হাফেজ্জী হুজুর : বাংলাদেশের কিংবদন্তি আলেম

কাজী মাহবুবুর রহমান

(বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে হজরত মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর রহ-এর সক্রিয়তা অভাবনীয় সাড়া ফেলেছিল পুরো দেশে। তাঁর রাজনীতি থেকে উদবুদ্ধ হয়েই পরবর্তী সময়ের ধর্মীয় রাজনীতিবিদেরা সাহস পেয়েছেন এই ময়দানে কাজ করার। হজরত হাফেজ্জি হুজুরের রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়েও বড় পরিচয় তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি আলেম ও আধ্যাত্মিক নেতা। তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনেতিহাস ফাতেহের পাঠকের জন্য তুলে ধরেছেন কাজী মাহবুবুর রহমান।)

জন্ম ও বংশ

কিংবদন্তী পুরুষের নাম ছিল মুহাম্মাদুল্লাহ। বৃহত্তর নোয়াখালির লক্ষীপুর জেলার অন্তর্গত রায়পুর থানার লুধুয়া গ্রামে ১৯১৩ হিজরী/ ১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে সম্ভ্রান্ত ধার্মিক পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি হাফেজ্জি হুজুর নামে সুপরিচিতি লাভ করেন। তাঁর পিতার নাম মুনশী মুহাম্মদ ইদরিস। তিনি ছিলেন উর্দু-ফার্সি ভাষার সুদক্ষ বিজ্ঞ আলেম ও মুবাল্লেগ। হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ) ছিলেন মাওলানা ইদ্রিস সাহেবের নয় ছেলে ও পাঁচ মেয়ের মধ্যে পঞ্চম। হাফেজ্জী হুজুরের দাদা মাওলানা আকরামুদ্দীন মিয়াজী ছিলেন আরেক কিংবদন্তী মুজাহিদ সাইয়েদ আহমদ শহীদ রহ. ও মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী (রহ.-এর খলিফা।

প্রাথমিক শিক্ষা

ব্যক্তিগত জীবনে নির্জনতাপ্রিয়, দীনের প্রতি অনুরাগী শিশু মুহাম্মদুল্লাহর বিকাশ ও বর্ধন ঘটে ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক চেতনার ছায়ায় ঘিরে থাকা পরিবারের বিশুদ্ধ পরিবেশে। তাঁর বেড়ে ওঠার দিনগুলিতে এই বিশুদ্ধতার ছাপ প্রস্ফুটিত হয়ে উঠতে থাকে। নিজ চাচার হাতে পবিত্র কুরআন শিক্ষা এবং পর পর দুজন শিক্ষকের কাছে প্রাইমারি লেখাপড়া সমাপণের পর দীনি ইলম অর্জনের পথে তাঁর এক ভূবন-বিজয়ী সফরের পথ প্রশস্ত হতে থাকে। নানাবিধ প্রতিকূলতা এবং প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে বিস্ময়কর গতিতে তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন গন্তব্যের দিকে।

হাফেজ্জী হুজুর বর্তমান সময়ের মতো জীবনের শুরুর দিকে হিফজ সম্পন্ন করার সুযোগ পাননি। তখন বাংলাদেশের এই অঞ্চলে হিফজ করার মতো অবস্থা ছিল না। প্রথমে তিনি লক্ষীপুর পশ্চিম চন্দ্রগঞ্জের মাওলানা উসমান গনীর কাছে প্রাথমিক দীনি কিতাবাদি পড়া শুরু করেন ৷ এখানে তিনি ফারসি ভাষায় রচিত আল্লামা শেখ সাদীর গুলিস্তাঁ ও বুস্তাঁ, আখলাকে মুহসেনী, ইউসুফ-যোলায়খা প্রভৃতি কিতাব এবং নাহু-সরফের মীযান, মুনশাইব, নাহবেমীর, হেদায়াতুন্নাহু-সহ সংশ্লিষ্ট জামাতগুলোর বিভিন্ন বিষয়ের কিতাবসমূহ অধ্যায়ন করেন। এখানকার পড়াশোনা চলাকালীনই তাঁর হৃদয় ব্যাকুল ছিল পবিত্র কুরআন শরিফ হিফজ করার জন্য। তখন কুরআন হিফজ করার বিখ্যাত অঞ্চল ছিল ভারতের পানিপথ। কুরআন হিফজের জন্য পানিপথ যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি তখন হিমশিম খাচ্ছিলেন৷ এসময় মহান আল্লাহ তায়ালা এক বিচিত্র উপায়ে তাঁর সেই স্বপ্ন পুরা করেন৷ তরুণ মুহাম্মদুল্লাহকে কুকুরে কামড়ে দেয়। সেই চিকিৎসার ওসিলায় দৈবক্রমে তিনি পানিপথ চলে যান৷ এবং হিফজ সম্পন্ন করেন।

আধ্যাত্মিক শিক্ষা

খুব ছোটবেলা থেকেই হজরত হাফেজ্জী হুজুরের মধ্যে মারেফতের চিন্তা প্রবল ছিল। ইলমে নববী হাসিলের জন্য যেমন ভালো উস্তাদদের নিকট যাতায়াত করতেন অনুরূপ মারিফাতে এলাহির প্রেরণায় পীর-দরবেশদেরও মনে মনে খোঁজ করতেন। তাঁর জায়গির-বাড়ি ছিল একজন দরবেশ ও সুফি সাহেবের। হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহঃ দরবেশ সাহেবের যিকির-আযকার দেখে তাঁর প্রতি ঝুঁকে পড়লেন এবং সকাল-বিকাল তার সঙ্গে যিকিরে যোগ দিতে লাগলেন। দরবেশ সাহেব হযরত হাফেজ্জী (রঃ)-এর এই আগ্রহ লক্ষ করে বিভিন্ন মজলিসে তাঁকে নিয়ে যেতেন। হজরত হাফেজ্জী (রঃ)-এর অভ্যাস ছিল গুনাহ থেকে দূরে থাকা এবং অনর্থক কথা কাজে লিপ্ত না হওয়া। সর্বদা আল্লাহর যিকির করা ছিল তাঁর অন্তরের নেশা। তাঁর হৃদয়ে আল্লাহওয়ালা হওয়ার বাসনা প্রবল হতে লাগল।

কথিত আছে, মহান সাধক শেখ সাদীর বোস্তা কিতাবের এ কবিতাটি যেদিন তিনি উস্তাদের নিকট পড়ে ছিলেন–
چوں روزےبہ بيچار گى جاں دہى * بس آں بہ برپائے جانان د ہى

অর্থ–নিঃস্ব রূপে যখন তোমার প্রাণ দিতেই হবে, তখন সেই প্রাণটি প্রিয়তমের চরণে লুটিয়ে দেওয়াই তো তোমার জন্য উত্তম–সে দিন থেকেই তাঁর মনে সৃষ্টি হয় জাগতিক বিলাসের প্রতি এক চরম অনীহা। আকাবিরের সংস্পর্শে সাধনাদীপ্ত উজ্জ্বল জীবন গড়ার প্রত্যয়ে, আল্লাহর প্রেমে সমৃদ্ধ আদর্শ মানুষ হওয়ার জন্য বার বার তাঁর মন ছুটে গেছে দীন ও ইলমে এলাহির নানা কেন্দ্রের দিকে। মারেফতের প্রতি তাঁর এ আকুলতা সফল হয় পানিপথের হেফজখানায় থাকাকালেই। সেখানেই পরিচয় ঘটে উপমহাদেশের বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক রাহবার মাওলানা আশরাফ আলি থানভি রহ.-এর সঙ্গে৷

উচ্চশিক্ষা

১৩৩৩ হিজরিতে হাফেজ্জী হুজুর রহ. ভর্তি হন ভারতের বিখ্যাত মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর মাদরাসায়। সেখানে সাতবছর পড়াশোনা করে ১৩৪০ সালে ভর্তি হন দারুল উলুম দেওবন্দে। এগার-বার বছরের ভারত-পড়াশোনার জীবনে একটি দিনের জন্যও ক্লাসে অনুপস্থিত থাকেননি হাফেজ্জী হুজুর৷ এই দীর্ঘ দিনে বাড়িতে এসেছেন মাত্র একবার। পড়াশোনার পর তিনি হযরত থানভি (রঃ)-এর হাতে বাইয়াত হওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করলে থানভি তাঁকে বাইয়াত করেন। এবং খানকায়ে এমদাদিয়াতে অবস্থানের অনুমতি প্রদান করেন৷

কর্মজীবন

হাফেজ্জী হুজুর খানকায়ে এমদাদিয়াতে কিছুকাল কাটিয়ে দেশে ফিরে আসেন। সঙ্গে ছিলেন অন্তরঙ্গ বন্ধু মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী ও মাওলানা আব্দুল ওয়াহাব পীরজী রহ.। দেশে এসে এই তিন রত্ন একসঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইউনুসিয়াতে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিছুদিন পর হাফেজ্জী হুজুর চলে আসেন বাগেরহাটে। এখানে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে কিছুদিন পর ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৩২ সালে বড় কাটারা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

এরপর থেকে নিয়ে একেবারে সত্তুরের দশকের শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের কাছাকাছি সময় তিনি কাটিয়েছেন হাদিসের দরস, আধ্যাত্মিক আমল ও বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষার উন্নতির পেছনে পরিশ্রম করে৷ বাংলাদেশের কোণায় কোণায় সফর করেছেন দেশের মানুষের কাছে দীনের সহিহ বার্তা পৌঁছে দেয়ার লক্ষে। তিনি ছিলেন আজীবন বিনয়ী, নির্জনতাপ্রিয় একজন সাধক মানুষ৷ যতক্ষণ নিজ বাসস্থানে থাকতেন, ততক্ষণ নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, অথবা তসবিহ পড়া ছাড়া অন্য কাজে তাঁকে সময়ের অপচয় করতে দেখা যায়নি কখনো।

রাজনীতিতে অংশগ্রহণ

এমন অন্তর্মুখী মানুষটিই ১৯৮১ সনের সেপ্টেম্বর মাসে হঠাৎ করে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। জনতার মঞ্চে এসে ঘোষণা দেন, ‘হে জাতি! তোমরা আল্লাহর দিকে ধাবিত হও। তওবা করো। অপাত্রে ভোট দিয়ে যে ভুল তোমরা করেছে, এখন সুপাত্রে ভোট দিয়ে তার প্রায়শ্চিত্ত করো। ভোটের পাপ ভোট দিয়েই মোচন করো।’ ভীষণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ডুবে থাকা ওই সময়ে মাওলানা হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর এই সরল সহজ এবং সুস্পষ্ট আহবান বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘তওবার রাজনীতি’ নামে অভিহিত হয়।

হাফেজ্জী হুজুরের রাজনীতিতে আসার ঘোষণা প্রক্রিয়ায় বন্ধু-শত্রু সকলেই হকচকিয়ে যায়। পাহাড়ের মত স্থির নব্বই বছরের বৃদ্ধ এই অভিভাবক সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে ধীর পায়ে বীরদর্পে এগিয়ে যেতে থাকেন৷ ৮১ সনে প্রেসিডেন্ট এরশাদের একরোখা স্বৈরনীতির নির্বাচনে তাঁর সেই খেলাফত আন্দোলন চূড়ান্ত সফলতার দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে আসে। কিন্তু পিছপা হননি তিনি। আমৃত্যু দীন ও শরিয়াহর এই লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি। ইরাক-ইরান ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধকালীন হজরত হাফেজ্জী হুজুরের সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগ, তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরও একটি অন্যতম সাড়া জাগানো উপাখ্যান। সর্বোপরি তিনি হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্যই একজন অবিসংবাদিত নেতা। ধুলার তখতে বসে পৃথিবী শাসন করার মতো জীবন ছিল তার। বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুব অল্প সময়ই তিনি ছিলেন। এসেছেন, দেখেছেন, চলেও গেছেন। তবে শিখিয়ে গেছেন অনেক কিছু৷ একটা ঘুনেধরা জাতিকে উত্তরণের রুপরেখা হাতে কলমে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন।

ইন্তেকাল

বিস্ময়কর এই সাধক পুরুষ, তওবার রাজনীতির প্রবর্তক, আমিরে শরিয়ত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর ১৯৮৭ সালে ৭ই মে ৯৫ বছর বয়সে ৮ই রমজান সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ইদগাহে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত কামরাঙ্গীরচর মাদরাসায়ে নুরিয়া প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

আল্লাহ তাঁর এই সাধক বান্দাকে মাগফেরাত দান করুন।

আগের সংবাদভিন্ন জাতে বিয়ে করায় ভারতের এক হিন্দু বাবা পুড়িয়ে মারল নিজের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে
পরবর্তি সংবাদনাইজারে তেলের ট্যাংকার বিস্ফোরণে নিহত ৫৮