
বিশেষ প্রতিবেদক
সম্মিলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিলজামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ-এর অধীনে অনুষ্ঠিত এ বছরের দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় একাধিকবার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল পরীক্ষার্থীদেরকে। সেই সঙ্গে পেরেশানি ও চাপে পড়েছিল হাইআতুল উলয়া কর্তৃপক্ষও।
এবারের প্রশ্নফাঁসের ঘটনা কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার ইতিহাসে এই প্রথম। সততা আদর্শ ও ঐতিহ্যবাদিতায় আপোষহীন হবার কারণে এ ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা কেউ কল্পনাও করতে পারত না। কারণ, এ ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রদের পড়াশোনা পরীক্ষা ও রেজাল্ট নির্ভর ছিল না কোনো কালেই, ছাত্ররা পড়ত যোগ্যতা অর্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, পরীক্ষা ছিল তাঁদের কাছে কেবলই মেধা যাচাইয়ের একটি মাধ্যম।
অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এ বছর কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায়, এ ধারার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা যেমন মর্মাহত হয়েছেন, তেম্নি হয়েছেন লজ্জিত ও হতবাক।
তবে আশার কথা হলো হাইআতুল উলয়া বাংলাদেশ কিংবা অন্যান্য দেশের শিক্ষাবোর্ডের মতো কোনো ধরনের তালবাহার আশ্রয় নেয়নি। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠামাত্রই সম্মিলিত এ কওমি শিক্ষাবোর্ড সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যাওয়া সব পরীক্ষা বাতিল ও পরবর্তী পরীক্ষাগুলো স্থগিত করে নতুনভাবে নতুন প্রশ্নপত্রে আবারও পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করে। দ্বিতীয় বার আবারও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলে তখনও বোর্ডটি এর দায় স্বীকার করে ফাঁসকৃত প্রশ্নের পরীক্ষা বাতিল করে অভিনব পদ্ধতিতে পরবর্তী পরীক্ষাগুলো গ্রহণ করে। হাইআতুল উলয়ার এ সততা স্বচ্ছতা এবং অভিনবত্ব সর্বমহলে প্রশংসিত হয়।
প্রথম বার প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পরপরই হাইআতুল উলয়ার উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন আলেমের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কথা ছিল তদন্ত কমিটি খুব দ্রুত প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদেরকে কঠোর শাস্তির জন্য আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাবে। কমিটি গঠনের কয়েকদিনের মধ্যে মেশকাতের প্রশ্নফাঁসকারীকে চিহ্নিত করে তাঁর কাছ থেকে লিখিত স্বীকারোক্তি নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিচার করা হবে বলে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু দাওরায়ে হাদিসের প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্ত এখনও চলছে। তদন্ত কমিটি কঠিন গোপনীয়তা রক্ষা করে মাস দেড়েক ধরে চালাচ্ছে এ তদন্ত। তদন্তের কাজ কতদূর এগোলো, কাউকে সনাক্ত করা গেছে কি-না—কোনো বিষয়ে এখনই মুখ খুলতে রাজি না তদন্ত কমিটির সদস্যগণ। তবে সপ্তাহ দুয়েক আগে তদন্ত কমিটির সদস্য মাওলানা মাহফুজুল হকের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে তদন্তের কাজ মন্থর গতিতে এগোচ্ছে।
ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে এ বিষয়ে আবারও খোঁজ নেওয়া হয়েছে আজ। জানার চেষ্টা করা হয়েছে, তদন্তের কাজ চলছে, নাকি থমকে গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাইআতুল উলয়ার উচ্চ পর্যায়ের এক নেতা জানিয়েছেন, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে বেশ কয়েকটি গ্যাং জড়িত ছিল। এর মধ্য থেকে কয়েকটি গ্যাং সনাক্ত করা গেছে ইতিমধ্যে। তবে এ ব্যাপারে হাইআতুল উলয়া প্রশাসনের সহায়তা নিয়েছে। প্রশাসনের গোয়েন্দা বিভাগই সনাক্ত করেছে এই গ্যাংগুলোকে।
তিনি জানান, রমজান মাসের কারণে আপাতত স্থগিত রয়েছে তদন্তের প্রক্রিয়া। রমজানের পরপরই আবার শুরু হবে এবং শাওয়ালের তৃতীয় সপ্তাহে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে আগেই এদের নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের প্রচলিত আইনে নেওয়া হতে পারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও।
তবে উচ্চপর্যায়ের অপর একটি সূত্রমতে প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে উঁচু পর্যায়ের দু-একজন নেতৃস্থানীয়ের ঘনিষ্টজন বা খাদেম পর্যায়ের লোক জড়িত থাকার কারণে ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দেওয়ার এবং আভ্যন্তরীণভাবে তাদেরকে ক্ষমা করে দেবার একটা সম্ভাবনাও রয়েছে।
