চাকরীতে নিরাপত্তা নেই ইমামদের

মুসান্না মেহবুব

তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী আড়াই লক্ষেরও অধিক মসজিদ আছে আমাদের ছোট্ট এই ভূখণ্ডে। এক-আধটা বাদ দিলে প্রতিটা মসজিদেই আছেন একজন করে ইমাম। মসজিদ একটু সমৃদ্ধশালী হলে ইমামের সঙ্গে মুআজ্জিনও থাকেন, থাকেন জুমার নামাজের জন্য আলাদা খতিব এবং পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য এক বা একাধিক খাদেম।

ধর্মীয় পেশাজীবী এই শ্রেণিকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আলাদা সম্মানের চোখে দেখেন। সবার কাছেই আলাদা ভক্তি ও শ্রদ্ধার একটা জায়গা থাকে তাঁদের জন্য। তাঁদের এই পেশাকে নিছক চাকরি হিসেবে দেখতে চান না কেউই। ‘দীনের খেদমত’ হিসেবেই নিয়োজিত থাকেন এই পেশায়। তবে এখান থেকে প্রাপ্ত সম্মানী বা ভাতার ওপরই চলে তাঁদের অধিকাংশের পরিবার।

কিন্তু তাঁদের এই ‘খেদমতে’র স্থায়িত্ব ও উন্নতি প্রায় পুরোপুরিভাবে নির্ভর করে মসজিদ পরিচালনা কমিটির মর্জির ওপর। দুই-চারটি মসজিদ ব্যতিক্রম থাকলেও দেশের অধিকাংশ মসজিদেই ইমাম-মুয়াজ্জিনকে মসজিদ কমিটির মর্জিমাফিক চলতে হয়। কমিটির মর্জির উল্টো হলেই হারাতে হয় চাকরি।

রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরের মসজিদগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মসজিদ কমিটিতে ধর্মপ্রাণ নামাজি ব্যক্তির তুলনায় নানা অন্যায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ক্ষমতা ও দাপটশালী লোকদের অাধিপত্য ও প্রভাবই বেশি থাকে। যার ফলে ইমাম সাহেবগণ জুমাবারের আলোচনায় নির্দিষ্ট অনিয়ম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে প্রভাবশালী লোকেরা অসন্তুষ্ট হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইমাম সাহেবের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায়ও জড়িয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে ইমাম সাহেবকে হারাতে হয় চাকরি।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন-ভাতার নির্ধারিত স্কেল থাকলেও দেশের প্রায় কোনো মসজিদেই তা মানা হয় না। ফলে ইমাম সাহেবরা নিজেদের ন্যায্য সম্মানী প্রাপ্তি থেকেও বঞ্চিত হন। শহরের মসজিদগুলোতে এমন অনেক মসজিদ আছে, যেখানে ইমাম সাহেবের বেতন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। আর মফস্বল কিংবা গ্রামের মসজিদগুলোতে অধিকাংশ জায়গায়ই ইমাম সাহেবের বেতন দেড় থেকে আড়াই বা তিন হাজার টাকা ধরা হয়। অথচ এসব মসজিদের কমিটি চাইলেই ইমাম সাহেবদের বেতন-ভাতা সন্তোষজনক হারে উন্নীত করতে পারত। কোনো কোনো মসজিদে দেখা গেছে ইমাম সাহেবের বেতন একদম স্বল্প, কিন্তু মসজিদ কমিটির যাবতীয় নজর মসজিদকে কীভাবে দৃষ্টিনন্দন করা যায়, সেদিকে।

ইমামদের নিরাপত্তা, অধিকার ও ন্যায্য সম্মানী বিষয়ে কথা বলেছিলাম জাতীয় ইমাম সমাজের মহাসচিব ও পুরান ঢাকার চকবাজার শাহি মসজিদের ইমাম মুফতি মিনহাজ উদ্দীনের সঙ্গে।

মুফতি মিনহাজের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, দেশের বিভিন্ন জায়গায় কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই ইমামদেরকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার ব্যাপারে বা ইমামদের অধিকার ও চাকরি-নিরাপত্তা বিষয়ে তারা কোনো কাজ করছেন কি-না।

উত্তরে মুফতি মিনহাজ জানান, তাঁর সংগঠন ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি জায়গায় ইমাম ও মসজিদ কমিটির মধ্যে তৈরি হওয়া সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে। জাতীয় ইমাম সমাজ প্রায় বিশটির মতো জেলায় কাজ করে। প্রতিটা জেলায়ই বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের শাখা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে ইমামদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে শাখা দায়িত্বশীলরা ভূমিকা রাখেন। তাঁদের দ্বারা সমাধান না হলে কেন্দ্রীয়ভাবে তা সুরাহা করার চেষ্টা করা হয়।

তবে বাংলাদেশের মসজিদগুলোতে কমিটির যে স্বেচ্ছাচারিতা, তা খুব সহজে বন্ধ করা যাবে না বলে জানান তিনি। মুফতি মিনহাজ বলেন, সব মসজিদে তো আর এরকম হয় না, যে মসজিদগুলোতে এরকম হচ্ছে, সেগুলোর কোনো কোনোটাতে আলোচনা সাপেক্ষে সমাধান সম্ভব হয়, আবার কোনো কোনো মসজিদে আলোচনায় কোনো কাজ হয় না, একমাত্র প্রেশার ক্রিয়েট করে সমাধান নিতে বাধ্য করাই সেখানে একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে ইমামদের প্রেশার ক্রিয়েটমূলক কোনো সংগঠন গড়ে ওঠা যেমন সম্ভব নয়, তেম্নি ইমামরাও এটা চাইবেন না যে, চাকরি বাঁচানোর জন্য তাঁরা মিছিল মিটিং করবেন।

ইমামদের বেতনের স্কেল নিয়ে তাঁরা কিছু ভাবছেন কি-না জানতে চাইলে মুফতি মিনহাজ বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের যে স্কেল আছে, সেটা তো বলতে গেলে কেউই মানেন না। কেউ কেউ অবহেলা করে মানেন না ঠিক, তবে অনেক মসজিদ এমনও আছে, যেগুলোর আর্থিক কাঠামো সেভাবে মজবুত নয়। আমরা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করেছি, সেখানে আমরা দাবি জানিয়েছি, যে মসজিদগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো, সেখানে ফাউন্ডেশনের স্কেল মানতে বাধ্য করার জন্য ফাউন্ডেশন যেন যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

তবে আমরা সরকারের উচ্চপর্যায়ে ইতিমধ্যে আবেদন রেখেছি, দেশের প্রতিটা মসজিদে কমিটি কর্তৃক যে সম্মানী দেওয়া হয় ইমাম-মুআজ্জিনদেরকে, সেটা অক্ষুণ্ন রেখে সরকার থেকেও যেন প্রত্যেক ইমাম ও মুআজ্জিনের জন্য আলাদা একটা সম্মানী নির্ধারণ করা হয় এবং প্রতি মাসে সরকারি তহবিল থেকে তা প্রদান করা হয়। এ আবেদনের পর সরকারের তরফ থেকে এ ব্যাপারে আমরা ইতিবাচক ইঙ্গিত পেয়েছি। এখন অপেক্ষায় আছি, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের কল্যাণে সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবার।

আগের সংবাদসিলেটে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো দুই বোনের
পরবর্তি সংবাদঘূর্ণিঝড় ফনি ধেয়ে আসছে : সাগরে ৪ নম্বর সতর্ক সংকেত