ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ি দিবস : যে যুদ্ধে বাংলাদেশ ভারতকে পরাজিত করেছিল

মুসান্না মেহবুব

১৮ এপ্রিল। ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ি দিবস হিসেবে পরিচিত এ দিনটি বাংলাদেশিদের জন্য যেমন গৌরবের, তেম্নি প্রেরণারও। ২০০১ সালের এ দিনে কুড়িগ্রামের রৌমারি উপজেলার বড়াইবাড়ি সীমান্তে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বীর জওয়ানদের হাতে চরমভাবে পরাজয় বরণ করেছিল ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। স্বাধীনতার তিরিশ বছর পর প্রথমবারের মতো বহির্শত্রুর এমন যুদ্ধংদেহী আক্রমণের মুখে পড়েছিল বাংলাদেশ। এবং ভারতের মতো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষীদের তুমুল বীরত্বের সঙ্গে রুখে দিয়েছিল বাংলাদেশের বিডিআর জওয়ানেরা।

বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পসহ আশপাশের এলাকা অবৈধভাবে ভারতের দখলে নেওয়ার জন্যই ছিল এমন অতর্কিত আক্রমণ। কিন্তু স্থানীয় গ্রামবাসী ও বিডিআর জওয়ানরা হানাদার বিএসএফের মুকাবেলায় গড়ে তোলেন শক্ত প্রতিরোধ।

সেদিন ভোর পাঁচটা। বড়াইবাড়ির স্থানীয় পল্লি চিকিৎসক লাল মিয়া বের হয়েছেন নিজের কাজে। হঠাৎ দেখেন বিএসএফের বড় একটা বাহিনী ভারী অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বর্ডার ক্রস করে এদিকে আসছে। তাদের এ যুদ্ধংদেহী ভাব দেখে ভড়কে যান লাল মিয়া। তবে মনে সাহস যুগিয়ে ঘটনা কী বুঝতে সামনে বাড়েন তিনি। তাদের মুখোমুখি হয়ে যান খানিক সময়ের মধ্যেই। বিএসএফের কমান্ডার তাকে কাছে ডেকে নেয়। জানতে চায় বিডিআর ক্যাম্পের অবস্থান সম্পর্কে। চিকিৎক লাল মিয়া ইতিমধ্যেই আঁচ করে ফেলেন ঘটনা কোন দিকে মোড় নিচ্ছে। এরা আক্রমণের জন্যই এসেছে।

লাল মিয়া বুদ্ধি করে পরিত্যক্ত একটি বাড়ি দেখিয়ে দেন বিএসএফকে। বলেন এটাই বিডিআর ক্যাম্প। হানাদার বাহিনী সেই বাড়ি লক্ষ্যে তৎক্ষনাৎ শুরু করে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। এদিকে লাল মিয়া আলগোছে সটকে পড়েন সেখান থেকে। তিনি দৌড়ে যান বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পে। ঘটনার বিস্তারিত খুলে বলেন তাদেরকে। তারপর যান এলাকাবাসীর কাছে। এলাকার পুরুষেরা তৎক্ষনাৎ তৈরি হয়ে যান প্রতিরোধের জন্য। এদিকে বিডিআর জওয়ানরাও নিজেদের সৈন্য ও অস্ত্র স্বল্পতা সত্ত্বেও মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান।

অমিততেজা মনোবল নিয়ে গ্রামবাসী ও বিডিআর জওয়ানরা ঐক্যবদ্ধভাবে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ভারী অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত বিএসএফ জওয়ানরা এ প্রতিরোধ বুহ্য ভাঙতে নিজেদের সর্বাত্মক চেষ্টা প্রয়োগ করেও ব্যর্থ হয়।

এ সময় বিএসএফ-এর গুলিতে শহীদ হন ৩৩ রাইফেলস ব্যাটালিয়ানের সৈনিক ল্যান্স নায়ক ওয়াহিদ মিয়া ও সিপাহী মাহফুজ, ২৬ রাইফেলস ব্যাটালিয়ানের সিপাহী আব্দুল কাদের। স্থানীয় ছবিরন বেওয়া (৮০), মোস্তফা মুন্সি (৪৫)-সহ আহত হন আরো অনেকে। অপর পক্ষে মারা যায় বিএসএফ অফিসারসহ প্রায় ১৩৭ জন।

সিলেটের পাদুয়ায় অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে জবর দখল করতে গিয়ে বিডিআর জোয়ানদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে শোচনীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই তাদের এ আক্রমণ ছিল। কিন্তু তারা প্রতিশোধ নিতে সফল হতে পারেনি বিডিআর জওয়ান এবং এলাকাবাসীর সচেতনতা ও জীবনবাজি রেখে প্রতিরোধের কারণে।

উল্টো আরও নিজেদের ১৩৭ জন জওয়ানকে খুইয়ে অপমানিত হয়ে বিদেয় নিতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে। বিডিআর জওয়ানদের এই অভাবিত সাহসিকতার স্মৃতি স্বরূপ এবং শহিদ হওয়া তিন বিডিআর জওয়ানের স্মরণে বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। প্রতি বছর ১৮ এপ্রিল এ স্মৃতিস্তম্ভে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী জওয়ানরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে তাদের পূর্বসূরীদের বীরত্বগাথা। কিন্তু এর বাইরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বড়াইবাড়ি দিবসকে স্মরণ করতে দেখা যায় না খুব একটা। অথচ সেদিনকার সেই যুদ্ধে বাংলাদেশের হয়ে বিডিআর জোয়ানরা সংখ্যা ও শক্তিতে বহুগুণ বেশি ক্ষমতাধর বিএসএফকে যে সূচনীয় পরাজয় হজম করিয়েছে, তা বাংলাদেশ রক্ষার ইতিহাসে অনন্য একটা নজির হয়ে আছে।

আগের সংবাদফেনীতে নানা অপরাধের অন্তরালে পুলিশের শক্তিশালী সিন্ডিকেট
পরবর্তি সংবাদনুসরাতের ঘটনায় ন্যায়বিচার নিয়ে শঙ্কিত : টিআইবি