খুররামিয়াহ : ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন

মুজাহিদুল ইসলাম

হাল আমলের সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ ও বামনীতির আহবান আধুনিক চিন্তারই ফসল এমন নয়। আধুনিক যুগের মার্কস, এঙ্গেলস, লিওন ত্রোৎস্কি, লেলিন ও স্টালিন প্রমুখের ইশতিহার-বাস্তবায়ন চেষ্টায় প্রতাপশালী জার, সামান্তবাদ ও অভিজাত শ্রেনীর বিরুদ্ধে সংগঠিত হয় বলশেভিক বিপ্লব। খরচের খাতায় চলে যায় রুশ ধনিক শ্রেনীর শাসন। শ্রমিক ও কৃষকদের অধিকারের ফাকা বুলির অনুরুপ আহবান এক হাজার বছর পূর্বে ইসলামের ইতিহাসেও বিদ্যমান। যদিও হুবহু মিল পাওয়া কঠিন; তবে চিন্তা ও তত্ত্বগত সাদৃশ্যতা তো বিদ্যমান।

এ আন্দোলন মানুষের মাঝে বেশ দ্রুত সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়। দ্রুতই মানুষের মাঝে প্রসার পায়। ইরান হতে দক্ষিন ককেশাস পযন্ত চলতে থাকে এর লম্ফঝম্ফ। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক, আদর্শিক ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার কারণে তারা ইরানে ব্যাপক জনসমর্থন পায়। যেহেতু এ অঞ্চলে ইসলামের বিজয়াভিযান এবং তার পরবর্তী উমাইয়্যা ও আব্বাসী শাসনে আঞ্চলিক ক্ষমতার দন্ড হতে পারস্যদের সরিয়ে তাদের সাধারণ জনগণের কাতারে নিয়ে এসেছে। যা এ অঞ্চলের পূর্বের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা গোষ্ঠীর ভালো লাগেনি। এরই ফলশ্রুতিতে ঘটনামঞ্চে এ রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবিত্তিক এ আন্দোলন টানা বিশ বছর তার আবেদন অব্যাহত রাখে। তারা আব্বাসী সৈন্যদের পরাজিত করে হাজার হাজার মুসলিম সৈন্যকে হত্যা ও আটক করে।

হ্যা, এটা হলো বাবিক খুররামী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন। কে এই বাবিক খুররামী? কেনই বা তা ইরানের মাটিতে ডালপালা গজাতে সক্ষম হলো? আর কেনই বা তা অনবরত বিশ বছর ধরে আব্বাসী সৈন্যদের ওপর খবরদারী করতে পারলো? আর সর্বশেষ কীভাবে আব্বাসীরা এদের দমন করতে সক্ষম হলো! এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়েই নিচের লেখা।

বাবিকের আত্নপ্রকাশ ও তার মতাদর্শ

দ্বিতীয় শতাব্দীতে খলীফা হারুনার রশীদের মৃত্যুর পর তার দুই সন্তান আমীন ও মামুনের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যখন দেশ অস্থীতিশীল। ক্ষমতার লড়াইয়ে পরাজিত ও নিহত হন আমীন। দৃষ্টপটে চলে আসেন মামুন। কিন্তু তিনি খোরাসানের রাজধানী মারও থেকে রাষ্ট্রের রাজধানীতে বিলম্বে ফিরে আসেন। পূর্বের অস্থিরতার সাথে নবনিযুক্ত খলিফার অনুপস্থিতিতে চারিদিকে ফেতনা-ফাসাদ, ডাকাতি-রাহাজানি ও সশস্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে। এমনই সময় নতুন মতাদর্শ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন পূনর্জন্মবাদে বিশ্বাসী ‘মাযদাকিয়্যাহ’ মতাদর্শের ’ ‘জাবীদান’ এর শিস্য ‘বাবিক আল খুররামী’। তিনি তখন ‘মাযদাকিয়্যাহ’ মতাদর্শের প্রধান ছিলেন। জাবীদানের স্ত্রী দাবি করেন, জাবীদানের আত্না বাবিকের ভেতর স্থানান্তরিত হয়েছে। এ মতাদর্শীদের ইশ্বরত্বের প্রবেশ বিশ্বাস অনুসারে বাবিকের ভেতরও ইশ্বরত্বের প্রবেশ হয়েছে।

খুররামীরা ছিলো ইসলামী রীতিনীতি প্রত্যাখ্যানে বিশ্বাসী; বেশ্যাবৃত্তি ও সে সময়ের সমাজতান্ত্রিক বিশ্বাসই ছিলো তাদের পূজি। ঐতিহাসিকগণের বরাতে এমনই পাওয়া যায়। এমনকি ঐতিহাসিক ‘মাকদেসী’ তাদের সাথে বিতর্ক করেছেন। তাদের আকীদা-বিশ্বাস ও আহবান সম্পর্কে পূর্ণ অবগত হয়েছেন। তিনি বলেন, অন্যের ক্ষতি না করার শর্তে পারষ্পারিক সম্মতিতে নারীভোগ ও মন যা চায় তা করার বিশ্বাসীদেরকেই খুররামী বলে।

জনগণের মধ্যে কৃষক শ্রেনীর নিকট এ আন্দেলন বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়। এ আন্দোলনের অনুসারীরা ধণীদের থেকে জমি কেড়ে নিয়ে কৃষকদের মধ্যে বন্টন করে দিতো। উত্তর ইরানের জুরজান-অঞ্চলে খলিফা মামুনের শাসনামলে সরকারের প্রভাবশালী সদস্য ‘মাযয়ার’ রের সাথে বাবিকের বেশ সখ্য ছিলো।তার নির্দেশনায় ধনীদের থেকে জোরপূর্বক সম্পদ নিয়ে দরিদ্রদের মাঝে বন্টন করে দেয়া হতো।

সশস্ত্র সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন

মানুষের মাঝে আন্দোলন সমাদৃত হওয়াতে বাবিক অর্থনৈতিকভাবেও বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সে তৈরী করে ফেলে শক্তিশালী এক সৈন্যবাহিনী। ইসলামের শত্রুতা ও আরব রাজনৈতিক প্রভাব ক্ষুন্ন করাই যার রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। এক্ষেত্রে হামাযান হতে আযারবাইজান, আর্মেনিয়া ও দক্ষিন ককেশাসের পাহাড়ী এলাকা তাদের এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সঙ্গ দেয়। এ জটিল পাহাড়ী অঞ্চলের মাধ্যমে নিজেকে ও নিজের অনুসারীদের সে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। তারা ‘বায’ শহরকে তাদের রাজধানী হিসেবে গ্রহন করে।

আব্বাসীদের বিরোধিতায় যা কিছু করা প্রয়োজন, সে তা করতো। এমনকি আব্বাসীদের শত্রু বাইজেন্টিয়ানদের সাথে গোপনে আলোচনা চালায়। যাতে তারা প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতা করে। উভয় পক্ষ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি সম্পন্ন করে। বাইজেন্টিয়ানদের সাথে মিলে আব্বাসী সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশও নেয়। ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্যমতে সমাজতান্ত্রিক বাবিক অনুসারীদের সৈন্যসংখ্যা ছিলো বিশ হাজার হতে ষাট হাজার। কোন কোন সূত্র মতে তার সৈন্যসংখ্যা তিন লক্ষ। তারা বিশ বছর ধরে আব্বাসী খেলাফাতের গলার কাটা হয়ে ছিলো।

গহীন পাহাড়ী এলাকায় আব্বাসী সীমান্তরক্ষীদের দূর্বলতার সুযোগে খুব সহজেই আব্বাসী সৈন্যদের সরবরাহ লাইন বন্ধ করে দিতো। তাদের কাফেলা লুন্ঠন করতো। আব্বাসী খিলাফাতের অংশ আযারবাইজানের দূর্গগুলো ধ্বংস করে আব্বাসীদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দূর্বল করে দেয়। দিনে দিনে পাহাড়ী এলাকার যুদ্ধে অভিজ্ঞ বাবিকদের মূলোৎপাটনে যত অভিযানই প্রেরণ করা হতো, সবই ব্যর্থ হতো।

মামুন তার খেলাফাতের দীর্ঘ সময়ে এ সশস্ত্র আন্দোলন দমন করা তো দূরের কথা তাদেরকে ইরান ও আযারবাইজান হতে দূরে সরিয়ে দিতেও পারেননি। মৃত্যুর সময় তার ভাই যুবরাজ মু’তাসিম বিল্লাহকে দ্রুত সর্বশক্তি দিয়ে এ আন্দোলন দমন করার অসিয়ত করে যান।

খলিফা মু’তাসিম বিল্লাহ ও বাবাকী আন্দেলনের পতন

মামুনের ভাই মু’তাসিম বিল্লাহ দীর্ঘ সময় সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব পর্যায়ে থাকার কারণে সমরজ্ঞানে বেশ পাকাপোক্ত হয়ে ওঠেন। মু’তাসিমের মা তুর্কি হওয়ার কারণে তিনি তার সেনাবাহিনীতে তুর্কিদের বেশ স্থান দেন। এবং বাগদাদ হতে দূরে তাদের জন্য ‘সামরা’ নামে রাজধানী স্থাপন করেন। সমাজতান্ত্রিক বাবিক আন্দোলন ইরাক ও আযারবাইজান হতে ইরান পর্যন্ত এমনকি আর্মেনিয়া ও দক্ষিণ ককেশাস পর্যন্ত প্রসারিত বাবীকদের মূলোৎপাটনে মু’তাসিম বিল্লাহ পরিকল্পনা গ্রহন করেন।

মু’তাসিমের নির্দেশে ৮৩৩ ইংরেজীতে ইসহাক বিন ইবরাহিমের নেতৃত্বে প্রথম সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। আব্বাসী বাহিনী ইরানের খুররামী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন পরাজিত করতে সক্ষম হয়। এ অভিযানে তাদের ষাট হাজার সৈন্য নিহত হয়। বাকিরা রোমে পালিয়ে যায়।

মু’তাসিম আযারবাইজান ও পাহাড়ী অঞ্চলের খুররামীদের মূলোৎপাটনে তুর্কি সামরিক কমান্ডার হায়দার বিন কাওসকে দায়িত্ব দেন। তিনি বাগদাদ ও আযারবাইজানের মধ্যে সরবরাহ রুটকে নিরাপদ রাখার মাধ্যমে যুদ্ধের গতিপথ পাল্টে দিতে সক্ষম হন। আযারবাইজান ও তুর্কিদের রাজধানী সামরার মাঝে চার দিনের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থা করেন। এবং খলিফা মু’তাসিমকে আপডেট দেয়ার জন্য কবুতর ব্যবহার করেন। শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরীর মাধ্যমে খুররামীদের পরিকল্পনা জানতে সক্ষম হন। ঐতিহাসিক যাহাবীর মতে মু’তাসিম বাবিকদের সাথে লড়াইয়ে এক মিলিয়ন দিরহাম  ব্যয় করেন।

তুর্কি কমান্ডার হায়দারের নেতৃত্বে খুররামীদের বিভিন্ন দূর্গের পতন ঘটতে থাকে। একপর্যায়ে খুররামীদের রাজধানী ‘বায’ এ পৌছে তা অবরুদ্ধ করে ফেলেন। তার হাতে বাবিকদের রাজধানী ‘বায’ এর পতন ঘটে। বাবিক আর্মেনিয়ায় দিকে পালিয়ে যায়। হায়দারের নির্দেশনায় তার অনুসারীরা তাকে গ্রেফতার করে আনেন।

হায়দার সমাজতান্ত্রিক খুররামী আন্দোলনের পতন ঘটান। অবসান ঘটান তাদের প্রতিপত্তির। উদ্ধার করেন আব্বাসী খেলাফাতের হাজার-হাজার সৈন্যদের। ঐতিহাসিক তাবারীর মতে বাবিকের হাতে আটক মুসলিম সৈন্যদের সংখ্যা ছিলো সাত হাজার। বাবিককে বেড়ি পরিয়ে ‘সামরা’তে আনা হয়। বাবিকের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে মাথা পুরা শহরে ঘোরানো হয়। যাতে করে মানুষের অন্তর হতে তার ও তার অনুসারীদের প্রভাব দূর হয়ে যায়।

দীর্ঘ বিশ বছরের অব্যাহত লড়াইয়, লাখ-লাখ দিনার, শত-শত শহীদ ও হাজার বন্দীদের বিনিময়ে আব্বাসীরা দ্বিতীয় হিজরীর ইসলামের ইতিহাসের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে পরাজিত করতে সক্ষম হন।

আগের সংবাদপ্রতারক চক্রের বারেক সরকারসহ আটক ৫
পরবর্তি সংবাদবুরকিনা ফাসোর গির্জায় গুলি, নিহত ৬