
মাহমুদ সিদ্দিকী
ইসা ইবনে আবান। সৌম্যদর্শন এক কাজি। দ্বিতীয় শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ-করা ইসা ছিলেন একাধারে বহু জ্ঞানের পণ্ডিত। হাদিস ও ফিকহ—উভয় শাস্ত্রে ছিলেন শাস্ত্রজ্ঞ। প্রথম জীবনে ইসা ইবনে আবান ছিলেন কেবল হাদিসের পণ্ডিত। হানাফি ফিকহের ব্যাপারে ছিলেন বীতশ্রদ্ধ। হানাফি ফিকহ হাদিসবিরোধী— এই বক্তব্য সেকালেও কেউ-কেউ ছড়াত। যাচাই না করে অনেকের মতো ইসাও শুনে-শুনে মনে করতেন— হানাফি ফিকহ হাদিসবিরোধী। ইসা বিজ্ঞ মুহাদ্দিস। ইমাম মুহাম্মাদের সাথে সাক্ষাত আলাপ ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে সেই ভুল ধারণা থেকে ফিরে আসেন। আম্রৃত্যু লেগে থাকেন ইমাম মুহাম্মাদের সাথে। পরিণত হন একজন বিজ্ঞ ফকিহে।
মুহাম্মাদ ইবনে সামাআ (২৩৮ হি.) বলেন, ইসা ইবনে আবান ছিলেন সৌম্যদর্শন। ইসা আমাদের সাথে একই মসজিদে নামাজ পড়তেন। আমি তাঁকে নিয়মিতই মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের দরসে আসার দাওয়াত দিতাম। উত্তরে বলতেন, ‘এরা তো ওই সমস্ত লোক, যারা হাদিস অমান্য করে।’ ইসা চমৎকার হাদিস মুখস্ত রাখতেন। তো, একদিন আমাদের সাথে ফজরের নামাজ পড়লেন। ওইদিন ছিল ইমাম মুহাম্মাদের মজলিসের বার। এবার আর তাঁকে আমি ছাড়লাম না। অগত্যা তিনি মজলিসে বসে পড়লেন। এরপর ইমাম মুহাম্মাদ মজলিস থেকে ফারেগ হলে ইসাকে তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম। গিয়ে বললাম, এই যে আপনার ভাই আবান ইবনে সাদাকা আল-কাতেবের ছেলে। তাঁর কাছে মেধা ও হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান—দুটোই আছে। আমি তাঁকে আপনার মজলিসে বসতে বলি। কিন্তু, প্রতিবারই তিনি আমার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে, আমরা নাকি হাদিস অমান্য করি!
এবার ইমাম মুহাম্মাদ তাঁর প্রতি মনোযোগী হলেন এবং বললেন, ‘বৎস! কী এমন বিষয়ে আমাদেরকে হাদিস অমান্য করতে দেখলে? আমাদের মুখ থেকে না শুনে আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে ফেলো না।’ তারপর ইসা ইবনে আবান একে-একে পঁচিশটি অধ্যায়ের হাদিস সম্পর্কে প্রশ্ন করেন আর ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান জবাব দিতে থাকেন। সেসব অধ্যায়ের কোন কোন হাদিস মানসুখ (রহিত) এবং স্বপক্ষে দলিল কী—সব বলে দিলেন। ইমাম মুহাম্মাদের কাছ থেকে বের হয়ে ইসা আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘আমার ও আলোর মাঝখানে একটি পর্দা বাধা হয়ে ছিল। আজ সেই পর্দা উন্মোচিত হয়ে গেছে। আমি ধারণাও করতে পারিনি, আল্লাহ্র দুনিয়ায় মানুষের উপকারের জন্য এই ব্যক্তির মতো মানুষের আবির্ভাব তিনি ঘটিয়েছেন।’ এর পর থেকে ইসা ইবনে আবান ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসানের সাথে নিয়মিত লেগে রইলেন, একসময় তিনি ফকিহ হলেন। (১)
পেশায় ইসা ইবনে আবান ছিলেন ইসলামি সালতানাতের একজন কাজি। বসরা ছিল তাঁর বিচারিক কার্যালয়। আইন প্রয়োগ ও বিচারকার্য পরিচালনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তড়িৎ সিদ্ধান্তগ্রহণ, আইন বাস্তবায়নে একাগ্রতা—এগুলো তাঁর বিশেষ গুণ।
বসরার কাজির দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২১১ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে। সহজ-সরল ফকিহ ব্যক্তিত্ব হওয়ার পাশাপাশি ইসা ছিলেন বিধি-বিধান রক্ষায় দ্রুতহস্ত। বসরায় যেসব কাজি ভীষণ নিষ্ঠার সাথে আইন প্রয়োগ করতেন, ইসাকে বলা যায় তাঁদের শেষ ব্যক্তি। এমন সব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, যা অন্য কাজিগণ পারতেন না। (২)
নিয়মিত দান-সদকার মতো আমল ছিল ইসা ইবনে আবানের সাধারণ অভ্যাস। দান করতেন হাত খুলে, বেপরোয়াভাবে। দান করার সময় পরবর্তী অবস্থা নিয়ে ভাবতেন না। একথার সত্যতা পাওয়া যায় নিম্নোক্ত বর্ণনায়—
আবু আব্দুল্লাহ হাওয়ারি বলেন, ইসা ছিলেন দানশীল ও সচ্চরিত্রবান। দশ বছর কাজির দায়িত্ব পালন করেছেন। কাজির দায়িত্ব গ্রহণের আগে সম্পদশালী ছিলেন। অথচ, মৃত্যুর সময় তাঁর সন্তানদের জন্য কোনো সম্পদ রেখে যাননি। তিনি বলতেন, আমাকে যদি এমন কারও ব্যাপারে দায়িত্ব দেয়া হয়, যে আমার মতো তার সম্পদ যথেচ্ছা খরচ করে, তাহলে আমি তার উপর অবরোধ আরোপ করব। (৩)
ইসা ইবনে আবান রহমতুল্লাহি আলায়হির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো, তিনি হানাফি মাজহাবের উসুলে হাদিসের শাস্ত্রীয় রচয়িতা। প্রতিটি ফিকহি মাজহাবের নিজস্ব উসুলে হাদিস বা হাদিস শুদ্ধাশুদ্ধি নির্ণয়ের মূলনীতি রয়েছে। এই মূলনীতির আলোকে হাদিসের শুদ্ধাশুদ্ধি ও মান নির্ণীত হয়। এই উসুলের উপর ভিত্তি করে হাদিস থেকে মাসয়ালা উদ্ঘাটন করা হয়।
ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম আবু ইউসুফ রহ. ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ. যেসকল উসুলের আলোকে হাদিস থেকে মাসয়ালা উদ্ঘাটন করতেন, ইমাম মুহাম্মাদের ছাত্র হওয়ার সুবাদে ইসা ইবনে আবান সেগুলো জেনেছেন বিস্তারিত। বিক্ষিপ্ত সেই উসুলকে সুশৃঙ্খল আকারে রচনা করেছেন ইসা ইবনে আবান। মুহাদ্দিসিনের সাথে ইখতেলাফ কোন জায়গাগুলোতে, কোনটা কেন প্রাধান্য পাবে—নিজে মুহাদ্দিস ও ফকিহ হওয়ার কারণে সেসব নির্ণয় করেছেন সুন্দরভাবে। এজন্য ইসা ইবনে আবান রহ-কে বলা হয় হানাফি উসুলে হাদিসের প্রণেতা।
এতসব গুণের আধার ইসা ইবনে আবান ২২১ হিজরির মুহাররাম মাসে ইন্তেকাল করেন। (৪)
টীকা
(১) আখবারু আবি হানিফা ওয়া আসহাবিহি ১৩২ পৃ., আবু আব্দুল্লাহ আছছাইমারি ৪৩৬ হি.
(২) আখবারুল কুজাত ২/১৭০, মুহাম্মাদ ইবনে খালাফ ওয়াকি ৩০৬ হি.
(৩) আখবারুল কুজাত ২/১৭১-৭২, ইবনে খালাফ ওয়াকি ৩০৬ হি.
(৪) তারিখু মাওলিদিল উলামা ওয়া-ওয়াফায়াতিহিম ২/৪৯০, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ আর-রিবঈ ৩৭৯হি.
