
রাগিব রব্বানি
আলী খামেনেই শিয়াদের ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। পাশাপাশি আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে ইরানি শিয়া প্রজা সাধারণের কাছে ‘পরম সম্মানীয়’। ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের শেষ সম্রাট ও আমেরিকার আজ্ঞাবহ রেজা শাহ পাহলভিকে ক্ষমতাচ্যুত করে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া সম্প্রদায় যে বিপ্লব সাধন করেছিল, আলি খামেনেই ছিলেন সেই বিপ্লবের অন্যতম নেতা। ছিলেন ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ (রুহুল্লাহ) খামেনেই’র অন্যতম সহযোগী।
১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ জুলাই ইরানের মাশহাদ শহরে তাঁর জন্ম। বংশানুক্রমে তিনি শিয়া (ইসনা আশারিয়া) ধর্মে বিশ্বাসী। শিয়া পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গের কাছে তাঁর লেখাপড়ার হাতেখড়ি ও প্রাথমিক শিক্ষাদীক্ষা অর্জন। উচ্চতর পড়াশোনা করেন সোভিয়েত ইউনিয়নের পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি অব রাশিয়ায়।
ইরানে রেজা শাহ পাহলভির শাহি শাসন হটিয়ে শিয়া মতাদর্শভিত্তিক ধর্মীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আয়াতুল্লাহ (রুহুল্লাহ) খামেনেই’র সহযোদ্ধা হিসেবে দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন। ১৯৬৪ থেকে ৬৮ খ্রিষ্টাব্দ অবধি বহুবার গ্রেপ্তার হয়েছেন শাহি প্রশাসনের হাতে। ৭৯ খ্রিষ্টাব্দে বিপ্লব সাধিত হবার পর শিয়াদের কথিত ‘ইসলামি’ প্রজাতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন আলি খামেনেই। ৮১ খ্রিষ্টাব্দে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একক সংখ্যগরিষ্ঠতা পেয়ে নির্বাচিত হন তিনি। তিনি রাষ্ট্রপতি থাকাকালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেইনের সঙ্গে শুরু হয়েছিল তুমুল যুদ্ধ এবং এ যুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আলি খামেনেই।
১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩ জুন আয়াতুল্লাহ (রুহুল্লাহ) খামেনেই মৃত্যুবরণ করলে ৪ জুন তিনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন। সেই থেকে আজ অবধি ইরানের নেতৃত্ব ও পররাষ্ট্র বিষয়ক যাবতীয় সিদ্ধান্ত তাঁর হাতে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
৭৯-এর বিপ্লবের পর খামেনেইরা যখন ক্ষমতাগ্রহণ করলেন, তারপর থেকে ইরানে ইসনা আশারিয়া শিয়াদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পায়। ইরানের নাম যদিও ‘ইসলামি’ প্রজাতন্ত্র রাখা হয়েছে, কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরে কিংবা বহির্বিশ্বে এই প্রজাতন্ত্রের ছত্রছায়ায় চরমভাবে নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয়েছে সুন্নি মুসলিমরা। এবং এসব নির্যাতন আর নিপীড়নের মূলে আছেন ইরানের এই ধর্মীয় গুরু—আলী খামেনেই।
ইরান মূলত শিয়াদের শাখা মতাদর্শ ইসনা আশারিয়ার অনুসারী অধ্যুষিত। আলি খামেনেই’র প্রজাতন্ত্র ইসনা আশারিয়াদের দ্বারা পরিচালিত হয়। শিয়াদের অন্যান্য শাখা মতাদর্শের সাথে এ মতাদর্শের তীব্র বিরোধ থাকলেও ইরানের সফলতা ও শক্তিতে অভিভূত হয়ে এখন তারা অনেকটা একাত্ম হয়েছে। ইয়েমেনের যায়দিয়া শিয়ারা (হুতি), যারা ইসনা আশারিয়াদের কাফের ফতোয়া দিত, তারাও এখন মতপার্থক্য ভুলে ইরানের সর্বাত্মক সহযোগিতা নিচ্ছে। সিরিয়ার বাশশার সরকার, যারা আলাবি সম্প্রদায়ের লোক, এবং শিয়াদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক কুফরি মতাদর্শে বিশ্বাসী, তাদের সাথেও সব ভেদাভেদ ভুলে একাট্টা হয়েছে ইরান।
রাজনৈতিক শত্রুতার জের ধরে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে আলি খামেনেই’র ইরান সার্বক্ষণিক একটা উত্তপ্ত ভাব নিয়ে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে এই ইরানই সবচেয়ে বেশি তাণ্ডব চালাচ্ছে সুন্নি মুসলমানদের ওপর। সিরিয়ায় বাশশার সরকার ও রাশিয়ার সহযোগী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি মুসলমানদের ওপর বর্বর আক্রমণ, নির্যাতন আর বিভৎসতা কারও অজানা নেই। ইরাকেও সাদ্দাম সরকারের পতনের পর থেকে আমেরিকার পাশাপাশি তাদের হাতে নির্মম নিপীড়নের শিকার হচ্ছে মুসলমানেরা।
খোদ ইরানের ভূমিতে সংখ্যালঘু সুন্নি সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের ব্যাপক অভিযোগ আছে। বিপ্লবের পর সরকারি চাকরি-বাকরি থেকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে তাদেরকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। তাদের জন্য নেই উচ্চতর পড়াশোনারও কোনো সুযোগ।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে শত্রুতা, ফিলিস্তিনের মুসলমানদের প্রতি ‘দরদ’, এবং কথায় কথায় মুসলমানদের ঐক্য নিয়ে বাণী উদগীরণ ও কুরআনের আয়াত পাঠ দেখে অনেকেই মনে করেন, আলি খামেনেই মুসলমানদের ঐক্যপ্রচেষ্টা ও নির্যাতন বন্ধে খুব আন্তরিক।
কিন্তু বাস্তবতা কি আসলে তাই?
শিয়া স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বিচার করেন, তবে বাস্তবতা তা-ই। কিন্তু বৃহত্তর মুসলিম স্বার্থ বিবেচনা করলে এবং ইরাক সিরিয়া আর ইয়েমেনে সুন্নি মুসলিমদের নির্যাতনের চিত্র সামনে হাজির করলে বড় ধরনের একটা প্রশ্নবোধক চোখে ভাসে। ইরানের ধর্মীয় নেতা আলি খামেনেই’র বাণী উদগীরণ, বিপ্লবী ভাষণ আর আমেরিকা-ইসরায়েল-বিরোধিতা কি আসলেই নির্যাতিত মুসলিম বিশ্বের কল্যাণের জন্য?
