
হামমাদ রাগিব
ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িকতা কতটা পাকাপোক্তভাবে আসন গেঁড়ে আছে, ১৯৯৩ সালের বোম্বাই হামলার বিচারে ইয়াকুব মেমন ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলে তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ রেখে গেছেন। ১৯৯৩ সালে সংঘটিত বোম্বাই বোমা হামলায় আর্থিক যোগান দানের অভিযোগে ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের আজকের দিনে, ৩০ জুলাই, মহারাষ্ট্রের নাগপুর কারাগারে তাঁকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হয়।
নাগপুর আদালত থেকে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষিত হবার পর ইয়াকুব মেমন সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলেন, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টও তাঁর ফাঁসির রায় বহাল রাখে। রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন যে রাষ্ট্র, সে রাষ্ট্রের অধিকর্তার দিল যে কোনো মুসলিম ‘টেরোরিস্টের’ বেলায় গলবার নয়, মেমন হয়তো জানতেন না। অথচ ১৯৮৩ সালে আসামের নেলি গণহত্যা, বোম্বাইয়ে যে ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ৯৩-এর সেই বোমা হামলা, বাবরি মসজিদ ভাঙা ও বোম্বাই দাঙ্গা, যে দাঙ্গায় শত শত মুসলমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল, এসবের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি প্রশাসন কিংবা আদালত, কিন্তু বোম্বাই হামলায় আর্থিক যোগান ও সম্পৃক্ততার অভিযোগে একজন মেমনকে ফাঁসি দেওয়া তাদের জন্য আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ, মেমন যে মুসলমান! মুসলমানের জন্য ন্যায্য বিচারপ্রাপ্তি হিন্দুপ্রধান রাষ্ট্রে অন্যায় (!)।
আরও পড়ুন : কাশ্মীরের রবিনহুড বুরহান ওয়ানী
অথচ তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ভারতের কয়েকশো বুদ্ধিজীবি আপত্তি তুলেছিলেন। মেমনের যে দোষ আদালত সাব্যস্ত করেছে, সে দোষের জন্য কোনোভাবেই তিনি ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে পারেন না বলে মত দিয়েছিলেন তাঁরা। বিজেপি সরকারের কাছে তাঁর মৃত্যুদণ্ড মওকুফের জন্য আবেদন জানিয়ে চিঠিও লিখেছিলেন অনেকে। (বিবিসি বাংলা, ৩০ জুলাই, ২০১৫)
এমনকি ভারতের অন্যতম শীর্ষ গোয়েন্দা আধিকারিক বি রমন, যিনি মেমনের তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তিনিও বলেছিলেন, ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি হওয়া অনুচিত, কারণ, ৯৩-এর বোম্বাই হামলার ঘটনার তদন্তে সরলভাবে তিনি অনেক সাহায্য করেছেন। এ জন্য তাঁর মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে বড়জোর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে। (এই সময়, ২৫ জুলাই, ২০১৫)
রাষ্ট্রপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের কাছে ইয়াকুব মেমনের স্ত্রীও করুণ আর্তি নিয়ে স্বামীর জীবনভিক্ষা চেয়েছিলেন, কিন্তু দিল গলেনি রাষ্ট্র কিংবা আদালত—কারোরই।
তাঁর পুরো নাম ইয়াকুব আবদুল রাজ্জাক মেমন। ১৯৬২ সালে ভারতের বোম্বাই শহরের বিখ্যাত মুসলিম গোত্র মেমন পরিবারে জন্ম। পড়াশোনা করেছেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যন্টস বিষয়ে। ১৯৯০ সালে ইন্সটিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যন্টস অব ইন্ডিয়া থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যন্টের ডিগ্রি নেন। ১৯৯১ সালে বন্ধুর সঙ্গে শেয়ারে একটি চার্টার্ট অ্যাকাউন্টেন্টি ফার্ম খোলেন। পরের বছর শেয়ার থেকে আলাদা হয়ে নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করেন এবং তুমুল সাফল্য পান।
১৯৯৩ সালে বোম্বাই শহরে ভয়ানক বোমা হামলার আগ অবধি ভালোই চলছিল তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য। ১৯৯২ সালে অযোধ্যায় ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদকে শহিদ করে দেবার ঘটনায় মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য সদস্যদের মতো মেমন ও তাঁর পরিবারের দিলেও চোট লেগেছিল ভীষণ। চোট লেগেছিল বোম্বাইয়ের আপামর মুসলিম জনসাধারণের। বাবরি মসজিদ শহিদ করার প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণভাবে তাঁরা রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। রাষ্ট্রের কাছে তাঁরা দাবি জানাতে চেয়েছিলের, বাবরি মসজিদ ভাঙার সঙ্গে জড়িতদের যেন আইনের আওতায় এনে বিচার করা হয়।
কিন্তু উগ্র হিন্দুরা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রশ্রয়ে প্রতিবাদী এসব মুসলমানের ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ১৯৯২-এর ডিসেম্বর মাস ছিল তখন। যেচে পেড়ে সহিংসতা বাঁধায় হিন্দুরা। সহিংসতা রূপ নেয় দাঙ্গায়। ১৯৯৩-এর জানুয়ারি অবধি চলমান থাকে এ দাঙ্গা। দাঙ্গায় হিন্দুপক্ষে ২৫৭ জন মারা পড়লেও মুসলমানদের পক্ষে শাহাদত বরণ করেন ৫৭৫ জন মুসলিম। এটা সরকারি হিসাব। বেসরকারি তথ্য মতে ১ হাজারের ওপর মুসলমান শাহাদত বরণ করেন এ দাঙ্গায়।
দাঙ্গার পর ইয়াকুব মেমনরা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করেন, যারা যেচে পড়ে দাঙ্গা বাঁধাল, প্রশাসন তাদেরকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রাখছে। ধরপাকড় যা চালানো হচ্ছে, সব নীরিহ মুসলমানদের ওপর। ইয়াকুব মেমনদের মতো প্রতিবাদী নওজোয়ানরা এ অন্যায় কীভাবে সহ্য করতে পারে?
১৯৯৩-এর বোম্বাই হামলা কতটা মানবিক, কতটা অমানবিক, কতটা ন্যায়সঙ্গত আর কতটা অন্যায়—এ বিতর্কটা অবশ্যই উঠে আসে; যদি হামলার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা হয়। হামলা অন্যায় ও অমানবিক মানলেও সরল একটা প্রশ্ন সামনে হাজির হয়। ইয়াকুব মেমনদের মতো তরুণদেরকে সহিংসতার পথে কে ঠেলে দিয়েছে? ভারত রাষ্ট্রের একচোখা বিচার এবং পক্ষপাতিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা নয় কি?
