হারিয়ে যাচ্ছে লজিংবাড়ি

রাগিব রব্বানি:

গ্রাম হোক কিংবা শহর, মোটামুটি বড় ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেখানেই থাকত, আশপাশের এলাকায় প্রায় ঘরে ঘরেই ছিল ছাত্রদের লজিং খাওয়ার ব্যবস্থা। গরিব-ধনী নির্বিশেষে প্রায় সকলেই একেকজন শিক্ষার্থীকে নিজের ঘরে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা দিতেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। শর্ত কেবল একটাই, সন্ধ্যার পর একবেলা পরিবারের ছোট বাচ্চাকাচ্চাদের পড়াতে হবে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, গত শতাব্দীর শেষ অবধি এই ঢাকা শহরেও লজিংয়ের প্রথা ছিল। বকশিবাজারের মাদরাসা-ই-আলিয়াসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের লজিং দিতেন পুরান ঢাকার অধিবাসীরা। কিন্তু চলতি দশকে এসে রাজধানীসহ অন্যান্য শহরগুলো থেকে লজিংপ্রথার পুরোপুরি বিলুপ্তি ঘটে গেছে। গ্রামাঞ্চলের কিছু কিছু এলাকায় অবশ্য এখনও জারি আছে এই প্রথা। কিন্তু আগের সেই জৌলুশ ও আগ্রহ নেই কোনোখানেই।

মাদরাসাপড়ুয়া হোন কিংবা কলেজ-ভার্সিটিপড়ুয়া— লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের অনেকেই লজিংবাড়ি থেকে-খেয়ে পড়াশোনা করেছেন। উদাহরণের জন্য বেশিদূর যেতে হবে না, আমাদের মাননীয় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও নিজের ছাত্রজীবনের বড় একটি অংশ যাপন করেছেন লজিং খেয়ে। তেম্নি প্রথিতযশা অনেক ওলামায়ে কেরামও লজিংবাড়ির খাবার খেয়ে পার করেছেন ছাত্রজীবন।

রাজধানীর বৃহৎ মাদরাসা জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ীর মুহতামিম ও বরেণ্য আলেম আল্লামা মাহমুদুল হাসান সাহেবসহ এই স্তরের বা তারও উচ্চপর্যায়ের অনেক আলেম লজিং বাড়ির খাবার খেয়ে পড়াশোনা করেছেন।

আল্লামা মাহমুদুল হাসান ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদীর চরাঞ্চল থেকে এসে ময়মনসিংহের ত্রিশাল বালিপাড়া কাজিগ্রাম মাদরাসায় আসেন পড়াশোনার জন্য। থাকতেন লজিংয়ে। তেমনি রাষ্ট্রপতি জনাব আবদুল হামিদ ভাটি অঞ্চল থেকে পড়াশোনার জন্য আসেন কিশোরগঞ্জ শহরে। থেকেছেন লজিং বাড়ি।

সিলেট অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া গহরপুর এবং জামিয়া রেঙ্গা। এই মাদরাসা দুটোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্ররা আসতেন ইলম আহরণের জন্য। বর্তমানে মাদরাসা-দুটোতে বোর্ডিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও এককালে লজিংই ছিল এইসব ছাত্রের আবাসনের একমাত্র ব্যবস্থা।

রেঙ্গা ও গহরপুরের আশপাশের আট/দশটি গ্রাম জুড়ে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি ছাত্র লজিং থাকতেন।

জামিয়া রেঙ্গা ও জামিয়া গহরপুর—উভয় মাদরাসায়ই পড়াশোনা করেছেন এমন একজন প্রবীণ আলেমের সঙ্গে কথা হয়েছিল এই প্রতিবেদকের। দুই মাদরাসায় তাঁর ছাত্রজীবনের পুরোটাই কেটেছে লজিংবাড়িতে থেকে।

প্রবীণ এ আলেমের নাম মাওলানা জহুর আলি। লজিংবাড়ি নিয়ে আলাপ তুলতেই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন বয়েসের ভারে ম্রিয়মাণ মাওলানা জহুর।

‘আহা, সেইসব সোনালি দিন কি আর আছে এখন! এককালে গহরপুর ও রেঙ্গার আশপাশের এলাকায় প্রায় প্রতিটা বাড়ির সামনে একটি করে বাংলোঘর থাকত। এটা বানানোই হতো মাদরাসার ছাত্রদের লজিং দেওয়ার জন্য। যার বাংলোঘর থাকত না, সে প্রতিবেশীর বাংলোঘরে নিজের তালিবুল ইলমকে থাকার বন্দোবস্ত করে দিত।’ বলছিলেন মাওলানা জহুর।

মাওলানা জহুর আরও জানান, প্রতিটা গ্রামের ঘরে ঘরে ছাত্র ছিল। গরিব-ধনী প্রায় সকলেই লজিং দিত। কোনো বিনিময় ছিল না এর। নেকি লাভের জন্যই লজিং দিত তারা। তবে বাচ্চা-কাচ্চা থাকলে সন্ধ্যার পর নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি তাদেরকে একটু তদারকি করতে হতো।

‘ছাত্রদের প্রতি গ্রামের মানুষের আলাদা একটা ভক্তি ও ভালোবাসা থাকত। গ্রামজুড়ে যেন ছাত্রদেরই রাজত্ব ছিল। আগেকার ছাত্ররাও খুব নম্র-ভদ্র ছিল।

‘কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে লজিংবাড়ি নিয়ে! কত আনন্দ আর হৈহল্লা করতাম আমরা সেই সময়। সবচেয়ে মজার স্মৃতি হলো মুশায়েরার আয়োজন। মুশায়েরা হচ্ছে ফার্সি ও উর্দু শের পাঠের আসর। কখনো কখনো বাংলায় শের পড়া হতো। তবে সেটা উপস্থিত বানিয়ে বানিয়ে বলতে হতো। বিভিন্নভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। লজিংয়ে থাকা ছাত্ররাই করত। আয়োজন-সহযোগিতায় গ্রামের মাতব্বর গোছের লোকেরা থাকতেন। রাতের বেলা কোনো বাড়িতে বসত এই আসর।

‘বাড়িওয়ালা কখনো খাসি, কখনো গরু, কখনো মোরগ—যার যার তৌফিক আন্দাজা খাবার-দাবারের আয়োজন করতেন। মুশায়েরায় দুটো পক্ষ থাকত। কখনো গহরপুর ও রেঙ্গা—দুই মাদরাসার ছাত্র থাকত দুই পক্ষে। আবার কখনো একই মাদরাসার দুই গ্রামে লজিং থাকা ছাত্রদের মধ্যে হতো লড়াই। রাতভর চলত শেরের চালাচালি। এক পক্ষ কোনো একটা শেরের কিয়দাংশ আবৃত্তি করত, সেই আবৃত্তির একদম শেষের অক্ষর দিয়ে অপর পক্ষ অন্য কোনো শের শুরু করতে হতো। এটার ওপরই নির্ভর করত হার-জিত। আবার কখনো কখনো বাংলায় উপস্থিত শের বানিয়ে একপক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করত।’ বলছিলেন মাওলানা জহুর।

মাওলানা জহুর জানান, লজিংবাড়িটা ছাত্রদের জন্য নিজের বাড়ির মতোই হয়ে যেত। একেকজন ছাত্র একেকটা বাড়িতে সাত-আট বছর/দশ বছর পর্যন্তও লজিং থাকত। অসম্ভব রকমের একটা মায়া জন্মে যেত পরষ্পরের মধ্যে। জীবনের পরবর্তী পুরো সময়টা জুড়ে এই নস্টালজিয়া এসব ছাত্রকে বারবার তাড়া করে ফিরত।

মাওলানা জহুর আলি আরও জানান, সেই সময় এখন আর নেই। এখন মানুষ ছাত্রদেরকে লজিং দিতেই চায় না। প্রচণ্ড অন্তর্মুখী হয়ে গেছে আমাদের সমাজ, সমাজের লোকজন। আবার মাদরাসা-কর্তৃপক্ষও ছাত্রদের বিশেষ নেগরানিতে পড়াশোনা করানোর জন্য বোর্ডিংয়ের ব্যবস্থা করেছে। উস্তাদরা এখন আর ছাত্রদের লজিংয়ে রাখতে আগ্রহী নন। তারপরও গহরপুর এবং রেঙ্গায় এখনও প্রচুর ছাত্রের লজিং আছে। তবে এই প্রথা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে মুশায়েরার মতো মজাদার একটা কাব্যচর্চার আসরও হারিয়ে গেছে। এখনকার প্রজন্ম হয়তো এই আয়োজনের নামই শোনেনি কখনো।

আরও পড়ুন : মুশায়েরা : উপমহাদেশে মুসলমানি সাহিত্যের আলোকোজ্জ্বল ধারা

আগের সংবাদলক্ষ্মীপুরে তরুণীকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগে মামলা
পরবর্তি সংবাদঅপহরণের পর মাদরাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ, অভিযুক্ত আটক