আলোচনায় আগ্রহী, আইনি মোকাবেলায় যাবে না সাতাইশ মাদরাসা

মুসান্না মেহবুব

দেওবন্দি চিন্তাধারার ‘বিরোধী’ ও ‘ভ্রান্ত আকিদা’ লালনকারীদেরকে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ায় টঙ্গীর দারুল উলুম সাতাইশ মাদরাসা ও মজিদবাগ মাদরাসার নিবন্ধন স্থগিত করেছে সম্মিলিত কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আল-হাইআতুল উলইয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ। গত ১৮ জুলাই বোর্ডটির প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক থেকে জানানো হয়, আগামী পাঁচ বছর হইআতের কোনো পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না এই মাদরাসা দুটো।

মূলত হাইআতের দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর এ বছরের পরীক্ষায় টঙ্গীর সাতাইশ মাদরাসা থেকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি ড. মুবারকের অংশগ্রহণের খবর ভাইরাল হলে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রশ্ন ওঠে, জামায়াতের সঙ্গে কওমি মাদরাসার ‘ঐতিহাসিক বিরোধ’, ‘জামায়াত-শিবির’ নানা সময় নানাভাবে কওমি শিক্ষাধারার ‘ক্ষতি’ সাধনে সচেষ্ট ছিল, দেওবন্দি চিন্তাধারার ঘোরবিরোধী তারা, এতদসত্ত্বে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি কীভাবে হাইআতের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেন?

হাইআ কর্তৃপক্ষ এ ঘটনা জানতে পারলে নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করে জানায়, এ বোর্ড কওমি মাদরাসাভিত্তিক বোর্ড, দেওবন্দি চিন্তা-চেতনা যারা লালন করেন, তারাই কেবল এ বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দিতে পারবেন, এটা বোর্ডের মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এ নীতি ভঙ্গ করে যে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কওমি চিন্তার বিরোধী আকিদা পোষণকারীদেরকে হাইআর পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিগগির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে হাইআতুল উলয়ার জরুরি বৈঠকে অভিযোগ প্রমাণিত হলে গত ১৮ জুলাই টঙ্গীর দারুল উলুম সাতাইশ মাদরাসা ও মজিদবাগ মাদরাসাকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য বোর্ডের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

বোর্ডের এ সিদ্ধান্ত সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হলে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীসহ আরও বেশ কিছু অ্যাক্টিভিস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর তীব্র সমালোচনা করেন। জামায়াতের কোনো কোনো নেতা সাতাইশ মাদরাসাকে আহ্বান জানান, এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা যেন আইনি সহায়তা নেন এবং হাইআর বিরুদ্ধে রিট আবেদন করেন। আইনি লড়াইয়ের যাবতীয় খরচাদি জামায়াতের লোকজন বহন করবেন বলেও আশ্বাস দেন তারা।

এর পরপরই প্রশ্ন দেখা দেয়, সাতাইশ মাদরাসা নিয়ে। বোর্ডের সিদ্ধান্ত মাদরাসা কর্তৃপক্ষ কীভাবে দেখছেন? তারা কি বোর্ডের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো রিট আবেদন করবেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে এবং হাইআর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের অবস্থান জানতে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর থেকে কথা হয়েছিল সাতাইশ মাদরাসার শিক্ষাসচিব মাওলানা আবু বকর সিরাজীর সাথে।

মাওলানা আবু বকর সিরাজী বলেন, দারুল উলুম সাতাইশ মাদরাসা আপাদমস্তক কওমি ও দেওবন্দি চিন্তাধারায় বিশ্বাসী। আমরা অত্যন্ত লজ্জিত যে, আমাদের মাদরাসা থেকে নিবন্ধন করে কওমি চিন্তাধারার বিরোধী নেতৃস্থানীয় একজন ব্যক্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন। আসলে তিনি যে শিবিরের সভাপতি বা তিনি যে শিবির করেন, তা আদৌ আমরা জানতাম না। আমাদের মাদরাসার প্রবীণ ও সিনিয়র একজন শিক্ষকের সুপারিশে তাঁকে পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়। নিবন্ধনের সময় তাঁকে বলেও দেওয়া হয় যে, দাঁড়ি ও পোষাক আমাদের মতোই করতে হবে। তিনি রাজি হন এবং এ কয়দিনে তাঁর দাঁড়ি লম্বা করতে শুরু করেন, পোষাক-আশাকেও পরিবর্তন আনেন।

মাওলানা সিরাজী বলেন, পরীক্ষার আগে বা পরীক্ষার সময়ও আমরা যদি তাঁর আসল পরিচয় জানতে পারতাম তাহলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কোনো সুযোগই তাঁকে দেওয়া হতো না।

সাতাইশ মাদরাসা সস্পর্কে হাইআতের সিদ্ধান্তকে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ কীভাবে দেখছে, জামায়াত নেতাদের আহ্বানে কোনো ধরনের আইনি লড়াইয়ে তারা যাবে কি না জানতে চাইলে মাওলানা আবু বকর সিরাজী বলেন, হাইআতুল উলয়ায় যাঁরা আছেন, যাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা আমাদের তথা কওমি মাদরাসা সমূহের শীর্ষ মুরব্বি পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব। তাঁরা যা সিদ্ধান্ত নেন এবং নিয়েছেন আমরা মাথা পেতে মেনে নিয়েছি। জামায়াতের আহ্বানে আমরা আইনি লড়াইয়ে যাবার তো প্রশ্নই আসে না, আমরা আমাদের মুরব্বিদের আনুগত্যে সর্বদা আছি এবং থাকব। তবে আমরা এখনও তাঁদের কাছে আমাদের ওজরখাহি পেশ করার সুযোগ পাইনি। আমরা অফিসিয়ালি মুরব্বিদের কাছে যাব এবং যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, এটা একদমই যে আমাদের জ্ঞাতির বাইরে ছিল তা তাঁদেরকে জানাব। আশা করি মাদরাসার বৃহত্তর স্বার্থে মুরব্বিগণ তখন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে সচেষ্ট হবেন।

আগের সংবাদযুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আচরণ করলে প্রতিশোধ নেয়া হবে : তুরস্ক
পরবর্তি সংবাদহিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ থেকে প্রিয়া সাহা বহিষ্কার