওয়াতি কার্যক্রম কেমন জানতে চাইলে মাওলানা আবদুল্লাহ জানান, তাদের তুলনায় আমাদের কার্যক্রম প্রায় শূন্যের কোঠায়। তাছাড়া আমরা সীমিত পরিসরে যারা কাজ করছি, তারাও নানাভাবে বাধার সম্মুখীন হচ্ছি। খ্রিষ্টান মিশনারিদের কৌশলী তৎপরতা এবং তাদের পাহারাদার উপজাতীয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর হিংস্রতা নানাভাবে আমাদের বাধাগ্রস্ত করে। সেখানে নতুন করে কোনো মসজিদ-মাদরাসা স্থাপন করতে হলে ব্যাপক বেগ পেতে হয়। স্থাপন করলেও সেটা সেখানে মোতায়েনকৃত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের আশপাশে করতে হয়। পাহাড়ের ভেতরে করার কোনো সুযোগ নেই। খ্রিষ্টান মিশনারি ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো বাধা দেবে।
স্বাধীন জুমল্যান্ডের ব্যাপারে জানতে চাইলে মাওলানা আবদুল্লাহ বলেন, হ্যাঁ, পাহাড়িরা সেই পথেই এগোচ্ছে। সেখানে তাদের তৎপরতা দেখলে সহজে যে কারো এটা বুঝে আসবে। একটা ঘটনা বলি। এই কিছুদিন আগে আমি বান্দরবান থেকে ফিরছিলাম। কর্ণফুলির কাছে আসতেই আমাদের গাড়ি পুলিশি চেকিংয়ে পড়ে। গাড়ি থামিয়ে পুলিশের একটি দল আমাদের চেক করতে থাকে। এ দলের অফিসার ছিল এক চাকমা। সে সরাসরি এসে আমাকে নামতে বলে। তাদের আদেশ পালনার্থে নামলাম। আমাকে নামিয়ে গাড়িটি তারা ছেড়ে দেয়। তারপর আমাকে নানা রকম জিজ্ঞাসাবাদ করে। দলে জুনিয়র কিছু বাঙালি পুলিশ সদস্য ছিল। তাদের সহায়তায় আমি রক্ষা পাই। চাকমা ওই পুলিশ অফিসার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে একটু দূরে যেতেই বাঙালি এক পুলিশ সদস্য আমাকে বলে, হুজুর, এর বাড়ি পার্বত্য চট্টগ্রামে। এরা বাংলাদেশ পুলিশে চাকরি করে ঠিক, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করতে এরা সদা তৎপর। আপনি নিশ্চিত থাকেন আগামী ১০ বছরের ভেতর পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশ থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন : অস্থির পার্বত্য চট্রগ্রাম : স্বাধীন জুমল্যান্ডের দিকেই কি এগোচ্ছে উপজাতিরা?
