ওয়াজ মাহফিল বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা : কী ভাবছেন আলেমরা?

বিশেষ প্রতিবেদক

ওয়াজ মাহফিলে রাষ্ট্র ও নারীবিদ্বেষী কথাসহ বেশ কয়েকটি ব্যাপারে ‘উস্কানিমূলক’ কথা বলার অভিযোগ এনে কয়েকদিন আগে ১৫ জন বক্তার একটা তালিকা তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি ওয়াজ মাহফিল বিষয়ে একটা প্রতিবেদন ও সুপারিশমালাও তৈরি করা হয়েছে।

অভিযোগ-তালিকায় যে ১৫ জনের নাম এসেছে তাঁদের দু-একজন ভণ্ড ও ভ্রান্ত আকিদার হলেও অধিকাংশই হকপন্থী আলেম। যে অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, এর বেশ কিছুকে অভিযোগ হিসেবে নিতে পারছেন না ওলামায়ে কেরাম। নারীবিদ্বেষী ও শোবিজ তারকাদের নিয়ে কটূক্তিমূলক বক্তব্যের যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেখানটায় আপত্তি জানাচ্ছেন তাঁরা।

ওলামায়ে কেরাম বলছেন, ইসলামে গান-বাজনা ও বেপর্দাভাবে চলাফেরা করা হারাম। বর্তমানে এটা মহামারি আকার ধারণ করেছে। তাই সাধারণ মানুষকে এ মহামারি সম্পর্কে সতর্ক করতেই শোবিজ তারকা ও নারীবাদীদের আলোচনা আসে। এটা ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব। তাঁদেরকে এসবের বিরুদ্ধে বলতে হবে। কারণ ইসলামে এসব বিষয়ে কড়াকড়িভাবে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

হ্যাঁ, এসব ব্যাপার উপস্থাপন করতে গিয়ে কোনো কোনো বক্তার উপস্থাপন-ভঙ্গি সুন্দর হয় না, এ ব্যাপারে তাঁদেরকে সতর্ক করা যায়। কিন্তু এ জন্য পুরো ওয়াজ মাহফিল প্রথার ওপর সরকারি বিধি-নিষেধ চাপিয়ে দেওয়া, ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপেরই নামান্তর।

ওলামায়ে কেরাম আরও বলছেন, সুপারিশে যে বিষয়গুলো এসেছে তার অধিকাংশটাই বাস্তবায়ন করা দরকার ঠিক, তবে এটা হকপন্থী ওলামায়ে কেরামের কাজ। সরকার তাঁদেরকে এ ব্যাপারে পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু সরাসরি হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। কারণ, এ দেশের ধর্মীয় অঙ্গন ও পরিমণ্ডলের তদারকি বহু আগ থেকেই ওলামায়ে কেরাম স্বাধীনভাবে করে আসছেন। আইনি কোনো জটিলতা না থাকলে প্রশাসনিক কোনো হস্তক্ষেপ এ ক্ষেত্রে পড়েনি। ওয়াজ মাহফিলে সরকারি বিধি আরোপ করলে ধর্মীয় অঙ্গনের সেই স্বাধীনতা খর্ব হবে বলেই মনে করছেন তাঁরা।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়ায়েজ-শ্রেণির শীর্ষ একাধিক আলেমের সঙ্গে কথা বলে এসব বক্তব্যই পেয়েছে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর ডটকম।

তাঁরা বলছেন, যে ১৫ জন বক্তার তালিকা করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে এমন বক্তার নাম খুব কমই এসেছে, যাঁরা ইসলামের অপব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছেন নিয়মিত। কেউ কেউ তো আরবি কিছু শব্দ একত্রিত করে সেটাকে কুরআনের আয়াত বলে চালিয়ে দেওয়ারও ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। এমন বক্তার কারণে বিভিন্ন জায়গায় বিভেদ ও বিশৃঙ্খলার তৈরি হচ্ছে। তালিকায় এদের দু-একজনের নাম এলেও বাকিদের কথা কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। অথচ ওয়াজ মাহফিলের বিশৃঙ্খলা দূর করতে এদের ব্যাপারেই মূলত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। সেটা কেন করা হলো না, এমন প্রশ্ন অনেকেরই।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়াজ মাহফিল বিষয়ক এমন তৎপরতার করণীয় নির্ধারণে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জামিয়া মোহাম্মদিয়া আরাবিয়া নামক একটি মাদরাসায় আজ (৯ এপ্রিল মঙ্গলবার) ওলামায়ে কেরামের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে ওলামায়ে কেরাম নিজেদের উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই তৎপরতাকে ধর্মীয় কার্যক্রমের ওপর হস্তক্ষেপ উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের মাধ্যমে আলেমদের ওপর নজরদারি এবং আলোচকদের নিবন্ধনের সুপারিশ ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের শামিল।

বৈঠকে উপস্থিত আলেমগণ এ পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণে ৩টি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তার মধ্যে প্রথমটি হলো এ বিষয়ে আলেমদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রেরণ। দ্বিতীয়টি হলো আগামী ১১ এপ্রিল তাঁদের একটা প্রতিনিধিদল আল্লামা শাহ আহমদ শফী সাহেবের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ করতে হাটহাজারী মাদরাসায় যাবে। তৃতীয় সিদ্ধান্ত হলো দেশের শীর্ষ আলেমদের মাধ্যমে বক্তাদের বিশেষ নসিহত ও নির্দেশনার ব্যবস্থাগ্রহণ।

প্রবীণ আলেম ও জামিয়া মোহাম্মাদিয়া আরাবিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা আবুল কালামের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা আতাউল্লাহ বিন হাফেজ্জী, বেফাকের সহসভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ (মধুপুরের পীর), মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা ফারুক আহমদ, মাওলানা জুনায়েদ আলহাবিব, মাওলানা নাজমুল হাসান, মাওলানা মন্জুরুল ইসলাম আফেন্দি, মাওলানা খোরশেদ আলম কাসেমী, মাওলানা মাসউদুল করীম, মাওলানা মামুনুল হক, মুফতী সাখাওয়াত হোসাইন রাজি, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী, মুফতী কেফায়াতুল্লাহ আযহারী, মুফতী আব্দুর রাজ্জাক কাসেমী, মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ, মাওলানা আতাউল্লাহ্ আমীন, মাওলানা ফয়সাল আহমদ, মাওলানা রাফি বিন মুনির, মাওলানা শফিকুর রহমান, মাওলানা লোকমান সাদী, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, মাওলানা ওমর ফারুক যুক্তিবাদী, মাওলানা আরিফ বিল্লাহ্, মাওলানা তাহমীদুল মাওলানা ও মুফতী এনায়েতুল্লাহ্ প্রমুখ ৷

আগের সংবাদসুদানে প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তাবাহিনীর সংঘর্ষ
পরবর্তি সংবাদদুবৃত্তের দেয়া আগুনে নরসিংদীতে একই পরিবারের ৪ জন দগ্ধ