
যুবাইর ইসহাক
অজগরের মতো যে নদীটা এঁকেবেঁকে আলগোছে চলে গেছে পুবদিকে, বৈশাখে যার পানি নেমে আসে একেবারে নিচে, লোকজন মধ্যে বাঁধ দিয়ে ওপারের ধান এপারে নিয়ে যায়, বর্ষায় পানিতে ফুলে উঠে যার বুক, কখনো নিজের সীমানা ভেঙে দখল করে মানুষের বাড়িঘর, জাল ফেলে মাছের আশায় জেলেদের চোখ চকচক করে জ্বলে, নদীর বুকে ছোট কুঠিরের মতো নৌকা চলে ছলছল করে, তারই পাশ ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বাজারটা।
রূপগঞ্জকে কেবল বাজারই বলা যায়। ছোট টাউন-শহর বললে ভুল হবে। পশ্চিম পাশে মহাসড়কটা পড়েছে বলে বাজারের ভাগ্য খুলেছে–লোকদের ধারণা। উত্তর-দক্ষিণে চলে গেছে দুধারের গ্রামের পথ। বর্ষায় যেগুলো ডুবে থাকে পানিতে। তখন চলাচলের ব্যবস্থা কেবল পুবের নদীটাই। নিয়ম করে সপ্তাহে দুদিন বাজার বসে এখানে। আশেপাশের গ্রামের লোকজন জড়ো হয়। বাজার-সদাই করে। তবে নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যায় সবসময়।
রাস্তার কিনারে যে মার্কেটটা, যার এক পাশে হোটেল অপর পাশে মুদির দোকান, তার মাঝেখানের রুমটাতে উঠেছি আমরা। বাবা এখানেই উঠেন কিনা আমার জানা নেই। তবে প্রতিবছর ঠিকই আসেন। সপ্তাহ-দিন থাকেন। ধান সংগ্রহ করেন। তারপর সেগুলোকে গাড়িতে করে দোকানে নিয়ে যান। সেখানে এগুলো সিদ্ধ হয়। রোদের উত্তাপে গরম হয়। এরপর চাল করে বস্তায় ভরে বাজারজাত করেন।
এবার যখন আসবেন আমাকে বললেন, ‘রিহাম, আমার সাথে চল ‘ আমি ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। কলেজপড়ুয়া ছেলেকে বাবা কি নিজের ব্যবসাটা ধরিয়ে দিতে চাচ্ছেন? নাকি কেবল শখ করে সাথে নিচ্ছেন? তবে অনেকবার বাবার মুখ থেকে এই রূপগঞ্জের গল্প আমি শুনিছি। মাঝেমাঝে রূপগঞ্জকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছি। তাই প্রস্তাব পাওয়ায় আর দেরি করিনি। সাথেসাথে রাজি হয়ে যাই।
আমরা এখানে পৌঁছতেই আশেপাশের সবাই বাবাকে দেখতে এলো। হাল-অবস্থা জানলো। বুঝলাম, আমাদের অজানা বাবার আরেকটা পরিবেশ আছে। কালো সুঠাম দেহী একজন লোককে দেখলাম। বাবাকে ডাকছে ভাই ভাই বলে। আচরণ করছে সাহেব সাহেব। বাবা পরিচয় করে দিলেন। লোকটার নাম আনু। আমরা যে-কদিন এখানে থাকব, লোকটা আমাদের সাথে থাকবে। ধান সংগ্রহ থেকে শুরু করে খাওয়া-দাওয়া সব তার ব্যবস্থায়। প্রতিবারই নাকি লোকটা বাবাকে সাহায্য করে। আসার আগেও বাবা তার কাছে অবস্থা জেনে আসেন। আর বিনিময়ে সে পায় তার পারিশ্রমিক।
আনু চাচার ঘরে রাতের খাবারের আয়োজন হলো আমাদের। চারপাশে টিন দিয়ে দেয়াল তোলা তার ঘর। রান্নাঘর ছাড়াও আরও দুইটি রুম সামনের দিকে বাড়ানো। আমাদেরকে উত্তরের রুমে খাটের উপর খেতে দিলেন। ঘরে তাকে আর তার স্ত্রী ছাড়া কাউকে চোখে পড়ল না। বাবা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আনু, তোর মাইয়ারে তো দেখতাছি না, কই গেল? আনু চাচা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। গলাটা কেমন ভেজে গেলো তাঁর। চোখ দুটি ছলছল করে উঠল। থেমে বললেন, ‘মাইয়াটা গত কাতি মাসে মরি গেছে ভাইজান।’ বাবা ভাতের লোকমা মুখে তুলছিলেন। আনু চাচার কথা শুনে আর তুলেননি। লোকমাটি নিচের দিকে নামিয়ে ফেললেন।
বাবা দুঃখভরা কণ্ঠে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘ক্যাম্নে মরলো?’ আনু চাচা এদিক-ওদিক তাকান। কিছু খুঁজেন কিনা বুঝা যায় না। তারপর বলেন, ‘কী রোগ জানি অইছিলো। লইয়া দৌড়াদৌড়ি করছি। টেকা উড়াইছি। ভালা অয় নাই।’ আনু চাচা থামলে বাবা জিজ্ঞেস করেন, ‘হে তো তোর পালক মাইয়্যা আছিল।’ আনু চাচা জবাব দেন, ‘হ, অনেক চেষ্টা কইরা যখন সন্তান অইতেছিলো না, তখন মাইয়াটারে পালক আনছিলাম। কিন্তুক এইটারেও রাখতে পারলাম না। আল্লাহ না চাইলে আর ক্যাম্নে অয়!’
লোকটার বুক ভরা দীর্ঘশ্বাসে ছোট রুমটা ভরে যায়। রুমজুড়ে কেবল দুঃখের বাতাস বয়। আমরা তখন গ্রহণ করি দুঃখের অক্সিজেন। মিটমিট করে জ্বলা হারিকেনের পাশে দুঃখ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। আবছা আলো-অন্ধকারে দুঃখগুলো লাল-নীল হয়ে ওঠে।
পরদিন থেকে আমরা ধানসংগ্রহে নেমে পড়লাম। বৈশাখের শেষে নতুন ধান পড়ে এলাকায়। রাস্তাঘাট, বারান্দা-উঠোন ধানে-খড়ে ভরে যায়। পথে চট ফেলে, উঠোনে বা বাড়ির পাশের ক্ষেত লেপে ধান শুকাতে দেয় মহিলারা। তখন অনেকে আধাশুকনা ধান সস্তায় বিক্রি করে দেয়। আমরা ওই ধান কিনি। অনেক সময় বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কিনতে হয়। পরে আনু চাচাকে নিয়ে বস্তায় করে বাজারে ওঠাই। কেউ কেউ সোজাসুজি রূপগঞ্জে নিয়ে আসে। তাদের দামদর আরেকটু বেশি।
ধান সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাদের অনেক মানুষের সাথে দেখা হয়। পরিচয় হয়। কথা হয়। বুঝতে পারি, ওরা আমাদের সময় থেকে অনেক পিছিয়ে। চিন্তাচেতনা, যাপিত জীবন আরও নিম্নস্তরের। তবুও ওরা সুখী। তাবুর মতো ছোট ছোট ঘরে রাতে আধ পেট খেয়ে, যে সুখে ঘুমাতে যায় অথবা রূপগঞ্জে সন্ধ্যার পর এক সঙ্গে বসে বিড়ি টানতে টানতে গল্পে মেতে উঠে যে সুখ পায়, তা বস্তুবাদের গাড়ি-বাড়ির আভিজাত্যে নেই।
ওদের সাথে পরিচয় হলে হেসে বাড়িতে নিয়ে যায়। পানের বাটা এগিয়ে দিয়ে খেতে বলে। বাজারে কথা হলে চা-স্টলে টেনে নেয়। চা খাও চা খাও বলে আবেদন জানায়। ওদের সন্তানেরা হয়তো স্কুলে যায় না। গেলেও প্রাইমারি পেরোয় না। ওরা শিক্ষিতদের মতো কথা বলতে পারে না। ঠাণ্ডা রুমে বসে লোক ঠকাতে জানে না। তবুও নিজেদের জীবন নিয়ে তারা সুখী।
সপ্তাহ-দিনে আমাদের ধান সংগ্রহ শেষ হয়ে এলো। বাবা বললেন, ‘আর হয়তো পাওয়া যাবে না। আর যা পাওয়া গেছে তাও কম নয়। এবার ফেরা যাক।’
ফিরে যাবার দিন-তারিখ ঠিক করা হলো। হঠাৎ আমার মনে পড়ল, মা আসার সময় খুব তাড়া দিয়ে বলেছিলেন, ‘রূপগঞ্জ যখন যাচ্ছিস তোর খালাকে দেখে আসিস।’ রাতে ঘুমাতে যাবার আগে বাবাকে বললাম, ‘মা যে খালাকে দেখে যাবার কথা বলেছিলেন।’ বাবা বললেন, ‘কাল সন্ধ্যায় যাবো, দেখি। ঘুমাতে ঘুমাতে ভাবলাম, উনি আমাদের কেমন খালা হন? মায়ের বোনদের তো আমি চিনি, দেখেছি। উনাকে কি কখনো দেখেছি? উনি আমাদের চেনেন তো?
পরদিন আনু চাচা আসলে খালুর নাম বলে বাড়িঘর জেনে নিলাম আমরা। সন্ধ্যার পর খালাকে দেখতে বের হলাম আমি আর বাবা। বাজারের উত্তরে অদূরে ছোট পথটি ধরে হাঁটতে থাকলাম। বড় পথ থেকে নামতে হলো। ধানের ক্ষেতের মাঝ দিয়ে ছোট আইলের উপর চলছি। এটাই তাদের রাস্তা নাকি বাবা সহজের জন্য এদিকে নেমেছেন ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি।
কিছুদূর হাঁটতেই কয়েকটা বাড়ি চোখে পড়ল। ছোটখাটো একটা পাড়া হবে। বৈশাখের সন্ধ্যার গরমে একটু শীতল বাতাসের জন্য খুলে দেয়া জানালাগুলোতে ভেসে উঠছে হারিকেনের সোনারঙা আলো। কোনো কোনো মহিলা বাইরে ঘরের সামনের চুলায় হাড়ি বসিয়েছে। একটু বাতাসের জন্য বা ঘরে গরম সহ্য করতে না পেরে উঠানের আশেপাশে ছড়িয়ে আছে পুরুষমহিলা অনেকে।
পাড়ার মুখে পাওয়া একজন প্রৌঢ় বয়সী লোককে জিজ্ঞেস করে বাড়ির সবচেয়ে পূর্বের ঘরটি লক্ষ্য করে আমরা এগোলাম।
ঘরের কাছে পৌঁছে বাবা খালুর নাম ধরে ডাক দিলেন। ঘর থেকে একজন পুরুষ বের হলে বাবা নিজের পরিচয় দেন। সাথে সাথে বের হয়ে আসেন আরও একজন মহিলা। অন্ধকারে মহিলার বয়স ঠাহর করা কঠিন। আমাদের নিয়ে খাটে বসালেন তাঁরা। কেউ পা তুলে কেউ ঝুলিয়ে খাটের চারপাশে ঘুরে আমরা বসলাম। খালাকেও দেখলাম আমাদের সাথে বসে যেতে। কোলে তাঁর মেয়ে। বয়স দুই-আড়াই হবে। কথা প্রসঙ্গে অনেক বিষয় টানা হলো। খালুও বেশ আগ্রহ নিয়ে কথা বললেন। কিন্তু সন্তানের কথা উঠতেই খালু কেমন দমে গেলেন। কথায় কথায় জানালেন, ঘরে তার তিন সন্তান ছিল। এখন কোলেরটা ছাড়া বাকি দুটা মারা গেছে। কোলেরটাও খুব অসুস্থ। শহরে-বন্দরে বড় বড় ডাক্তরের কাছে দৌড়াদৌড়ি করছেন। বাবা তখন কিছু বললেন না। হয়তো সান্ত্বনা দেবার ভাষা তাঁর নেই। হঠাৎ আমি কান্নার শব্দ শুনি। একটু লক্ষ্য করে দেখি, আমার সদ্য পরিচিত খালা মুখ লুকিয়ে কাঁদছেন।
রূপগঞ্জ থেকে ফিরে আসার পর অনেকদিন চলে গেছে। অনেককিছু ভুলতে চলেছি। ভুলে যেতে শুরু করলাম আনু চাচাকে, ঝরাপাতার মতো সন্তান-হারানো খালাকে। নতুন অনেক ব্যস্ততায় ডুবে গেলাম। একদিন মা আমাকে বললেন, ‘তোর ওই খালার কথা ইয়াদ আছে নি?’ আমি বললাম, ‘কোন খালা মা?’ তিনি বললেন, ‘ওই যে রূপগঞ্জের।’ মনে পড়েছে–জানালাম। মা বললেন, খালার আড়াই বছরের মেয়েটাও সেদিন মারা গেছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি জানলা কেমন করে?’ মা বলেন, ‘তোর খালুকে আজ তোর বাবা শহরে পেয়েছিলেন। তখন নাকি কেঁদে কেঁদে খবর দিয়েছে লোকটা।’
আমার মন হঠাৎ বিষাদে ভরে গেলো। পৃথিবীর খেলাগুলো বড় রহস্যময়। এই রহস্য মেনেই মানুষ আসে-যায়। পৃথিবী নিজ গতিতে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলে এবং এতসবের ভীড়ে আনু চাচা বা হঠাৎ পরিচিত হওয়া খালারা শূন্য বুকে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকেন।
যুবাইর ইসহাক নবীন গল্পকার, হবিগঞ্জ
