
পুরোনাম মীর আবদুশ শুকুর আল মাহমুদ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্ম ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই। পিতা মীর আবদুর রব, মায়ের নাম রওশন আরা মীর। দাদা আবদুল ওহাব মোল্লার বিশাল জমিদারি ছিল হবিগঞ্জ জেলায়। পরবর্তীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসে নতুন করে বাড়ি করেন। মোল্লাবাড়ি নামে এলাকায় মশহুর ছিল আল মাহমুদদের বাড়ি। সম্ভ্রান্তি ও আভিজাত্যের কারণে এলাকার মানুষজন তাঁদেরকে আলাদা তাজিম করত।
পড়াশোনার হাতেখড়ি পরিবারেই, তারপর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জর্জ ফিফথ হাই স্কুল, কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাই স্কুলে মাধ্যমিক সমাপ্ত করেন। দাদার জারি গান, পিতার রবীন্দ্র পাঠের ঝোঁক এবং পরিবারে প্রচুর বই ও সমকালীন পত্রিকা থাকার সুবাদে শৈশবেই শিল্পসাহিত্যের প্রতি অমোঘ এক আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল আল মাহমুদের। সেই আকর্ষণ থেকেই লেখালেখির সূচনা। আত্মজীবনীতে লেখালেখি বিষয়ক নিজের বেড়ে ওঠা এবং প্রথম লেখা প্রকাশের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার দাদা মীর আবদুল ওয়াহাব ছিলেন প্রখ্যাত গাইয়ে। তিনি নিজে নিজে সংগীত রচনা করতেন। গানের আসরে উপস্থিতভাবে ছন্দ মিলিয়ে গাইতেন জারি গান। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেন কথা মিলিয়ে, ছন্দ মিলিয়ে। বিষয়কে উপস্থিত করতেন অপূর্ব কায়দা-কৌশলে। যারা কবিগান বা জারি শুনেছেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন কবিতা নির্মাণে অসামান্য দক্ষতা ও কবিত্ব না থাকলে কবি বা জারিগান গাওয়া চলে না। আমার দাদা ছিলেন সেকালের এমন একজন জারি গানের শায়ের।
‘আমার মা-বাবা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভক্ত। আমাদের ঘরে ছিল এ মহান কবির রচনাবলি। পরিবারের সবাই ছিলেন কবিতাপ্রেমিক। আমি শৈশবে দেখেছি তাকভর্তি উর্দু-ফার্সির কবিতার বই। এমনি এক পরিবেশে আমি বড় হয়েছি, যা ভাবতে আমার বুক গর্বে ভরে ওঠে। প্রচুর পত্রপত্রিকা আসতো আমাদের বাড়িতে। অল্প বয়সেই আমি বাড়িতে বই, পত্রপত্রিকা পড়তে শিখেছি। আমাকে কেউ এসব পড়তে তাগিদ দেয়নি।
‘১৯৫৩ সালের কথা। আমি তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জর্জ ফিফথ হাই স্কুলের (বর্তমানে নিয়াজ মো. হাই স্কুল) পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। তখন দেশ স্বাধীন হলেও কলকাতা থেকে আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেশ কিছু পত্রপত্রিকা আসতো। আমি ছিলাম ‘সত্য যুগের’ নিয়মিত পাঠক। এ পত্রিকাটির ছোটদের পাতাটি আমার ভীষণ ভালো লাগতো। পাতাটি সম্পাদনা করতেন প্রখ্যাত সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষ। পাতাভর্তি থাকতো শিশুতোষ রচনা। এর মধ্যে ছিল গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ছড়া, কবিতা ও ধাঁধার আসর। এসব রচনা পড়ে আমি নিজে নিজেই গল্প, কবিতা লিখতে শুরু করলাম। তবে প্রথম দিকে কাউকে দেখাতে সাহস পেতাম না। আমার লজ্জামিশ্রিত ভয় নিজের উৎসাহকে দমিয়ে রাখতো।
‘কিন্তু যে ফুল ফুটবে, তাকে তো ফুটতে দিতে হবে। এক বুক সাহস নিয়ে লিখে ফেললাম একটি সুদীর্ঘ গল্প। গল্পটির নাম ‘তিতাস পারের ছেলে’ তিতাস নিয়ে আমি অনেক গল্প-কবিতা লিখেছি। কিন্তু আমার লেখায় তিতাস প্রথম ধরা পড়েছিল সেই শৈশবে। হ্যাঁ, যা বলছিলাম, একদিন কেন জানি সেই বড় গল্পটি একটি বড় খামে ভরে পাঠিয়ে দিলাম কলকাতার সত্যযুগ পত্রিকার দপ্তরে। কিন্তু লেখাটি আমার ছাপা হলো না। যদিও আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল লেখাটি ছাপা হবার উপযোগী। আবার ভাবলাম অতো বড় গল্প আমার লেখা ঠিক হয়নি। সম্পাদক কি সময় করে আমার গল্প পড়বেন? তিতাস পারের ছেলেটির গল্পের কথা ভুলে গেলেও পত্রিকা পড়ার কথা ভুলি না। সেই অল্প বয়সে পত্রিকা বাসায় এলেই পড়ার জন্য অধীর হয়ে উঠতাম।
‘সেদিনের কথা আমার খুব মনে পড়ে। কি কারণে জানি ধোপার দোকানে গিয়েছিলাম। ওখানে গিয়ে দেখি একটি সত্যযুগ পত্রিকা অবহেলায় অনাদরে পড়ে আছে। আমি আগ্রহ নিয়ে পত্রিকাটির পাতা ওল্টালাম। ভেতরের পাতা খুলতেই চোখে পড়লো আমার ‘তিতাস পারের ছেলে’ গল্পটি। নিচে আমার নাম। আমি প্রথমে বিশ্বাস করতে পারলাম না এটা আমার লেখা। কয়েকটি লাইন পড়ার পর বিশ্বাস হলো ওটা আমারই লেখা। আমার চোখে তখন প্রথম লেখা প্রকাশের ঝিলিমিলি খুশির ছোঁয়া। এক বুক আনন্দ নিয়ে হাতের শক্ত মুঠোয় পত্রিকাটি চেপে ধরে ছুটে গেলাম বাসায়। তখন আমাকে পায় কে। পাড়ার সব মানুষকে লেখাটি দেখালাম। দেখিয়ে স্বস্তি পেলাম। মনে হলো আমি যেন সিন্দাবাদের মতো একটি অচেনা রাজ্য জয় করেছি। রাতে আমার ঘুম হলো না। বার বার ঘুম থেকে উঠে লেখাটি দেখলাম। পরের দিন সকালে আমার লেখা ছাপার সংবাদ ছড়িয়ে গেলো আমাদের স্কুলে। সবাই আমার তারিফ করতে শুরু করলো। আমার সে কি আনন্দ। শুধু আনন্দ আর আনন্দ। পরবর্তীকালে আমার প্রচুর লেখা প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু প্রথম লেখা প্রকাশের সেই অনুভূতি আজও মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।’
আল মাহমুদ তাঁর কৈশোর ও তারুণ্যের শুরুর দিকেই মধ্যযুগীয় প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল প্রমুখের সাহিত্যসহ বাংলাভাষার গুরুত্বপূর্ণ সব রচনা পাঠ করে ফেলেন। ১৯৫৪-তে যখন মাত্র আঠারো বছরের তরুণ, টিনের একটি ব্রিফকেসকে সম্বল করে তিনি রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। তারপর থেকেই মূলত তাঁর বিকাশ ও সমৃদ্ধির শুরু। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তাঁর নাম পরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাঁকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর (১৯৬৩) সর্বপ্রথম তাঁকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস (১৯৬৬), সোনালি কাবিন (১৯৭৩), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো (১৯৭৬) কাব্যগ্রন্থগুলো তাঁকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৯৩ সালে বের হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস কবি ও কোলাহল।
তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার নগরকেন্দ্রিক প্রেক্ষাপটে ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে নিজের কবিতায় অবলম্বন করেন। নারী ও প্রেমের বিষয়টি তাঁর কবিতায় ব্যাপকভাবে এসেছে। উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী হিসেবে নারীর যৌনতা, আকাঙ্ক্ষা ও ভোগের লালসাকে তিনি শিল্পের অংশ হিসেবেই দেখিয়েছেন। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তাঁর অনন্য কীর্তি।
১৯৬৮ সালে ‘লোক লোকান্তর’ ও ‘কালের কলস’ নামে দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর সবচেয়ে সাড়া জাগানো সাহিত্যকর্ম সোনালি কাবিন। ১৯৭০-এর দশকের শেষার্ধে তাঁর কবিতায় বিশ্বস্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস উৎকীর্ণ হতে থাকে; এর জন্য বামধারা ও প্রগতিবাদীরা সেরেফ ধর্মের প্রতি তাঁর ঝোঁকের অপরাধে নির্মমভাবে উপেক্ষা করতে থাকেন। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কবি ও কোলাহল’। প্রগতির ধ্বজাধারী কোনো কোনো তাত্ত্বিকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিশ্বাসগ্রস্ততার কারণে তাঁর বেশকিছু কবিতা লোকায়িত সাহিত্যদর্শন দৃষ্টান্তবাদ দ্বারা অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু সমালোচনায় এ সত্য কথাটি তারা এড়িয়ে গেছেন যে, কবিতায় দর্শন থাকে, কিন্তু দর্শন দ্বারা কবিতা নিয়ন্ত্রিত নয়, কবিতা আবেগের কারবার।
৫৪ সালে ঢাকা আসবার পর আল মাহমুদ পেশা হিসেবে লেখালেখিকেই বেছে নেন। নামমাত্র সম্মানীর বিনিময়ে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলা পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলা পত্রিকার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৭১ সালে ভারত গমন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। যুদ্ধের পরে দৈনিক গণকণ্ঠ নামক পত্রিকায় প্রতিষ্ঠা-সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সম্পাদক থাকাকালীন এ সময় সরকারের বিরুদ্ধে লেখার কারণে এক বছরের জন্য কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ দেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
অবসর জীবনের পুরোটা সময় তিনি লেখালেখিতে কাটিয়েছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে দৃষ্টিশক্তি লোপ পেলেও তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি থামেনি। মৃত্যুর আগ অবধি শ্রুতলিখনের মাধ্যমে নিজের সাহিত্য সম্ভার সমৃদ্ধ করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যের পীড়ায় ভোগে অবশেষে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীকে শেষ বিদায় জানান আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী এ মহান কবি। আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন।
