
রাগিব রব্বানি
কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারা উপমহাদেশের ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গনে ব্যতিক্রমী, সৎ ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। এ শিক্ষাধারার শেকড় অনেক সুপ্রাচীন হলেও বর্তমান কাঠামোটা তৈরি হয় ১৮৬৬ সালে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। পরে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশে দেওবন্দের আদলে গড়ে ওঠে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারায় পড়াশোনার মান যেমন অভীষ্ট লক্ষ্যভেদী, তেম্নি নীতি-নৈতিকতা শিক্ষায়ও এ শিক্ষাধারা অনুপম একটি আদর্শ। প্রধানত আবাসিক ব্যবস্থাপনায়ই পরিচালিত হয় এ ধারার মাদরাসাগুলো। শিক্ষকদের একাগ্র নেগরানিতে দিনরাত পড়াশোনা করেন শিক্ষার্থীরা।
কিন্তু শিক্ষকদের বিশেষ কোনো শিক্ষকতা-ট্রেনিং না থাকায় কোনো কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনভিপ্রেত কিছু আচরণ করেন। কেউ কেউ শাসন করতে গিয়ে প্রহারের আশ্রয় নেন এবং প্রহারটা বেধড়ক পর্যায়ে চলে যায়। এই ঘটনাগুলো ঘটে প্রধানত শিশু শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে মাদরাসার হিফজখানায় ঘটে এমন ঘটনা। তুলনার বিচারে এসব ঘটনা খুব কম মাদরাসায় ঘটলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে ঘটনার বিবরণ ও ভিডিও ফুটেজ মুহূর্তের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যার দরুণ সুযোগ-সন্ধানীদের সমালোচনা ও তীব্র তোপের মুখে পড়তে হয় এ ধারার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে।
কওমি মাদরাসাগুলোর এই সমস্যার বাইরে আরও যে সমস্যাটি নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে, যেটা নিতান্ত গর্হিত এবং এ শিক্ষাধারার জন্য চরম লজ্জা ও হতাশার, তা হলো সমকামিতা। অল্প হোক বেশি হোক, অনেক মাদরাসায়ই এমন ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে মাদরাসার হিফজ বিভাগগুলোতে এমন ঘটনা সাম্প্রতিক কালে বেড়েই চলেছে। হিফজখানার কোনো কোনো শিক্ষক শিশুশিক্ষার্থীদের নানাভাবে ফুঁসলিয়ে এমন ঘৃণ্য অপকর্মে লিপ্ত হন। এমনটাই বলছিলেন রাজধানীর একটি মাদরাসার শিক্ষক।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মাদরাসা-শিক্ষক বলেন, ঘৃণ্য এসব অভিযোগ প্রমাণিত হবার পর খুব সহজেই ছাড়া পেয়ে যায় ওইসব শিক্ষক। মাদরাসার বদনাম বা অন্য নানাবিধ কারণে কোনো ধরনের আইনের আশ্রয় বা বিচারের সম্মুখীন না করে ওইসব শিক্ষককে নীরবে বহিষ্কার করা হয় মাদরাসা থেকে। এবং ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ফলে এ ধরনের অপরাধী শিক্ষক অন্য কোনো মাদরাসায় আবার নতুন করে জয়েন করে। সেখানেও ঘটায় একই ঘটনা।
মৌলভীবাজারের এমন একাধিক শিক্ষকের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় একটি মাদরাসার শিক্ষক। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষক বলেন, মৌলভীবাজার জেলা শহরের দারুল উলুম মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন একজন শিক্ষক। ক্লাসে ছাত্রদেরকে পড়া বুঝানোর যোগ্যতা তাঁর অসাধারণ ছিল। মাদরাসার ছাত্র-উসতাদ সবার কাছে তিনি সমাদৃতি পেতেন এ যোগ্যতার কারণে। কিন্তু হঠাৎ একদিন এক ছাত্রের সঙ্গে অনৈতিক কার্যকলাপে ধরা পড়ে যান তিনি। অপরাধ প্রমাণিত হয় মাদরাসা-কর্তৃপক্ষের কাছে। মাদরাসা-কর্তৃপক্ষ তৎক্ষণাৎ তাঁকে বহিষ্কার করে। কিন্তু কোনো ধরনের শাস্তির সম্মুখীন করে না। ফলে এখান থেকে বহিষ্কারের পর নিজের যোগ্যতা বলে অপর একটি মাদরাসায় তাঁর চাকরি হয়ে যায়। মাস কয়েক পর সেখান থেকেও তিনি একই অপরাধে বহিষ্কৃত হন। কিন্তু মাদরাসার বদনামের ভয়ে কেউই তাঁর এই ঘটনা বাইরে প্রকাশ করেন না। এ রকম একই অপরাধে একই প্রক্রিয়ায় তিনি বেশ কয়েকটি মাদরাসা থেকে বহিষ্কার হয়েছেন।
সারা দেশের মাদরাসাগুলোতে এমন আরও অনেক দৃষ্টান্ত আছে, যারা এমন অপরাধে ধরা পড়ার পর এক মাদরাসা থেকে বহিষ্কার হলে অন্য মাদরাসায় সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন এবং নিজেদের এই ঘৃণ্য অভ্যাস সমানতালে চরিতার্থ করছেন। কিন্তু মাদরাসাঅলারা বহিষ্কার ছাড়া কার্যত আর কোনো ব্যবস্থাগ্রহণ করতে পারছেন না বৃহৎ ‘মাসলাহাতে’র কথা বিবেচনা করে।
সচেতন মহল মনে করছেন, একটা অপরাধকে ‘মাসলাহাতে’র ভয়ে এভাবে ধামাচাপা দিয়ে রাখলে মাদরাসাগুলোর কল্যাণের বদলে অকল্যাণই সাধিত হবে। এবং ইতিমধ্যেই এটার কুফল পরিলক্ষিত হচ্ছে। মাদরাসা ও ইসলামি শিক্ষা-বিরোধীরা সাম্প্রতিক কালে এই অপরাধপ্রবণতাকে ছুঁতো ধরে পুরো মাদরাসা-সিস্টেমটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই বাংলাদেশে কওমি শিক্ষাধারার শীর্ষ অথরিটি হাইআতুল উলয়া ও বেফাক কর্তৃপক্ষকে এ প্রবণতা বন্ধে এখনই সোচ্চার হওয়ার দাবি জানাচ্ছেন সচেতন মহল।
কওমি পড়ুয়া তরুণরাও এ ঘৃণ্য অপকর্ম বন্ধে সম্প্রতি সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। তাঁরা হাইআ ও বেফাক কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছেন, হাইআ ও বেফাক যেন দেশের যেকোনো মাদরাসায় শিশু বা শিক্ষার্থী নির্যাতনের অপরাধে কোনো শিক্ষকের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে সে শিক্ষককে হাইআ ও বেফাকভূক্ত মাদরাসাগুলোতে চিরদিনের জন্য নিষিদ্ধ করে দেন। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতেও যেন তারা সংশ্লিষ্ট মাদরাসাকে নির্দেশ ও সার্বিক সহায়তা প্রদান করেন।
সচেতন এই তরুণরা বলছেন, এ আইন কার্যকর করতে পারলে কওমি মাদরাসাগুলোতে শিক্ষকদের অপরাধপ্রবণতা অনেকটাই হ্রাস পাবে।
জানা গেছে কওমি পড়ুয়া সচেতন কিছু তরুণ এই দাবি নিয়ে বেফাক ও হাইআ কর্তৃপক্ষকে স্মারকলিপি প্রদান এবং বেফাক অফিসের সামনে খুব শিগগির মানববন্ধন করারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
