হাইয়াতুল উলইয়ার নতুন পরীক্ষাব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে?

মুসান্না মেহবুব

দাওরায়ে হাদিসের চলতি বছরের পরীক্ষায় পরপর দুই বার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটায় ফাঁসকৃত প্রশ্নের পরীক্ষা বাতিল করে অভিনব পদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহণ করছে সম্মিলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ। কোনো ধরনের টালবাহানার আশ্রয় না নিয়ে প্রশ্নফাঁসের দায় স্বীকার করে নতুনভাবে পরীক্ষার আয়োজন করা এবং ফাঁসকারীদের চিহ্নিত করতে সর্বোচ্চ তৎপরতা চালানোর জন্য যেমন প্রশংসিত হচ্ছে বোর্ডটি, একইভাবে প্রশ্নফাঁসরোধে অভিনব পন্থা অবলম্বন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে এ দেশের পুরো শিক্ষাঙ্গনকে।

প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বাতিল ও স্থগিত হওয়া পরীক্ষা গত ২৩ এপ্রিল থেকে আবারও শুরু হলে দুদিনের মাথায় পুনরায় প্রশ্নফাঁস হয়। হাইআতুল উলয়া তৎক্ষনাৎ ওই দিনের এবং তার পরের দিনের পরীক্ষা স্থগিত করে পুনরায় নতুন প্রশ্নে অবশিষ্ট আটটি পরীক্ষাগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়৷ এবং হাইআর মূল অফিস থেকে প্রতিদিন সকালে পরীক্ষার্থীরা হলে প্রবেশের পর ওইদিনের প্রশ্ন দেশের প্রতিটা কেন্দ্রের জিম্মাদারের হোয়াটস্যাপে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কেন্দ্র জিম্মাদার সে-প্রশ্ন প্রিন্ট আউট করে ছাত্রদের মধ্যে বিতরণ করেন। এতে করে প্রশ্নফাঁসের আর কোনো আশঙ্কাই থাকে না।

কোনো কোনো মাদরাসায় কম্পিউটার ও প্রিন্টারের ব্যবস্থা না থাকায় প্রশ্ন ব্লাকবোর্ডে লিখে দেওয়া হয়। ছাত্ররা সেখান থেকে প্রশ্ন দেখে দেখে উত্তরপত্র লিখে। এতে করে খানিকটা ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদেরকে। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এ ধরনের কেন্দ্র খুব কম। প্রায় সকল কেন্দ্রে কম্পিউটার ও প্রিন্টারের ব্যবস্থা আছে।

হাইআতুল উলয়ার নতুন এ পরীক্ষাপদ্ধতিতে পরীক্ষার্থী এবং পরীক্ষার নেগরানদেরকে খানিকটা ভোগান্তি পোহাতে হলেও, প্রশ্নফাঁস যে রোধ করা গেছে, এ জন্য তাঁরা খুশি। একই সঙ্গে হাইআতের এ সিদ্ধান্তের তারা নিরঙ্কুশ প্রশংসাও করছেন।

সিলেটের আল-জামিয়াতুত তাইয়িবাহ সুলতানপুর মাদরাসার মুহাদ্দিস ও নেগরান মাওলানা জিল্লুর রহমান জানিয়েছেন, হাইআতের অভিনব এ সিদ্ধান্ত প্রশ্নফাঁস রোধে যথার্থ এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এ উদ্যোগের কারণে হাইআ কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদেরকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানেরও দাবি জানান বোর্ডের প্রতি।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসা পরীক্ষাকেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটা পরীক্ষাকেন্দ্রের একাধিক পরীক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। হাইআতের নতুন এ পরীক্ষাপদ্ধতিতে তাঁরাও স্বস্তি প্রকাশ করেন। তবে যাঁদের কারণে তাঁদের এত ভোগান্তি পোহাতে হলো, প্রশ্নফাঁসকারী সেইসব অসৎ লোকদেরকে চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি আছে তাদের পক্ষ থেকেও।

বিশিষ্ট লেখক ও আলেম মাওলানা রুহুল আমীন সাদীও হাইআতের এ উদ্যোগের নিদারুণ প্রশংসা করেছেন। মাওলানা সাদী বলেন, ‘তাঁরা যথেষ্ট স্মার্ট এবং চমৎকার পদ্ধতি বের করেছেন। নির্ভুল পরীক্ষা পদ্ধতি তৈরি করেছেন।

‘সকাল সাতটায় প্রশ্ন তৈরির জন্য আলেমদের একটা গ্রুপ কেন্দ্রীয় অফিসে বসে প্রশ্ন তৈরি করছেন। সকাল নয়টায় তা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের দায়িত্বশীলের কাছে ইমেইলে পাঠাচ্ছেন। এদিকে সকাল পৌনে নয়টায় পরিক্ষার্থী ছাত্ররা হলে ঢুকছেন। পরীক্ষা শেষ হবার আগ অবধি তাঁরা হলেই থাকছেন। আর সকাল নয়টায় হল কর্তৃপক্ষ ইমেইল থেকে প্রশ্নপত্র প্রিন্ট করে ছাত্রদের হাতে পৌঁছাচ্ছেন। প্রশ্ন প্রিন্ট করতে দেরি হলে অতিরিক্ত সেই সময় পরীক্ষার্থীদের দেওয়া হচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন ফাঁস হলেও সমস্যা নাই।

‘হাইয়ার প্রতি, তাঁদের দায়িত্বশীল ভুমিকার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস বেড়ে গেল কয়েক হাজার গুণ।’

প্রতিদিন হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠনোর কাজে সম্পৃক্ত হাইআতুল উলয়ার অস্থায়ী এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হোয়াটসঅ্যাপের যে গ্রুপগুলো থেকে সারাদেশে প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত কুচক্র শ্রেণি অবিরত সে গ্রুপগুলো হ্যাক করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে হোয়াটসঅ্যাপের বেশ কয়েকটি নম্বরও হাইআকে পরিবর্তন করতে হয়েছে। তবে আইটি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় থাকায় কুচক্রি মহল এতে সফল হতে পারছে না।

তবে প্রশ্ন পাঠানোর এ পদ্ধতিটি সাময়িক। শুধু এই পরীক্ষাটা কোনোমতে শেষ করার জন্য তা গ্রহণ করা হয়েছে। পরীক্ষা শেষ হলে হাইআ কর্তৃপক্ষ সবার সঙ্গে পরামর্শ ও সমন্বয় করে স্থায়ীভাবে প্রযুক্তিনির্ভর আরও উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর হবে। এমনটাই জানিয়েছেন হাইআতের অন্যতম সদস্য মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু।

আগের সংবাদজামায়াতের সংস্কারপন্থীদের নতুন দলের ঘোষণা : আলেমরা যেভাবে দেখছেন
পরবর্তি সংবাদহয় বাঁচব না হয় মরব, মাথানত করব না : এরদোগান