
কাজী মাহবুবুর রহমান
সম্রাট শাহজাহান ও মুমতাজ মহলের প্রেম কাহিনি বিশ্বের সাড়া জাগানো প্রেম কাহিনিগুলোর মধ্যে অন্যতম। মোঘলদের ভেতর প্রেমিক পুরুষ হিসেবে খ্যাত ছিলেন শাহজাহান। ভালবেসেছিলেন তাঁর অনিন্দ্য সুন্দরী স্ত্রী মুমতাজ মহলকে। পৃথিবীতে অনেকেই প্রিয়জনকে অনেক বেশি ভালবাসে, কিন্তু নিজের ভালবাসাকে চির অমর করে রাখার সাধ্য সকলের হয় না। শাহজাহানের যেমন ভালবাসার মতো হৃদয় ছিল, তেমনি তাঁর সাধ্যও ছিল প্রিয়জনের জন্য অমর কীর্তি নির্মাণ করার।
মুমতাজ মহল ছিলেন বিশ্বের খুব সীমিত কিছু সৌভাগ্যবতী নারীর একজন। যাঁর নামে তৈরি হয়েছে বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম এক আশ্চর্য৷ পৃথিবীর বুকে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে তাঁদের ভালবাসার এই কিংবদন্তি ইতিহাস। ভ্রমণপ্রেমী মানুষেরা বিশ্বের আনাচ কানাচ, দূর- দূরান্ত থেকে ছুটে আসবে তাঁদের চির অম্লান প্রেমের নজির দেখতে। তাঁদের প্রেমগাঁথাকে স্মরণ করে ভালবাসায় আপ্লুত হতে।
পরিচয়
মুমতাজমহল তাঁর ডাকনাম। মূল নাম আরজুমান্দ বানু বেগম। মুমতাজ মহলের অর্থ হলো, প্রাসাদের অলংকার। নামের প্রতি সুবিচারের এক চির উজ্জ্বল উপমা থাকবেন এই আরজুমান্দ বানু ওরফে মুমতাজ মহল। পিতার আশ্রয়েও তিনি ছিলেন আদরের অলংকার। স্বামী-ঘরে এসে তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্ব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মহাপ্রতাপশালী মোঘল সাম্রাজ্যকে দীর্ঘদিন আলো দিয়ে রাখেন এই মহীয়সী নারী।
মুমতাজ মহল ১৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ভারতের আগ্রায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন পারস্যের মহানুভব আবদুল হাসান আসাফ খান। তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নূর জাহানের ভাই। মুমতাজ মহলের পিতা ছিলেন ইসলাম ধর্মের একান্ত অনুরাগী একজন ধার্মিক শাসক।
শাহজাহানের সাথে পরিণয়
একদা সম্রাট শাহজাহান আগ্রার বাজার দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। কোনো একটি বিষয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন। সম্রাটের বয়স তখন মাত্র ২০ বছর। তনু-মন, সব দিক থেকেই তিনি টগবগে যুবক। ছিলেন একজন সুশ্রী তরুণ। বাজারে পথ চলতে চলতে বাদশাহর চোখ পড়ে যায় তরুণী মুমতাজ মহলের দিকে। বাদশাহর চেহারা থেকে চিন্তার ভাব নিমিষেই দূরীভূত হয়। এবং বাদশাহ এই অনিন্দ্য সুন্দরী তরুণীর সঙ্গ পেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। অতঃপর মোঘল রাষ্ট্রদূত মুমতাজ মহলের পিতার নিকট বাদশাহ শাহজাহানের পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে যান। মুমতাজ মহলের বাবা পারস্য সম্রাট আবদুল হাসান আসাফ খান এমন প্রস্তাব পেয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েন। এবং মেয়ের সৌভাগ্যের তারিফ করতে থাকেন। মুমতাজ মহলের বয়স তখন ১৯ বছর। এরপর ১৬১৬ খ্রিষ্টাব্দের কোনো এক শুভ দিনে মুমতাজ মহল পিতার প্রাসাদ ছেড়ে শাহজাহানের মোঘল রাজপ্রাসাদে চলে আসেন।
ব্যক্তিগত জীবন
বিবাহের আগ পর্যন্ত তিনি আরজুমান্দ নামেই পরিচিত ছিলেন। সম্রাট শাহজাহান তাঁর নাম পরিবর্তন করে রাখেন মুমতাজ মহল। মুমতাজই ছিলেন শাহজাহানের সবচেয়ে প্রিয় বেগম। উনিশ বছরের বিবাহিত জীবনে মমতাজের মোট চৌদ্দটি সন্তান হয়। তিনি অত্যন্ত রূপবতী এবং বহুবিধ গুণের অধিকারিণী ছিলেন। রাজকর্মচারী ও গৃহভৃত্যদের প্রতিও সদয় ছিলেন। রাজদরবার থেকে শুরু করে হেরেমের দাসীরা পর্যন্ত সকলেই তাঁকে ভালবাসত।
মৃত্যু
১৭ ই জুন ১৬৩১ সালে মমতাজ মহল ১৪তম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান।
তাজমহল
স্ত্রীর মৃত্যুর পর সাতদিন সাতরাত শাহজাহান কিছু খাননি। ঘর থেকেও বের হননি। সাতদিন পর শাহজাহান বাইরে বের হলেন। তখন তাঁর চুলের রং ধুসর হয়ে গেছে, মুখ ফ্যাকাসে।
স্ত্রী হারানোর শোকে মুহ্যমান শাহজাহান তাঁর প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর স্মৃতির জন্য নির্মাণ করেন ভালবাসার এক অপরূপ নিদর্শন ‘তাজমহল’। যাতে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কাজ করেছিল, প্রায় ১ হাজার হাতি ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেই স্থাপত্যের নির্মাণ কাজ শেষ হতে প্রায় ২০ বছর সময় লেগেছিল।
তাজমহলের নির্মাণ কাজ শেষ হতে না হতেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ফলে শেষ বয়সে তাঁকে গৃহবন্দী হয়ে থাকতে হয় । তাই সেই অনিন্দ্য সুন্দর মার্বেল পাথরের সৌন্দর্য তিনি সম্পূর্ণ দেখে যেতে পারেননি।
যমুনার তীরে, যেখানে `তাজমল` গড়ে উঠেছিল, শেষজীবনে শাহজাহান ঐখানে একাকী সময় পার করেছেন। মৃত্যুর পর তাঁকেও সেখানে সমাহিত করা হয়।
