‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ’-প্রবণতা বাড়ছে, দায়ী কারা?

রাগিব রব্বানি

রাজধানীর বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এক নারী। আবু সাঈদ অপু নামে বেসরকারি টিভি চ্যানেল মাই টিভির এক সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক। এই সম্পর্কের সূত্র ধরে হাতিরঝিলের একটি ফ্ল্যাটে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে চার বছর ধরে বসবাস করে আসছিলেন তাঁরা। গত ১০ মার্চ শিক্ষিকা ওই নারী হাতিরঝিল থানায় তাঁর সাংবাদিক-প্রেমিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা করেন। মামলার জেরে গ্রেপ্তার হন সাংবাদিক অপু। এখন তিনি কারাগারেই আছেন। আদালতের বিচারাধীন আছে এই মামলা।

সাভারের ভাকুর্তা ইউনিয়নের চাপড়া এলাকার বাসিন্দা অমিত সরকার। ১৮ বছর বয়েসি এক তরুণীর সঙ্গে মাস কয়েক ধরে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক। সম্পর্কের সূত্র ধরে একাধিকবার দৈহিক মেলামেশাও হয় তাদের। ফলে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন প্রেমিকা। এই অবস্থায় অমিতকে বিয়ের চাপ দেন তিনি। অমিত অস্বীকৃতি জানালে সাভার থানায় ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। এবং সেটা করেন তাঁর প্রেমিকা ওই তরুণী নিজেই। সাভার থানা পুলিশ অমিতকে আটক করে হাজতে নিয়ে যায়।

লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে রত্না আক্তার নামে ২৪ বছর বয়েসি এক তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের জেরে দৈহিক মেলামেশা হয় আরিফ নামের এক সেনা সদস্যের। গত ১৮ মার্চ রাতে রত্নার বাড়িতে প্রেমিক আরিফের সঙ্গে বিয়ের বিষয়ে কথা-কাটাকাটি হয় রত্নার পরিবারের। আরিফ বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালে স্থানীয় থানা পুলিশকে খবর দিয়ে এনে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করানো হয় তাঁকে।

এই ছিল গত এক সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ধর্ষণ মামলার উল্লেখযোগ্য তিনটি ঘটনা। তার আগের দিনগুলো ঘাটলে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ শিরোনামে এমন আরও অসংখ্য ঘটনা বেরিয়ে আসবে। যেখানে উভয়ের সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের পর সম্পর্ক ভেঙে গেলে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা করা হয়, এবং কেবল এক পক্ষকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

সচেতন মহলের অভিযোগ, নারী-পুরুষের বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও দিনদিন এমন প্রবণতা বেড়েই চলেছে। রাষ্ট্রীয় আইনে তা বৈধ হবার অজুহাতে প্রশাসনিক তেমন কোনো তৎপরতা লক্ষ করা যায় না এ ব্যাপারে।

অবৈধ এই সম্পর্কের জেরে টানাপোড়েন তৈরি হলে ধর্ষণের অভিযোগ এনে একপক্ষ আইনের দ্বারস্থ হয়ে অপরপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে। অথচ এমন ঘটনায় দুই পক্ষই সমান দোষী হবার পরও আইনের মারপ্যাচে একপক্ষ বেঁচে যায়, আর আরেক পক্ষ হয় হেনস্থার শিকার।

এ ব্যাপারে কথা বলেছিলাম চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা জামেয়া পটিয়ার প্রধান মুফতি আল্লামা হাফেজ আহমাদুল্লাহর সঙ্গে।

হাফেজ আহমাদুল্লাহ বলেন, নারী-পুরুষের বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক ইসলামে যেমন হারাম তেম্নি বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গেও চূড়ান্ত সাংঘর্ষিকতাপূর্ণ। এই অবৈধ সম্পর্কের কারণেই ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ’-প্রবণতা, আপনি যেটা বললেন, তা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে ভিকটিম নারী-পুরুষ উভয়ের দোষ আছে ঠিক, তবে নারীর তুলনায় পুরুষের দোষটা এখানে বেশি। কারণ নারীকে সে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ব্যভিচারের দিকে নিয়ে গেছে। ব্যভিচারের অপরাধের সঙ্গে সে প্রতারণার অপরাধও করেছে। তবে সাজাপ্রাপ্তির বেলায় আমি বলব, উভয়কেই সাজা দেওয়া উচিত। কারণ, এমন কাজ করে একদিকে যেমন তারা ধর্মীয় আইন লঙ্ঘন করছে, অপরদিকে সমাজকেও নাপাক করছে।

সভ্য সমাজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন প্রবণতা রোধে প্রশাসনকে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করার দাবি জানিয়ে হাফেজ আহমাদুল্লাহ বলেন, এ সব কিছুর মূলে হচ্ছে পর্দাহীনতা এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা। এই মেলামেশা থেকে তাদের বিরত রাখতে হলে নারী-পুরুষের আলাদা কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। আর এটা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিকভাবেও প্রত্যেক গার্ডিয়ানকে উদ্যোগী হতে হবে।

আগের সংবাদফিলিস্তিনের আহমাদ ইয়াসিন, অপরাজিত এক প্রতিরোধ-যোদ্ধার আখ্যান
পরবর্তি সংবাদযেভাবে হামলার শিকার হন আল্লামা তকি উসমানি