খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর : একজন কর্মবীর আলেম

আল মাসুদ আবদুল্লাহ

আমি ড. খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যারকে দেখিনি। একবার উনি আমার বাসা থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে এসেছিলেন, সেবারও দেখার সৌভাগ্য হয়নি। দেখলে হয়তো তাঁকে খণ্ড খণ্ডভাবেই পেতাম। কেননা চোখের দেখা হারিয়ে যায়, বিস্মৃত হবার সমূহ সুযোগ থাকে। শুনে-শুনে এবং বই পড়েই তাঁকে জেনেছি, চিনেছি। এরফলে আমি বোধহয় তাঁর সামগ্রিক রূপটাই দেখতে পেয়েছি।

তিনি এমন অসাধারণ ছিলেন যে, সে সময়ের লোকেরা কেউ তাঁকে ঘৃণা করেছেন, কেউ ভালোবেসেছেন, কেউ বা করুণা করেছেন, কিন্তু কেউ তাঁকে অস্বীকার করতে পারেননি। এই অস্বীকার করতে না পারার ব্যাপারটা ঠিকমতো প্রতিভাত হয় প্রথমত তাঁর জানাজাতে, দ্বিতীয়ত ফেসবুকে বিভিন্ন ঘরানার আলেমদের প্রতিক্রিয়ায়।

তাঁর মূল পড়াশোনা আরবে হলেও আরবের প্রচলিত মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হননি। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রজ্ঞায় প্রবুদ্ধ। জগৎ ও জীবনকে সুন্নাহর চোখে দেখবার, জানবার ও বুঝবার প্রয়াসী ছিলেন। এজন্যই তিনি আরব থেকে পড়ে এসেও এই বাংলা মুলুকে আরবের প্রচলিত মতবাদ প্রচার করেননি। বরং বাংলাদেশে সমাজ পরিবেশ রাষ্ট্র বুঝে তাঁর দাওয়াত ছড়িয়েছেন। তিনি আরব শায়খদেরকে উদ্দেশ্য করেই বলেছেন, আপনারা তাবলিগ জামাআতকে কোন দেশে বসে দেখছেন? আরব দেশে বসে দেখছেন, নাকি বাংলাদেশে বসে দেখছেন? দূর থেকে শুনে একটা বিষয়ে ফতোয়া দেওয়ার দূরদর্শিতা নিয়ে তিনি ব্যাপক সচেতন ছিলেন। এজন্যই তিনি তাঁর শ্বশুরের খেদমতকে অস্বীকার করেননি, বরং স্বীকার করেই তাঁদেরকে সুন্নাহর দিকে টেনে এনেছেন। তিনি দেখিয়ে গেছেন যে প্রচলিত সিস্টেমের মধ্যেই কীভাবে মানুষকে সুন্নাহর দিকে ডাকা যায়। তিনি ডেসট্রাকটিভ ছিলেন না, আরব থেকে এসে এই মুলুকের সমস্ত মেহনত হালের সালাফিদের মতো অস্বীকার করেননি। তিনি সমস্ত মেহনত স্বীকার করেছেন, তাদের ভুলের ব্যাপারে ওজরখাহি করেছেন, এবং সুন্নাহটা জানিয়ে দিয়েছেন। দেশকাল বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে দূরদর্শী আলেম এই মুলুকে আমি আর দেখিনি।

দেশের আলিয়া ঘরানার মাদরাসায় প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা কৃতিত্বের সঙ্গে শেষ করে উচ্চতর পড়াশোনা করতে গেছেন আরবে। সেখানেও রেখেছেন সাফল্যের সাক্ষর। একাধিকবার সেরা ছাত্রের পুরষ্কার পেয়েছেন। পিএইচডি শেষে কাজ করেছেন দাওয়াহ সেন্টারে। ইংরেজি ভাষা জানার দরুণ আমেরিকান সৈন্যদের মাঝেও দাওয়াতি কাজ করেছেন। এরপর মানুষের মধ্যে সুন্নাহর প্রচারের জন্য ফিরে এসেছেন দেশে।

মানুষের মন কখনোই শূন্য থাকে না। সুন্নাহ না থাকলে বিদআত বাসা বাঁধবেই। তাই গড়ার আগেই তা ভাঙতে হয়। এই লক্ষ্যে তিনি লিখলেন, এহইয়াউস সুনান। এটিই স্যারের লেখা প্রথম বই। এই বইয়ে তিনি যুগযুগ ধরে আচরিত ও প্রচারিত বিদআতের মূলে আঘাত করেছিলেন এবং জায়েজ না-জায়েজের অশেষ বিতর্ক, যুক্তির মারপ্যাঁচ বাদ দিয়ে মানুষকে সুন্নাহর দিকে ডাকা ছিল এই বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য। সুন্নাতের মধ্যেই রয়েছে সকল রহমত এবং বরকত—এটাই হচ্ছে বইটির মূল আলোচ্য। তাঁর সংগ্রামই ছিল মূলত সুন্নতের পুনরুজ্জীবনে ও বিদআতের বিসর্জনে। নবিজীবনের বিভিন্ন অনুষঙ্গ এবং সালফে সালেহিনদের লিখনী থেকে সুন্নাহর বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা তিনি এই গ্রন্থে সংকলিত করেছেন। এই বইয়ের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট হলো, তিনি কোনো আমলকে শুধু বিদআত বলেই ক্ষান্ত হননি, তিনি এই আমলের বিপরীতে উত্তম বিকল্প দিয়েছেন। এটা শুধু তাঁর এই বইয়েরই বৈশিষ্ট্য নয়, বরং বয়ানেও এই ধারা বজায় রেখেছিলেন।

আমাদের দেশের আলেমসমাজ সেই প্রথম থেকেই হাদিসচর্চার দিক দিয়ে পিছিয়ে। এরফলে ওয়ায়েজদের মুখে এবং মনগড়া কিছু বইয়ের মাধ্যমে এদেশে ব্যাপক আকারে জাল হাদিসের চাষ হয়েছে। এইক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় জাল হাদিসের গ্রন্থ লেখার ব্যাপারে তাঁকে পথিকৃৎই বলা চলে। তিনি আমাদের সামনে হাজির করেছেন হাদিসের নামে জালিয়াতির মতো ঢাউস বই। যেখানে হাদিস সংকলনের ইতিহাস থেকে শুরু করে প্রচলিত জাল হাদিসের তালিকাও দেওয়া হয়েছে। বাংলা ভাষায় জাল হাদিসের ব্যাপারে এটাই সবচেয়ে প্রামাণ্য বই।

তিনি তাঁর বয়ানে বার বার বলেছেন আল্লাহর ওলি হওয়া সবচেয়ে সহজ কাজ। স্বভাবতই আমাদের ধর্মপ্রাণ মুসুল্লিরা এই কথা শুনে অবাক হয়েছেন। কারণ, আল্লাহর ওলি যে হতে হয় এবং হওয়াটা যে সহজ এটা বাঙালির জন্য নতুন। তারা সবসময় ওলির দুআ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে। তো, বেলায়াতের সুন্নাহভিত্তিক পথ নিয়ে রচিত তাঁর বই রাহে বেলায়াত। এবং এটাও বাংলা ভাষায় রচিত সবচেয়ে বিস্তারিত জিকির অজিফা ও আত্মশুদ্ধি রিলেটেড বই এবং স্যারের সবচেয়ে জনপ্রিয় বই। এই বইয়ের বিক্রয়সংখ্যা এতদিনে ৩/৪ লাখ পেরিয়ে গেছে। আমাদের এলাকায় কম বাড়িই পাওয়া যাবে যে বাড়িতে রাহে বেলায়াত নেই।

তিনি এত বিচিত্র বিষয়ে কলম ধরেছেন যে তাঁর কথা এই আলোচনায় শেষ করা সম্ভব নয়। তিনি যে বিষয়েই কলম ধরেছেন, সেই বিষয়েই তিনি পথিকৃৎ হয়েছেন। তাঁর বিষয়চয়ন ছিল সম্পূর্ণ মৌলিক এবং যুগের চাহিদা মুতাবিক। এহইয়াউস সুনান, হাদিসের নামে জালিয়াতি, ইসলামী আকীদা, রাহে বেলায়াত, ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ, পবিত্র বাইবেল পরিচিতি ও পর্যালোচনা–এই ধারারই বই। প্রত্যেকটি বই-ই ঐ বিষয়ের প্রামাণ্য বই বলেই বিবেচিত।

একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে লেখাটির ইতি টানছি। স্যার রাহ. তাঁর জীবদ্দশাতেই আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন। একক ব্যক্তির লেখা সংবলিত একমাত্র প্রকাশনী বোধহয় এটিই। আপনি কি জানেন, ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহ. বাংলাদেশের একক লেখক হিসেবে বেস্টসেলার লেখক? ইসলামি জ্ঞানের বিশুদ্ধ বই তিনি এমন সুখপাঠ্য ও সাবলীল করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছেন যে, তাঁর বই শুধু ইসলামি ঘরানায় নয়, পুরো বাংলাসাহিত্যের অঙ্গনে বেস্টসেলারের তালিকায় চলে এসেছে। শুধুমাত্র ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে তাঁর লিখিত বই থেকে আয় হয়েছে দুইকোটিরও বেশি টাকা। তাঁর বই একেক সংস্করণে প্রায় ১০ হাজার কপি ছাপানোর কয়েক মাসের মধ্যেই আবার পুনর্মুদ্রণ করা লাগে। না ফেরার দেশে গিয়েও তিনি লেখক হিসেবে এখনও বেস্টসেলার।

হে আল্লাহ, আপনি তাঁকে রহমত ও মাগফেরাতের চাদরে ঢেকে নিন। তাঁর খেদমতকে কবুল এবং স্থায়ী করুন।

আগের সংবাদনুসরাত হত্যা : দুই এসআই সাময়িক বরখাস্ত, এসপিও শাস্তির মুখে
পরবর্তি সংবাদভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি : নিহত ৬ বাংলাদেশির পরিচয় শনাক্ত