
রাকিবুল হাসান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশ নিয়ে জঘন্য মিথ্যাচার করেছেন প্রিয়া সাহা নামের এক নারী।
গত ১৭ জুলাই ‘ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার’ ১৬টি দেশের ২৭ জন প্রতিনিধির সঙ্গে ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহাও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান।
তখন প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান নিখোঁজ রয়েছেন। দয়া করে আমাদের লোকজনকে সহায়তা করুন। আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই। এখন সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছে। আমরা আমাদের বাড়িঘর খুইয়েছি। তারা আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, তারা আমাদের ভূমি দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বিচার পাইনি।’
কারা এই নিপীড়ন চালাচ্ছে? ট্রাম্পের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রিয়া সাহা বলেন, ‘দেশটির মুসলিম মৌলবাদীরা এসব করছে। আর তারা এটা করতে পারছে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে।’
বাংলাদেশ নিয়ে প্রিয়া সাহার এ অভিযোগের ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশের সর্বশ্রেণির মানুষ তাঁর এ বক্তব্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তারা বলছেন, প্রিয়া সাহার এই কাজ রাষ্ট্রদ্রোহের নামান্তর। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশকে তিনি বিশ্বদরবারে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছেন। এমনকি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও প্রিয়া সাহার এমন বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন।
রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া
সংখ্যালঘুদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে করা অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আজ শনিবার (২০ জুলাই) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রিয়া যা বলেছেন সম্পূর্ণ অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কেন অন্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির কাছে এসব কথা বলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা করেছেন সে বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এর পরই তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ধরনের খবর দেয়ার পেছনে ওই নারীর নিশ্চয়ই একটি কারণ ও উদ্দেশ্য রয়েছে। দেশে আসলে নিশ্চয়ই আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করব। এটাই এখন আমাদের দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

বাংলাদেশ নিয়ে প্রিয়া সাহার ‘মিথ্যা অভিযোগে’র তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমও।
নিজের ফেসবুক পেজে তিনি লিখেন, প্রিয়া সাহা কেন এমনটি করলেন তা খতিয়ে দেখা হবে। আমি জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থায় একাধিকবার ভরা হাউসে পৃথিবীর সব দেশের এবং বাংলাদেশ ও বাইরের দেশের এনজিওদের মানবাধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। যেখানে শ্রদ্ধেয় রানা দাশ গুপ্তর মতো মানুষেরাও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দেয়া প্রিয়া সাহার অভিযোগের মতো কোন অভিযোগ বা প্রশ্ন কাউকে করতে দেখিনি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পও জানেন যে তার কাছেও মিথ্যা অভিযোগ করা হয়। মার্কিন প্রশাসন তাদের এখানকার দূতাবাসের মাধ্যমেই প্রতিনিয়ত তথ্য পেয়ে থাকে এবং আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগে থাকি।’
নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, প্রিয়া সাহা নামে এক মহিলা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে যে অভিযোগ করেছেন তা তিনি ব্যক্তি স্বার্থেই করেছেন। নিশ্চয়ই এর পিছনে তার বা কোন গোষ্ঠীর স্বার্থ আছে। এ ধরনের দু-একজন মানুষের অভিযোগ দিয়ে বাংলাদেশের মুল চেতনাকে কখনই ধ্বংস করা যাবে না।
শনিবার দুপুরে দিনাজপুরে ফলদ বৃক্ষ মেলার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ সব কথা বলেন নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহা যে বক্তব্য তুলে ধরেছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, ‘প্রিয়া সাহার বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক যৌথসভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থা নিয়ে প্রিয়া সাহা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে যে অভিযোগ করেছেন তা সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে ধর্মীয় স্বাধীনতা দেখেছি তা বিশ্বের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। শুক্রবার রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ সব কথা বলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে আসার পর গত আট মাসে সবগুলো বিভাগ ঘুরে এবং প্রধান চার ধর্মের উপাসনালয়ে গিয়ে আমার ধারণা হয়েছে যে, ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। এটা আমার দেশের জন্য একটা শিক্ষণীয় বিষয়, পুরো বিশ্বের এখান থেকে শেখার আছে।
মসজিদ-মন্দির-গির্জা আর প্যাগোডা ঘুরে ইমাম, পুরোহিত-পাদ্রিদের কাছ থেকে একটি বার্তাই পেয়েছি, ঐক্যবদ্ধ না থাকলে কোনো দেশের পক্ষেই উন্নতি করা সম্ভব না ‘
কে এই প্রিয়া সাহা
প্রিয়া সাহা বাংলাদেশ মহিলা ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক। রানা দাস গুপ্ত ওই ঐক্য পরিষদের সভাপতি। প্রিয়া সাহার বাড়ি চরবানিরী মাটিভাঙ্গা, নাজিরপুর, পিরোজপুর। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, রোকেয়া হলে থাকতেন। এখন একটি এনজিও আছে ওনার।
বিভ্রান্তিমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য গতবছর তাকে মহিলা ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার নাটক করে প্রচুর বিদেশি ফান্ড কালেক্ট করেন তিনি। বাংলাদেশের ‘দলিত’ সম্প্রদায়ের কল্যাণে কাজ করার নামে ‘শারি’ নামক একটি এনজিও পরিচালনা করেন প্রিয়া সাহা ওরফে প্রিয়া বালা বিশ্বাস।
তাঁর শ্বশুর বাড়ি বৃহত্তর যশোরে। প্রিয়ার স্বামী মলয় কুমার সাহা দুদকের সদর দফতরে উপপরিচালক পদে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর দুই মেয়ে প্রজ্ঞা পারমিতা সাহা ও ঐশ্বর্য লক্ষ্মী সাহা যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিরোজপুরের এক এনজিও কর্মী বলেন, হয়তো নিজের মেয়েদেরকে গ্রিনকার্ড পাইয়ে দেওয়ার জন্য প্রিয়া সাহা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ করছেন।
প্রিয়া সাহা সম্পাদিত পত্রিকা
প্রিয়া সাহা একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্বও পালন করছেন। পত্রিকাটির নাম মাসিক ‘দলিত কণ্ঠ’। সেখানে সম্পাদকের জায়গায় প্রিয়া সাহার নাম ‘প্রিয়া বালা বিশ্বাস’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত জুন মাসের ১২ তারিখে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট কাজি নাহিদ রসুল পত্রিকাটি প্রকাশের ঘোষণাপত্র প্রদান করেন। ঘোষণাপত্রে শনাক্তকারী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন অ্যাডভোকেট আল আমিন রিজভী। উষা আর্ট প্রেস থেকে এটি প্রকাশিত হচ্ছে। এ পত্রিকার অনলাইন ভার্সনও রয়েছে। এতে সংখ্যালঘু এবং ‘দলিত’ সম্প্রদায়ের খবর রঙচঙ দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
পত্রিকার ঠিকানা দেয়া হয়েছে–বাড়ি-১১, সড়ক ৪, ধানমন্ডি, ঢাকা। রাষ্ট্রবিরোধী কোনো সংবাদ ছাপানো হবে না বলে অঙ্গীকার করা হয়েছে পত্রিকার ঘোষণাপত্রে। কিন্তু এর সম্পাদকের বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ উঠছে এখন।
কোন পরিচয়ে গেলেন ট্রাম্পের কাছে
ওই সম্মেলনে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের পরিচয়েই গিয়েছেন প্রিয়া সাহা। মার্কিন গণতন্ত্র, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন ফ্রিডম হাউস ২৭ প্রতিনিধির তালিকা তুলে ধরেছেন। তালিকার ১৮ নম্বরে প্রিয়া সাহার নাম রয়েছে।
তবে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি রানা দাশগুপ্তের দাবি, প্রিয়া সাহাকে তাঁর সংগঠন থেকে পাঠানো হয়নি। তার সংগঠন থেকে ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য যে তিনজন প্রতিনিধিকে পাঠানো হয়েছিল, তারা হলেন, পরিষদের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অশোক বড়ুয়া ও নির্মল রোজারিও এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জী।
মিস্টার দাস আরও দাবি করেন, প্রিয়া সাহা তাদের সংগঠনের ১১ জন সাংগঠনিক সম্পাদকের একজন ঠিক, তবে তিনি ওই প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন না।
